ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা সাংবাদিকদের জন্য কি কোথাও কেউ নেই?

আঙ্গুর নাহার মন্টি:

কেউ স্বীকৃতি দিক আর না দিক আমরা সাংবাদিকরা সবসময় ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা! আমরা সবার অধিকার নিয়ে কথা বলি। রাষ্ট্র, সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করি। নানা হয়রানি এমনকি মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে সমাজের অনিয়ম ও অসঙ্গতি তুলে ধরি মানুষের কল্যাণে। কোভিড ১৯ যুদ্ধেও নিজেদের কাজটি রিলেজিয়াসলি করছি আমরা একেবারেই শুরু থেকেই। আতংক-উদ্বেগ আমাদের দায়িত্ব পালনে এখনও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সবাই যখন করোনাভাইরাস ঠেকাতে ঘরে থাকছে, আমরা তখন পরিবারসহ ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত তথ্য সরবরাহ করে যাচ্ছি। অথচ সুরক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় আমাদের অবস্থান সবার পেছনে! আমাদের মৃত্যুতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শোক বার্তা মেলে না। না মিলুক! কিন্তু এই যে আমরা এদেশের মানুষকে তথ্য সরবরাহ করতে গিয়েই আক্রান্ত হচ্ছি, একে একে মৃত্যুর মিছিলে সামিল হচ্ছি, তাতে কি আমাদের মিডিয়া হাউজ, সাংবাদিক নেতা, তথ্য মন্ত্রণালয়, চিকিৎসক সমাজ ও আমাদের সকলের একসাথে কিছুই করণীয় নেই?

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা ও প্রতিষেধক নেই আমরা জানি। কিন্তু শ্বাসকষ্ট নিয়ে যখন সময়মতো এম্বুলেন্স, আইসিইউ আর ভেন্টিলেটর না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে একটু সেবা পাবার আশায় ছুটতে ছুটতে মৃত্যু হচ্ছে তাকে তো করোনা ভাইরাসে মৃত্যু বলতে পারছি না। একে আমি করোনা আতংকের অজুহাতে অবহেলাজনিত হত্যাই বলবো।

আমরা এমন একটি সংকটময় সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে বাধ্য হচ্ছি আমাদের চিকিৎসকদের বেশিরভাগই দায়িত্ব ভুলে গেছেন। তাদের কাছে করোনা পজিটিভ বা নেগেটিভে কিছুই যায় আসে না। তাদের সুরক্ষার জন্য রিপোর্ট করে যতোই সাংবাদিকরা রাষ্ট্র, সরকারসহ বিভিন্নমহলের বিরাগভাজন হই না কেনো, হাতে গোনা দু’একজন ছাড়া কেউই সময়মতো তাদের সেবাটুকু পাচ্ছে না। এটাই তিতাসত্য! তবুও আমি সেইসব সাংবাদিক বান্ধব চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আর্জি জানাতে লিখছি। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত, কারণ আজ সবার কথা না বলে শুধুই নিজের সাংবাদিক কম্যুনিটির কথা বলছি। বঞ্চিতদের মধ্যে বঞ্চিত আমাদের নিয়ে আজ কিছুটা স্বার্থকেন্দ্রিক না হয়ে পারছিও না।

২৯ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেলেন দৈনিক সময়ের আলোর চীফ রিপোর্টার হুমায়ুন কবির খোকন, সহ-সম্পাদক মাহমুদুল হাকিম অপু এবং ভোরের কাগজের আসলাম রহমান। আসলামের অবশ্য টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ ছিল। তবুও কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে তাকে ভর্তি নেয়নি। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে গেলেও সেখানেও একঘণ্টায় তাকে কোন চিকিৎসক এটেন্ড করতে আসেনি। পরে অবশ্য মৃত ঘোষণা করেছেন। অথচ শ্বাসকষ্ট শুরুর পর অক্সিজেনসহ অ্যাম্বুলেন্স, তাৎক্ষণিক আইসিইউ সাপোর্টসহ হাসপাতালে ভর্তি করানো গেলে আসলাম হয়তো বেঁচে যেতো।

এখনও পর্যন্ত সবশেষ তথ্যনুযায়ী ৭০ জন সাংবাদিকের কোভিড ১৯ শনাক্ত হয়েছে। শুনছি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রায় একশো জন সংবাদকর্মীকে কোন উপসর্গ ছাড়াই করোনা টেস্ট করানো হলে তাদের মধ্যে আরো ১০ জনের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে নতুন সংখ্যা, নতুন মাত্রা। কতোজন কোয়ারেন্টিনে আছে সে হিসেবও নেই আমাদের কাছে। এমন বাস্তবতায় আমাদের জাতীয় প্রেসক্লাব, বিএফইউজে, ডিইউজে, ডিআরইউ, নোয়াব, সম্পাদক পরিষদ নেতারা সবাই মিলে কি তথ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে কোভিড ১৯ সংকট সময়ে সাংবাদিকদের করোনা পরীক্ষাসহ অন্যান্য রোগের চিকিৎসাসেবাটুকু নিশ্চিত করতে পারেন না?

গণমাধ্যমের খবরে এসেছে, করোনাভাইরাস এর নমুনা সংগ্রহের জন্য ডিএফআইডি’র অর্থায়নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে সারাদেশে ৬০০ বুথ বসাবে উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। রাজধানীর সব সাংবাদিকদের জন্য জাতীয় প্রেসক্লাবে কয়েকটি বুথ বসানোর এবং বিভিন্ন জেলা শহরে স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। সেই সাথে রাজধানী কমপক্ষে দুটি ডেজিগনেটেড হাসপাতালে করোনা পজিটিভদের জন্য এবং আরো কয়েকটি হাসপাতালে অন্যান্য রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কি খুব কঠিন?

ক্রাইম রিপোর্টারদের এসোসিয়েশন ক্র্যাব নমুনা পরীক্ষার একটি উদ্যোগ ইতিমধ্যে নিয়েছে। ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারও বেশ কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে। সিনিয়র-জুনিয়র সাংবাদিকরাও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাধ্যমতো সহকর্মীর পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আলাদা আলাদা করে নয়, এখন মনে হয় সমন্বিত একটা উদ্যোগ সময়ের দাবি। কোভিড ১৯ শনাক্ত হওয়ার আগেই আমরা চিকিৎসা সেবা না পেয়ে আতংকে মারা যাচ্ছি। পরিবারের সদস্যসহ বিপর্যস্ত দিন কাটছে আক্রান্তদের। নিজ পেশার সহকর্মীদের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমজুড়ে মাতমও আর নিতে পারছি না। সবাই মিলে কিছু একটা করুন প্লিজ।

সম্পাদক, নিউজরুম লিডার, সাংবাদিক নেতা, তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ব্র্যাক, চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ যেন একটা সমন্বিত উদ্যোগ আমরা দেখতে পাই। মরবো তো একদিন সবাই! আমরা সাংবাদিকরা দায়িত্ব পালন করতে করতে মরতেও ভয় পাই না। তবে কঠিনতম সংকটকালে চতুর্থ স্তম্ভের বাঁচার চেষ্টাটাও জারি থাকুক!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক এবং প্রেসিডেন্ট, ডিক্যাব

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.