আমি যখন মা

শান্তা মারিয়া:

আজ আর আমার মায়ের গল্প নয়। বরং মা হিসেবে আমার গল্পটাই নাহয় বলি।

প্রথম যখন আমি নতুন শিশুটিকে দেখি তখন মনের অবস্থা কি হয়েছিল? কিছুই হয়নি। আমার সিজার হয়েছিল লোকাল অ্যানেসথেশিয়ায়। অপারেশন টেবিলেই ডাক্তার দেখালেন ‘এই যে আপনার ছেলে’। বললাম, ‘আমি পরে দেখলেও চলবে। শুধু চেক করুন ও সুস্থ ও স্বাভাবিক কিনা। হার্টে কোনো সমস্যা আছে কি না’। একথা বলার কারণ হলো একে তো সে প্রিম্যাচিুরড বেবি, তার ওপর আমি কয়েক মাস আগেই একটা রিপোর্ট করেছিলাম নবজাতকদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে।

কেবিনে আমাকে নেয়ার পর ওকেও এনে রাখা হলো। এর একদিন পরই ধরা পড়লো ওর নিওনেটাল জন্ডিস এবং সেটা বেশ গুরুতর। বাক্সের ভিতর আলো জ্বালিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকা শিশুটির দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হতো। এর বেশি কিছু কি? হ্যাঁ, দুঃশ্চিন্তা। খালি মনে হতো, বাচ্চাটা বাঁচবে তো। সে ছেলে না মেয়ে এ নিয়ে আমার কোন হতাশা বা প্রত্যাশা ছিল না। যদি মেয়ে হতো তাহলে সম্পর্কটা যেমন হতো, এখনও তেমনি। আমার মনে হয় ছেলে না মেয়ে এটা মায়ের কাছে কোন বিষয় নয়। সন্তান সবই সমান।

পনের দিন পর দুজনেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম। আলাদা কট ছিল, কিন্তু আমি প্রথম কয়েক মাস আমার খাটেই পাশে শুইয়ে রাখতাম। আমি কি ব্লুজ এ আক্রান্ত হয়েছিলাম? না। একদম না। আমি খুব সৌভাগ্যবানদের একজন যে পোস্ট ম্যাটারনিটি ব্লুজ বা দুঃখবোধে আক্রান্ত হইনি। তবে সেই সময় থেকে অন্য রকম একটা ঘটনা ঘটতে থাকলো। জগতের সকল শিশুর প্রতি একটা করুণা, স্নেহ, বাৎসল্য যেন কুল ছাপিয়ে উঠতে লাগলো। দেড় মাস পর ম্যাটারনিটি লিভ শেষ হতে যখন চাকরিতে ফিরে গেলাম, রাস্তায় দরিদ্র শিশু দেখলেই চোখ ভরে আসতো জলে। শুধু মানব শিশু নয়, কুকুর ছানা, বিড়াল ছানা, বাছুর, ছাগল ছানা দেখলেও ভীষণ মায়া হতো। বলতে গেলে আমার সন্তানের জন্মের পর পরই আমি সত্যিকারভাববে মানবিক হওয়া শুরু করলাম, সহনশীল হলাম। ট্রাফিক জ্যামে রাস্তায় বসে থাকতে হলেই পথশিশুদের সঙ্গে কথা বলা, ওদের টাকা পয়সা দেয়ার অভ্যাসটা সে সময়েই শুরু হলো। মনে হতে লাগলো আহা, এও তো কোন মানুষেরই সন্তান। আমার ছেলে যেসব সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে, ওরও তো অধিকার আছে সেগুলো পাওয়ার।

আমি চাকরি করেছি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে। কখনও মনে হয়নি ছেলের জন্য চাকরি ছেড়ে দেই। তাহলে কি আমি যথেষ্ট কেয়ারিং ছিলাম না?

চল্লিশ দিনে নাকি বাচ্চার মাথা ন্যাড়া করতে হয়। কিন্তু আমি রাজি হইনি। ওর জন্মের প্রায় মাস তিনেক পর আমি নিজে হাতে সেফটি রেজার দিয়ে খু্ব সাবধানে ওর চুল কেটে দিয়েছিলাম। ওর চার পাঁচ বছর বয়স অবধি সেলুনে যেতে দেইনি। আমিই চুল কেটে দিতাম। আমার মা ওর যত্ন নিতেন। আমি প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে তারপর ছেলের খোঁজ খবর নিতাম। সে ঝাঁপিয়ে আমার কোলে চলে আসতো। একটা বাস্তব কথা বলি, অর্ণর সঙ্গ আমার খুব ভালো লাগতো। আমি ওর সঙ্গে খেলতাম আর একেবারে শিশু অবস্থা থেকেই তাকে বই পড়ে শুনাতাম। ঠাকুরমার ঝুলি, বাম্বি, লায়ন কিং, অ্যান্ডারসনের রূপকথা, সুকুমার রায়, উপেন্দ্র কিশোর, সত্যজিৎ রায়, শিবরাম, ছোটদের রামায়ণ মহাভারত, স্টোরিজ ফ্রম বাইবেল, নবী কাহিনী, গ্রিক মিথোলজি, বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, মানবাধিকার, জেন্ডার সমতা, ওর জগতটা আমার হাত ধরেই ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়েছে। তারপর কখন যেন ওকে বই কিনে দিয়েছি, ও একা একা পড়েছে। আমার কাছ থেকেই ও নিজের ধর্মের প্রতি নিষ্ঠা আর সকল ধর্মের প্রতি সহনশীলতা ও শ্রদ্ধার শিক্ষা পেয়েছে। ভালোবাসতে শিখেছে বিশ্ব মানবতাকে।

অর্ণ ছোটবেলা থেকেই একদম অন্যরকম একটি শিশু থেকে বালক, কিশোর, তরুণ হযেছে। আমার (শাহিনেরও) হাত ধরে ধরে পার্কে, রেস্টুরেন্টে শপিংয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সাধ্য কতটা, ওর সীমানা কতটা ও খুব ভালো বুঝতে শিখেছে। এমন কোন কিছু কখনও চায়নি যা আমাদের সাধ্যের বাইরে। এটা আমি ওকে শিখিয়েছি। ও ছোটবেলা থেকেই ভাবতে শিখেছে যে, ‘মা বাবা আমাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসে। যদি কোনকিছু আমার পাওয়ার হয়, যদি তাদের সামর্থ্যে থাকে, তারা নিশ্চয়ই দেবে’। ওর চোদ্দ পনের বছর থেকেই ওকে আমি পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি। বলেছি, ‘ভালো মন্দ এবং তার ফলাফল তোমাকে জানিয়ে দিলাম। এখন তুমি বুঝে নাও কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ।’ ওকে আমি পিকনিকে যেতে বাধা দেইনি। বলেছি, সাবধানে থাকতে। সেও সাবধানে চলেছে। লেখাপড়ার জন্য কোনদিন কড়াকড়ি করিনি। সে নিজের ইচ্ছাতেই যতটা দরকার পড়েছে। ক্লাসে ফার্স্ট হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। সে ফার্স্ট হয়নি। কিন্তু ভালো ছাত্রের কাতারেই ছিল। সে বলেছে, কোচিংয়ে গেলে সময় নষ্ট হয়। আমি ঠেলে পাঠাইনি কোনদিন। ঘরে একজন টিউটরের (সে ছেলেটিও ছিল অসাধারণ এক তরুণ) কাছে পড়তো।

আমার নিজের জীবন প্রবাহও কোনদিন বাধাগ্রস্ত হয়নি। আমি নিজের পছন্দমতো সময় কাটিয়েছি। বই পড়েছি, গান শুনেছি, বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরেছি। আমার সন্তান যেদিন জন্ম নিল সেদিন থেকে আমার সব চাওয়া-পাওয়া, ক্যারিয়ার, উচ্চাশা, শেষ হয়ে যায়নি। আমি নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভেবেছি, নিজের চাকরি, লেখালেখি, সৌন্দর্য, পোশাক, সাজসজ্জা, ব্যাংকের টাকা সবকিছু নিয়েই ভেবেছি। আমি আমার সন্তানের মধ্যেই কেবল প্রত্যাশার সকল পূর্ণতার সন্ধান করে বেড়াইনি। আমার জীবনের অপ্রাপ্তিগুলো সন্তানের মধ্যে পূরণ করার স্বপ্নও দেখিনি। আমার সন্তান একজন আলাদা মানুষ। তার নিজস্ব জীবন, নিজস্ব মেধা, নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকবে এটা আমার মনে হতো ওর জন্মের পর থেকেই।
অর্ণ কোনদিন আমাকে চাকরিতে যেতে, বিদেশে যেতে বাধা দেয়নি।

সে বলতো, ‘মামণি, কাজের প্রয়োজনে বাইরে যাচ্ছে। কাজ শেষ হলে আবার চলে আসবে।’ এই বোধটা আমি ওর মধ্যে তৈরি করে দিয়েছিলাম যে, কোয়ানটিটি টাইম নয়, কোয়ালিটি টাইম আমরা একসঙ্গে কাটাবো। আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন বলতেন, ‘মা যেভাবে চাকরি করে বেড়ায়, ও ছেলে বখে যাবে, উচ্ছন্নে যাবে। মা হলে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।’ ‘এই মেয়ে তো একদম কেয়ারিং না’।

না, আল্লাহর রহমতে, আমার ছেলে বখে যায়নি। সে তার শিক্ষকদেরও প্রিয় পাত্র হয়েছে। ঘরে বাইরে সবার কাছে প্রশংসা পেয়েছে। এখন অর্ণ একুশ বছরের তরুণ। সে সফট ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। সম্পূর্ণ নিজের সিদ্ধান্তে এই বিষয় বেছে নিয়েছে। সে দায়িত্বশীল। এই করোনা সংকটের কিছুদিন আগে আমি আর ওর বাবা একসঙ্গে কুয়াকাটা বেড়াতে গেলাম। বাড়িতে আমার অসুস্থ মা ছাড়া আর কেউ নেই। অর্ণই পুরো দায়িত্ব নিয়ে বললো, ‘আমি সব কিছু সামলাবো। তোমরা ঘুরে এসো।’ আমার মায়ের দেখাশোনা থেকে শুরু করে বাড়ির সব দায়িত্ব সেই পালন করেছে।
আমি কি আমার সন্তানের জন্য তাহলে কোনই ত্যাগ স্বীকার করিনি?

আমার অতি কষ্টে উপার্জিত অর্থের একটা বড় অংশ তার লেখাপড়া ও অন্যান্য চাহিদা মেটাতে ব্যয় করেছি, এখনও করে চলেছি। তার যত্ন, আরাম, অসুস্থতায় সেবা, বিনোদন, মানসিক বিকাশ এসব কিছুর জন্য অনেক সময় ব্যয় ও পরিশ্রম করে চলেছি।
আমি অর্ণকে প্রশ্ন করেছি, তার সঙ্গে আলোচনাও করেছি, বলেছি ‘আমি কেয়ারিং নই, এ নিয়ে তার কোন অভিযোগ আছে কিনা’। সে বলেছে, ‘তুমি ওভার প্রোটেকটিভ নও। ন্যাগিং মাদার নও। বিরক্তিকর নও। বরং তুমি ফ্রেন্ডলি। তোমার সঙ্গে আমি সবকিছু নিয়ে কথা বলতে পারি। তোমার পরামর্শ নিতে পারি।আমি খুব লাকি যে, তুমি আমার মা।’

শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত আমি তার সেরা বন্ধু। আমরা দুজন আগের মতো এখনও গল্প করি, মজা করি, বিভিন্ন সমস্যা শেয়ার করি, একসঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করি। রান্নায় আমার আনাড়িপনা, ফ্যাশনপ্রীতি, বই পড়ার নেশা ইত্যাদি নিয়ে দুজনে হাসাহাসিও করি। আমাদের দুজনের সম্পর্কের মধ্যে যথেষ্ট স্পেস ওর ছোটবেলা থেকেই রেখেছি। আমরা পরষ্পরের প্রাইভেসিকে সম্মান করি।

ও যদি জীবনে কোথাও আঘা্ত পায়, ব্যর্থ হয় আমি( যদি বেঁচে থাকি) চেষ্টা করবো তাকে সান্ত্বনা দিতে, সমস্যা সমাধান করতে।
ও যখন আরও বড় হবে কেমন হবে আমাদের সম্পর্ক? সে যদি কাউকে পছন্দ করে, ভালোবাসে, জীবনসঙ্গী করতে চায়, আমি মেনে নিব। আমি বাধা দিব না কোনভাবেই। বরং চেষ্টা করবো সে মেয়েটিকেও নিজের সন্তানের মত দেখতে। সেও তো অন্য কোন মায়ের বড় আদরের সন্তান। আমি হয়তো ছেলের কাছাকাছি অন্য কোন বাড়িতে থাকবো। এক বাড়িতে নয়। কারণ তাদের দুজনের সম্পর্কের ভিতর, তাদের দুজনের জীবনের আমি নিজের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি দিয়ে বাধা সৃষ্টি করতে চাই না। সে মেয়েটিরও আমি মাদার ইন ল নই, বরং মা হতে চাই।

আমার কাছে মাতৃত্ব মানে কী? মাতৃত্ব মানে নিজেকে ক্রমশ উদার করে তোলা, সহনশীল করে তোলা। আমার ছাত্রছাত্রীরাও কিন্তু আমার সন্তানের মতোই। ‘মতো’ নয়, সন্তানই। আমি তাদের ‘বায়োলজিক্যাল মাদার’ না হয়েও মা। তাদেরও আমি স্নেহ করি ভালোবাসি। আমি মনে করি একজন মানুষ (নারী পুরুষ বা থার্ড জেন্ডার) মা হতে পারেন, বাবাও হতে পারেন। বায়োলজিক্যাল মাদার, ফাদার না হয়েও মানুষ মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব পেতে পারে। ভালোবাসা, উদারতা, স্নেহ, বন্ধুত্ব এগুলো শারীরিক নয়, মানসিক। নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যকে ভালোবাসতে পারাটাই মা হয়ে ওঠা।

শেয়ার করুন:
  • 544
  •  
  •  
  •  
  •  
    544
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.