নতুন সূর্য দিনের প্রতীক্ষায়

মৌসুমী বিশ্বাস:

ঘরবন্দী দিনযাপন যতবেশি দীর্ঘায়িত হচ্ছে নানান চিন্তার গভীরতা ততোই ডালপালা মেলছে। শুরুতে এই ‘বন্দীত্ব’ অবস্থা যতটা সহজ মনে হয়েছিল সময় যত গড়াচ্ছে ততোই মনে হচ্ছে সহজ কিছু সহজ নয় আসলে। আমাদের বৈচিত্র্যহীন ন’টা-পাঁচটা জীবন, প্রাত্যহিক যানজট, জীবিকার প্রয়োজনে উত্তর-দক্ষিণে ছুটে বেড়ানো আর কর্মক্লান্ত দিনশেষে ঘরে ফেরা মূলতঃ এই ছিল কোভিড-১৯ শুরুর আগে পরিচিত নগরীতে আমাদের দিনলিপি। অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হতো, শীতের দিন হলে চারদিক অন্ধকারই থাকতো। বাচ্চাকে স্কুল বাসে তুলে দিয়ে ব্লুটুথে রবীন্দ্রনাথের গান চালিয়ে আবার শুরু হতো সময়ের সাথে পাল্লা দেবার পালা। প্রতি সপ্তাহে অধীর আগ্রহে বৃহস্পতিবারের অপেক্ষায় থাকতাম। বৃহস্পতিবার বিকাল মানেই যেন পুনরায় জীবনের মানে খুঁজে পাওয়া। অফিস থেকে বের হয়ে অনেকটা পথ হেঁটে ফিরতাম। হাঁটতে হাঁটতে একটা বড় মাঠ পেরুতাম। মাঠের কিছুটা দূরে ঘাসফড়িংদের ওড়াউড়ি চলতো, ছেলেরা ব্যস্ত থাকতো ক্রিকেট খেলায়। মাঠের কোনায় কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল ফুটতো। কোন একসময় গাছটা পুরোপুরি লাল রঙে ছেয়ে যেত। প্রতিবছর এই সময়টার অপেক্ষায় থাকতাম। কবে সেই লালরঙা দিনটি আসবে।

কেন জানি মনে হতো, প্রতিবছরই গাছটার ফুলগুলো একটু একটু করে বেশি লাল হয়। তারপর আসতো ফুল ঝরার দিন। দূর থেকে দেখে মনে হতো নিচেয় ঘাসের ওপর লাল রঙের কার্পেট পেতে রেখেছে কেউ। এ বছরের ঘরবন্দী জীবনে এখনও দেখা মেলেনি গাছটির। সহকর্মীদের মুখ, ছুটির পর পরিচিত পথ ধরে বাড়ি ফেরা, পথের পাশে মাঠ, মাঠের পাশে ফুচকাওয়ালা সবাইকেই মিস করি আজ এই করোনা দিনে।

একটি একক পরিবারে সন্তান লালন-পালন করে দু’জন মিলে চাকুরি করার সবরকম যুদ্ধ ও বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করেই আমরা আরেকটি নতুন কর্মমুখর সকালের অপেক্ষায় থাকতাম। দিনশেষে যখন ছেলেকে ডে-কেয়ার থেকে নিয়ে রিকশায় ফিরতাম তখন আমাদের রাস্তা শেষ হয়ে যেত, কিন্তু মা-ছেলের সারাদিনে জমে থাকা গল্পরা শেষ হতো না। পথের পাশে হলুদ রঙের ঝুলে থাকা অদ্ভুদ সুন্দর ফুলগুলোর নাম যে ‘সোনালু’, সেগুলো একটু একটু করে আমরা দেখতাম আর চিনতে শিখতাম। আমরা সবুজ ঘাসফড়িঙের কথা বলতাম। কারেন্টের তারে চড়ুই পাখিদের বসে থাকতে দেখে একদিন ক্লাস টু’তে পড়া ছেলেটা (গতবছর সে টু’তে পড়তো) বললো, “মা চড়ুইয়ের ল্যাটিন নাম যে Passer domesticus, এটা কি তুমি জানো? মামা বলেছে।” না, আমি জানতাম না এই তথ্য। আমাদের মধ্যে বিতর্ক হতো, অফিস করা ভালো না স্কুলের ক্লাস বেশি মজার? কাজ শেষে প্রাত্যহিক সেই ঘরে ফেরা দিনগুলোকে মিস্ করি খুব।

অফিসে কর্মমুখর দিনের ফাঁকে বার দুয়েক চা খাওয়া হত। তখন সেই ফাঁকে সহকর্মীদের সাথে চলত নানান আলোচনা, কর্ম-পরিকল্পনা। অনেক সময় দেখা গেছে আমাদের চা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু কথা শেষ হয়নি। যেন বা ‘কথার ওপর কেবল কথা…”। এমনই কর্মব্যস্ততার মাঝে বন্ধুদের হঠাৎ ফোন আসতো কখনো, ‘‘আজ কিন্তু কফি ওয়ার্ল্ডে বসতে হবে”। তারপরের কয়েক ঘন্টা আমরা আর ঘড়ির দিকে তাকাতাম না। সময়গুলো কী দ্রুত ফুরিয়ে যেত!!

জানি ‘অদ্ভুত এক আঁধার এসেছে পৃথিবীতে’ আজ। কেউ জানে না কবে মিলবে মুক্তি। কিন্তু আমরা অধীর আগ্রহে সবাই ফিরতে চাই আমাদের পুরনো জীবনে। যে জীবনে আমরা অকারণে হেসে উঠবো, রাস্তায় যেতে যেতে কাছের মানুষদেরকে হঠাৎ দেখে দৌড়ে গিয়ে হাত ধরে বলবো, কতদিন দেখা হয়নি!! পথের পাশে পরিচিত চটপটিওয়ালা আমাদের দেখে হেসে উঠে বলবে, ‘আপা, কতদিন পর এলেন’! মোবাইলের স্ক্রিনে বন্ধুর নাম ভেসে উঠবে সপ্তাহান্তে ক্যাফেতে বসার আহ্বান নিয়ে। রিক্সায় যেতে যেতে খোলা অথচ বদলে যাওয়া আকাশের রং আর পাখিদের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে আমরা আবার ভাববো, ‘‘আমারে তুমি অশেষ করেছো, এমনই বীণা তব…”।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.