মৃতের ফেসবুক!

জেবুন্নেছা জোৎস্না:

অনেকদিন ধরেই লোকমান সাহেবের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা ঝুলে ছিল, তার গর্জিয়াস সামাজিক মর্যাদা’র আইডি দেখে আজ তাকে একসেপ্ট করতে তার টাইম লাইনে যেয়ে দেখি উনি কিছুক্ষণ আগে মারা গিয়েছেন! একজন অপরিচিত লোকের জন্য মনটা খুব খারাপ লাগলো।

লোকমান সাহেব পয়ষট্টি বছর বয়সে মারা গেলেন। ঢাকায় স্কুলে থাকা অবস্থাতেই ষোল বছর বয়সে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন; তার টাইমলাইন জুড়ে প্রতিদিন সকালের এক্সারসাইজ আর খাবার মেন্যু দেখে বোঝা যায়, তিনি কতোটা স্বাস্থ্য সচেতনভাবে তার জীবনকে উপভোগ করছিলেন, সেইসাথে নিজেকেও রাখছিলেন চির যুবক। উনি বিপত্নিক, বিশ বছর আগে দ্বিতীয়বারের মতো মা হতে যাওয়া তার আট মাসের সুন্দরী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মারা যান ডাক্তারের ভুল ট্রিটমেন্টে। তার টাইমলাইনে সেই বেদনাবিধুর পারিবারিক ছবি, আর বর্তমানকালে তার নিঃসঙ্গ জীবনের ব্যস্ত থাকার ছবি; এই যেমন, একটা ছবিতে সাদা শার্টের ওপরের দুটি বোতাম খোলা, হাতে সাদা টাওয়েল, আর চুলগুলো মুভি স্টারদের মতো কপালের একপাশ থেকে থার্টি ডিগ্রী আ্যঙ্গেল হয়ে অন্যদিকে গিয়েছে.. ছবিটার ওপরে ক্যাপশন, ‘এইমাত্র শাওয়ার নিলাম”। অন্য আরেকটা ছবিতে, মাথায় হ্যাট, চোখে সানগ্লাস, শার্টের ওপর ঝুলে আছে লং মাফলার; স্মিত হাস্যের ঠোঁটের কোণে সিগারেট, হাতে ম্যাচ থেকে বের করা একটি দেশলাই কাঠি যেন জ্বালিয়ে দেবার অপেক্ষায়।

জেবুন্নেছা জোৎস্না

তার টাইমলাইনের একটু গভীরে যেতেই দেখলাম, উনার দু-বছর আগে একটা স্ট্রোক হয়েছিল, অসীম মনোবল আর উৎফুল্লতা নিয়ে উনি ধীরে ধীরে ফিরে এসেছেন স্বাভাবিক জীবনে, ছাত্রদের প্রিয় শিক্ষক ছিলেন একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়র। করোনায় যখন সব কিছু লকডাইন তখনও তিনি পার্শ্ববর্তী ফার্মেসীতে যেয়ে তাঁর সাপ্তাহিক ব্লাড প্রেসার আর সুগার মাপার কাজটি করে গেছেন সুস্থ থাকার তাগিদে; ফেসবুকে তাঁর বন্ধুদের সাথে আলোচনা করেছেন কিভাবে এর মধ্যেই স্বাভাবিক থাকতে হবে, কারণ জীবন তো থেমে থাকে না! এবারের নবর্বষ নিয়ে তার আক্ষেপ ঝরে পরেছে করোনার কারণে, আর প্রতিনিয়ত দিয়ে যাচ্ছেন করোনার আপডেট সকলকে সর্তককরণে!

এমন হাসি-খুশী একজন মানুষ যে কিনা সকালেও বন্ধুদের সাথে বেঁচে থাকার অভিযোজন নিয়ে কথা বললেন, আর দুপুরেই দ্বিতীয় হার্ট আ্যটাকে মারা গেলেন। এতো খারাপ লাগছিল যে আবেগবশতঃ হয়ে রাতে ঘুমাবার আগে তাকে একটা ম্যাসেজ লিখি, “জানি আপনি এ ম্যাসেজ দেখবেন না; তবু বলি, যেখানে গিয়েছেন আশাকরি নতুন জীবনে হারানো পরিবার নিয়ে ভাল থাকবেন”!

সকালে কর্ণকুহরে কিচির -মিচির-ইচির -পিচির ঝগড়ায় ঘুম ভাঙ্গলো। উফ্ঃ! চড়ুইগুলো যে এতো ঝগড়াটে হয় জানা ছিল না!
ব্যাপারখানা কী দেখবার জন্য পর্দা সরিয়ে উঁকি দিতেই দেখি,

জানালার ঘুগলিতে ওদের ছোট নাড়া-কুটার বাসায় আয়েশ করে বসে আছে এক গাড় বাদামী পাখি মাতা! আর তার সামনে সমস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে চড়ুই দল, কী কাণ্ড খানা! আমাকে দেখেই চড়ুই দল সরে গেলেও আগন্তুকের সরে যাওয়ার নেই কোন তাড়া, ভাবখানা এমন, আমি এ তল্লাটের মহারাজা! ঠিক যেমন অদৃশ্য করোনা, মানুষদেরকে গৃহবন্দী করে জগত জুড়ে চালাচ্ছে তার তাণ্ডব লালসা!

তারপর ফোন হাতে ম্যাসেঞ্জার চেক করতেই ভয়ে চোখ আমার ছানাবড়া, লোকমান সাহেব হেভেন হতে আমার ম্যাসেজ দেখছেন।
তার টাইমলাইনে যেয়ে দেখি লকডাউনের মধ্যেও তাঁর জানাযা করে তার শুভকাঙ্খীরা তাঁর দাফন কার্য সম্পন্ন করেছেন, সে কতো ভাল মানুষ ছিলেন তার নানা রকম স্মৃতিচারণ!
পরের দিন ঘটলো আরো অভাবনীয় ঘটনা, তাঁর ফেসবুকের সকল ফ্রেন্ড ভয় পেয়ে শুরু করলো দোয়া-দুরুদ পড়া: মৃত লোকমান সাহেব একটা ফেসবুকীয় গেম খেলছেন, যেখানে তাঁর নিজের একটা ছবির পাশে সুন্দর একটা বাচ্চার ছবি দিয়ে লেখা, “মিস্টার লোকমানের দ্বিতীয় ভবিষ্যত বাচ্চা’র ছবি”!

শেয়ার করুন:
  • 78
  •  
  •  
  •  
  •  
    78
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.