পাঠ্যক্রমের শিক্ষা এবং সৃজনশীলতা

শাহরিয়া দিনা:

যে শিক্ষা আপনার অন্তর আলোকিত করেনা, উদারতা শেখায় না, মানবতাবোধ জন্ম দেয় না, সে শিক্ষা তোতাপাখির মুখস্ত বুলি সমতুল্য। একটা ভালো কথা বলা তোতাপাখি ধনী ব্যক্তি দাম দিয়ে কিনেন যেমন, তেমনি আপনিও হয়তো ভালো একটা চাকরি পান। কিন্তু আপনার বিশ্বাসে রয়ে যায় কুসংস্কার, ভাবনায় থাকে অন্ধবিশ্বাস, আচরণে থাকে দাম্ভিকতা, কথায় থাকে কুতর্কের পর্যাপ্ত রসদ।

আনন্দহীন মুখস্ত বুলিতে তথ্য পাওয়া যায় বটে তবে তথ্যসমৃদ্ধ হওয়া যায় না। তাইতো আপনার পঠিত সিলেবাসের বাইরে কিছু দেখলেই আপনি গ্রহণ করতে পারে না। এমনকি বাছবিচার ক্ষমতাসম্পন্ন না হওয়ার কারণে নতুন কিছু মানেই নাকচ করে নাকউঁচু ভাব ধরেন। আদতে এতে কিন্তু মুর্খতাই ধরা পড়ে।

মানুষ প্রথমে শেখে তার পারিপার্শ্বিকতা দেখে তারপর পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে। পারিপার্শ্বিকতা সবার সমান নয়। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে উঠি আমরা। সামাজিকতার মধ্যেও রয়েছে শ্রেণিভেদ। অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় বিন্যাস ও বিভেদ। যে কাজটা কোন এক সমাজে করলে সেই সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে বলে রব ওঠে, সেই একই কাজ অন্য সমাজে হয়তো কেউ করে যাচ্ছে অবলীলায়।

গালি দেয়া, নোংরামি, মানুষকে অহেতুক হেয় করে কথা বলা কারো কাছে এইগুলা তেমন কোন ব্যাপারই না। কারন সে তার পরিবেশে এটাই দেখে এসেছে স্বাভাবিক। একটা ছেলে যখন দেখে, তার বাবা বউ পেটাচ্ছে তার মধ্যে নারীকে পেটানো যায় বোধ তৈরী হতেই পারে। যে পরিবারে মেয়েরা অবহেলিত সে পরিবারের ছেলে রাস্তাঘাটে অন্য মেয়েদের অবজ্ঞার চোখেই দেখবে। হ্যাঁ, ব্যাতিক্রম তখনই হবে, যখন তার আত্মোপলব্ধি তৈরী হবে বিবেক বোধ জাগ্রত হবে।

পাঠ্যক্রমের বাইরে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বই বা জ্ঞান আহরণ আপনি যতদিন না শিখবেন ততদিন আপনি ওই সিলিবাসেই আটকে রইবেন। আর অন্যদের নতুন কাজ দেখে হাসাহাসি করবেন। পঠিত সিলেবাস থেকেই যারা সৃষ্টিশীল কিছু করতে চান সেটা অনেকটা দুঃসাধ্য। নির্দিষ্ট গণ্ডিতে নিজের চিন্তা সীমাবদ্ধ করে সৃষ্টিশীল হওয়া যায়না। সৃজনশীলতার প্রয়োজনীয় শর্ত হচ্ছে মুক্তচিন্তার সক্ষমতা।

মানুষ মাত্রেই তার অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে, শুধু অসীম হচ্ছে তার কল্পনা শক্তি। এই কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগিয়েই হয়েছে আবিষ্কারের সূত্রপাত। লাইটবাল্বের আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসন বলে গিয়েছেন, যেকোনো আবিষ্কারের জন্য দুটি জিনিস প্রয়োজন— (১) কল্পনা (২) খুঁটনাটি অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে যেকোনো অসাধ্যকে জয় করা সম্ভব।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জিনিয়াসদের অন্যতম আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘Imagination is everything. It is the preview of life’s coming attractions. Imagination is more important than knowledge.’ কল্পনা শক্তি জ্ঞানের চেয়েও শক্তিশালী। কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যখন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় সাফল্য তখনই এসে ধরা দেয়। চিন্তার সংকীর্ণতা ব্যক্তির মধ্যে ঈর্ষা ও আত্ম-অহংকার তৈরি করে। উদারচিন্তা এবং আত্ম-জিজ্ঞাসার ফলে মানবিক বোধের জন্ম নেয়।

সীমাহীন অজ্ঞানতা নিয়ে নিজেকে বিজ্ঞ ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করা যায় বটে তবে, কারো কারো চোখে ঠিকই ধরা পড়ে আপনি ধনীলোকের ঘরে সুদৃশ্য খাঁচায় বন্দী একটা কথাবলা তোতাপাখির সমতুল্য মাত্র। যে আজীবন মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে কথা বলতে পারলেও মানুষ হতে পারবেনা কোনদিন।

শেয়ার করুন:
  • 563
  •  
  •  
  •  
  •  
    563
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.