আমার শাশুড়ি আমার ‘মা’

রিমি রুম্মান:

আমরা অল্প বয়সী দু’জন তরুণ-তরুণী বিয়ের এক সপ্তাহ পর প্রিয় দেশ, স্বজন সব ছেড়ে পাড়ি জমালাম বিদেশ বিভূঁইয়ে। প্রবাসের প্রথম দিককার অনেকগুলো বছর চিঠিই ছিল আমাদের অবসরের আনন্দ, স্বস্তি, শান্তি। প্রতিমাসে কারো না কারো চিঠি পেতাম। ভাই, বোন, বন্ধু, স্বজন। কী যে আনন্দের অনুভূতি হতো! সবচেয়ে বেশি আনন্দ হতো আম্মা এবং শাশুড়ি আম্মার চিঠি পেলে।

আমার জন্মদাত্রী মায়ের মতো শাশুড়িকেও আম্মা বলেই ডাকি। তিনি চিঠিতে প্রায়ই লিখতেন, ‘তোমাকে আমি আমার পারুর স্থানে পাইলাম’। পারু ছিলেন আম্মার কন্যা। আমি এ পরিবারের অংশ হবার আগেই পারুর মৃত্যু হয়েছিল তরুণী বয়সে, হার্টের জটিলতাজনিত কারণে। আমি তাঁকে কোনোদিনই দেখিনি। শাশুড়ি যে পুত্রবধুকে কন্যাসম ভেবেছেন, এটি আমার পরম পাওয়া। এইদিকে আমাদের প্রবাস জীবনের দিনলিপি জানিয়ে উনাকে নিয়মিত লিখি। তিনি সেইসব চিঠি একবার পড়েন, বারবার পড়েন। রাতে বালিশের নিচে রাখেন। ভোরে আবার পড়েন। সেই খবরও আমি পাই বিদেশের বাড়িতে বসে।

টানা পাঁচ বছর কঠোর পরিশ্রম আর সংগ্রাম শেষে একটু গুছিয়ে নিয়ে দুইমাসের ছুটিতে দেশে গেলাম ২০০০ সালে। সকলের আদর ভালোবাসায় বেশ আনন্দময় সময় কাটে। একদিন গল্পচ্ছলে শাশুড়ি আম্মা আমার হাতের চুড়িগুলো দেখিয়ে বললেন, ‘ পরের বার দেশে আসার এমন দুইটা চুড়ি আনিও।’ কথাগুলো এতো আপন মনে হলো ! আমি চুড়িগুলো খুলে আম্মার হাতে পরিয়ে দিয়ে বলি, ‘ এগুলো রাখেন, পরের বার আসলে অন্য ডিজাইনের আনবো।’ দুইরুমের মাঝের দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন শ্বশুর। মজা করে বলে উঠলেন, ‘ এইগুলা কী ইমিটিশন নি ?’ আম্মা খানিকটা লজ্জিত স্বরে বললেন, ‘ এখনই দেয়ার দরকার নাই, আমার তো আছেই।’ তবুও জোর করে দিয়ে বললাম, ‘ আম্মা, বিদেশে চুড়ি পরা হয় না।’ সত্যিই আত্মীয় পরিজনহীন এই বিদেশ বিভূঁইয়ে আমাদের সোনার গহনা পরা হতো না।
২০০১ সালে আম্মা হজ্জে গেলেন। ফেরার সময় তিন কন্যা এবং আমি, চারজনের জন্যেই সোনার চুড়ি আনলেন। বুকের বাঁ পাশে, নিরেট অন্ধকারে আচমকা জ্বলে উঠা আলো দেখার মতো আনন্দ হলো। মনে হলো যেনো গোটা পৃথিবীটা আমার হাতে এনে দিলেন। যে আমার কোনোকালেই গহনা প্রিয় ছিল না, সেই আমি যেখানে যাই, আম্মার দেয়া চুড়ি পরি। প্যান্ট-শার্টের সাথে চুড়ি ! স্কার্টের সাথে চুড়ি ! নিজের হাতের দিকে নিজেই তাকাই। মুগ্ধ হই। গভীরভাবে উপলব্ধি করি, মুগ্ধতা আসলে জিনিষে নয়, মুগ্ধতা ভালোবাসায়।

২০০৩ সালের মে মাসের চমৎকার এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে আম্মা নিউইয়র্ক আসেন। আমাদের দুই সদস্যের পরিবার এবার তিন সদস্যের হয়। একে একে পুত্রদ্বয় রিয়াসাত এবং রিহানের জন্ম হয়। ২০১০ সালে ছোটপুত্র রিহানের জন্মের পর ওর বাবা আমায় নিয়ে জুয়েলারি দোকানে যায় উপহার কিনে দিবেন বলে। কিছুই পছন্দ হয় না। শেষে খুব সুন্দর এক সেট চুড়ি কিনলেন। আমার মনে পড়ে গেলো, আম্মাকে তো অন্য ডিজাইনের চুড়ি কিনে দেবার কথা ছিল ! বরকে বললাম, ‘ আম্মার জন্যেও নেই একসেট ?’ তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। জুয়েলারি দোকানের ঝলমলে আলো থেকে বিচ্ছুরিত আভার মাঝেও তাঁর চোখের কোণে এক চিলতে আনন্দ খেলে যেতে দেখি। ছোট্ট নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘ আচ্ছা’। বাড়ি ফিরে চুড়িগুলো আম্মাকে পরিয়ে দিলাম। এক পৃথিবীসম সুখ চিক্‌চিক্‌ করে উঠলো তাঁর চোখেমুখে। দিনের পর দিন পরে থাকলেন হাতে। জায়নামাজে বসে কারণে অকারণে নিজের হাতের দিকে নিজেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। কী জানি, আম্মারও আমার মতো একই অনুভূতি হয়েছিল কিনা, ‘ মুগ্ধতা জিনিষে নয়, ভালোবাসায়’।
আমার নিজের বাবা-মা বেঁচে নেই। মৃত্যুর পর একজন মানুষ কতোটা ভালো ছিলেন আমরা সেই গুণগান করি। বেঁচে থাকা মানুষটিকেও তো সম্মান জানানো যায় ! সেই ভাবনা থেকে ২০১৫ সালে আমার প্রকাশিত প্রথম বই ‘ সুখের আকাশে বিষাদ রাত’ উৎসর্গ করেছি শাশুড়িকে। তিনি চিরকাল পড়ুয়া মানুষ। হাতের কাছে যা পান, তা-ই পড়েন। পুত্রবধুর লেখা বই তাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছে ! গভীর মনোযোগে পড়লেন। দিনের পর দিন পড়লেন। শোবার ঘরে, বসার ঘরে, রান্না ঘরে, সবখানে আম্মার হাতে ‘ সুখের আকাশে বিষাদ রাত’। এমন কী ঘুমোতে গেলে বালিশের নিচেও !

আম্মার বয়স এখন আশির কাছাকাছি। শুনেছি বার্ধক্যে মানুষের ঘুম কমে যায়। তাঁরা রাত্রির প্রহরীর ন্যায় জেগে থাকেন। তখন মনের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা, স্তিমিত হয়ে থাকা স্মৃতিগুলো বহুবছর পর জেগে উঠে। সেইসব স্মরণ করে রাতটুকু ভোর হয়। দিনভর তাই তাঁরা একরকম ঘোরের মধ্যে থাকেন। বর্তমানের অনেককিছুই মনে রাখতে পারেন না। আম্মার হয়েছে সেই দশা। তবুও রান্নাটা এখনো নিজেই করতে চান। মাঝে মাঝে তরকারিতে নুনের পরিবর্তে চিনি দিয়ে দেন। কখনো মনের ভুলে দুইবার নুন দেন। আমরা কখনো মিষ্টি তরকারি দিয়ে ভাত খাই। কখনোবা নোনতা তরকারি। কোনো কোনোদিন দুইবার ভাত রাঁধেন। সেদিন বলি, আজ ভাত রান্না করার দরকার নেই। ভাতের হাড়ি লুকিয়ে রাখি। কেমন করে যেনো খুঁজে বের করে আবারো ভাত রান্না করতে উদ্যত হন। এবার আর লুকাই না। বলি,

: আম্মা, হাড়িটা সরায়ে রাখি ?
: ক্যান ? (বিরক্তির স্বরে)
: নইলে তো ভুলে আবারো রান্না করে ফেলবেন।
: তা-ই করো, এইটা ভালো বুদ্ধি। হা হা হা …
আম্মা হাসেন। প্রাণখোলা হাসি। নিজের ভুলের কথা ভেবে নিজেই হা হা করে হাসেন। পর মুহূর্তেই ধূসর চোখে ব্যাকুলভাবে চেয়ে থাকেন মনে না রাখতে পারার অনুতাপে।

আম্মার সব চাওয়া আমার কাছে। নারকেল তেল আনিও, পাকা পেঁপে আনিও, ওষুধ আনিও, দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাইতে হবে…। জানুয়ারিতে জামাতার মৃত্যু সংবাদে আম্মা দেশে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘ এই দুঃসময়ে কন্যার পাশে থাকা অতীব জরুরি।’ বিষয়টি যুক্তিযুক্ত। বিভিন্ন ট্রাভল এজেন্সিতে ফোন করে খবরাখবর নিতে লাগলাম। অবশেষে দিন তারিখ ঠিক হলো। টিকেট কাটা হলো মা-ছেলের জন্যে। অন্যবার আমি সাথে যেতাম। বাচ্চাদের স্কুল খোলা থাকায় এই প্রথমবারের মতো মা-ছেলে একাকি দেশে যাবে। গোছগাছের পালা। এবার বছর দেড়েক পর দেশে যাচ্ছেন। লাগেজে কাপড়-চোপড় ভাঁজে ভাঁজে রাখছি। আম্মা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন মানুষ। মাড় দেয়া টান টান শাড়ি পরেন।এলোমেলোভাবে রাখা যাবে না। বিছানায় বসে ঈষৎ ঢেউ খেলানো শুভ্র শাদা চুলে মাথার মাঝ বরাবর সিঁথিতে বিলি কেটে তেল দিচ্ছিলেন আপন মনে। যেনো দুইপাশে শাদা ফেনা ছড়িয়ে লঞ্চ এগিয়ে চলে ঢেউ ভেঙ্গে ভেঙ্গে। আয়েশি ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন,

: কতদিনের জন্যে দেশে যাইতেসি ?
: তিন সপ্তাহ।
বিস্ময়ে চোখ গোলাকৃতি করে টেনে টেনে বললেন, ‘ তি-ন সপ্তাহ ! এতদিন থাকার দরকার কী ? ’
আমি মেঝেতে পা ভাঁজ করে বসে লাগেজের একপাশে ওষুধের প্যাকেট রাখছিলাম। হাত থামিয়ে ভ্রু কুঁচকে ঘুরে তাকাই। বলি, ‘ আম্মা, তিন সপ্তাহ তো বেশি সময় না, দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।’ তবুও তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিস্পৃহভাবে বললেন, ‘ এ-ত-দি-ন’!

নির্দিষ্ট দিনে বাসার সামনের গেটে অপেক্ষমান গাড়িতে তুলে দিতে গেলাম। আম্মা জড়িয়ে ধরলেন। আমাদের ছেড়ে যেতে খারাপ লাগছিল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বাইরে তখন সকালের শীতল বাতাসের স্পর্শ। আমি শীতের দোহাই দিয়ে বলি, ‘ আম্মা, অনেক ঠাণ্ডা লাগতেসে, তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠেন।’

তিন সপ্তাহ পর অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শেষদিকে নিরাপদে নিউইয়র্কে ফিরে এলেন মা-ছেলে। আমরা আবার আগের রুটিন জীবন যাপন করছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তখন সবে নিউইয়র্ক নগরীতে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের আশঙ্কায়। তখনো লকড ডাউন ঘোষণা করেনি। ছোট ছেলেকে নিয়ে কোচিং থেকে বাড়ির দিকে ফিরছিলাম এক ভর দুপুরে। গাড়ি রেড লাইটে থামিয়েছি সবে। ফোন বেজে উঠে। হ্যালো বলতেই আম্মার কান্নাজড়িত কণ্ঠস্বর !

: তুমি কই ?
: এইতো বাসার কাছাকাছি।
: আমি তো পা নাড়তাম পারতেসি না ( হু হু করে কান্নার আওয়াজ )

বুকের ভেতরটায় তীব্র হাতুড়িপেটা শব্দ টের পাই। আঁতকে উঠি। আমার আব্বার কথা মনে পড়ে যায়। জীবনের শেষ কয়টি বছর প্যারালাইজড হয়ে দুর্বিষহ এক সময় পার করেছিলেন তিনি। মনে মনে বলি, স্রষ্টা, এমনটি যেনো না হয়। কী অলক্ষুণে ভাবনা ! নিজেকে নিজেই তিরস্কার করি। ঝড়ের বেগে গাড়ি চালাই। গ্যারাজে পার্ক করেই শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে দৌড়াই। ছেলেও ব্যাকপ্যাক কাঁধে আমার পিছু ছুটছে। ক্যাংগারুর মতো দুই সিঁড়ি করে লাফিয়ে উপরে আম্মার রুমে যাই। বুকের ভেতরে শ্বাসপ্রশ্বাসের তীব্র উঠানামা। দেখি, বড় ছেলে আপন মনে হোমওয়ার্ক করছে। তাদের বাবা পাশের রুমে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আম্মা দুই পা ছড়িয়ে বিছানায় বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত অবস্থায় বসে। ভীতসন্ত্রস্ত চোখ। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতো দ্রুত সম্ভব সরিষার তেল গরম করে আম্মার পায়ে ম্যাসেজ করতে থাকি। হাত ব্যথায় বিদ্রোহ করার আগ অব্দি ম্যাসেজ করতেই থাকলাম। অতঃপর তিনি খুব ধিরে মেঝেতে পা রাখলেন। দাঁড়ালেন।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে বারান্দার দিকে হেঁটে গেলেন বাইরের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিবেন বলে। তখন বাইরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। ম্লান আলো। ভেতরে আধো অন্ধকার। প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা। আমি তাঁর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভাবলাম, পাশে থাকা নাতিকে নয়, অন্যরুমে ঘুমিয়ে থাকা ছেলেকেও নয় ! কতোটা ভরসার মানুষ ভেবে আমাকেই ডাকলেন ! কারো জীবনের অন্তিম সময়ের ভরসার মানুষটি হয়ে বেঁচে থাকা নিশ্চয়ই ভাগ্যের!

সবাইকে মা দিবসের শুভেচ্ছা।

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।

শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.