মে দিবসের শুভেচ্ছা নয়, মুক্তি পাক আমাদের চিন্তা

সামিনা আখতার:

যেদিন আমাদের ছেলেটা ইংল্যান্ডে ক্লাস শুরু করেছে ততদিনে গত তিন সপ্তাহ ধরে একটা গল্প ইংরেজি ক্লাসে পড়ানো হচ্ছিল এবং পরবর্তী সপ্তাহে ক্লাস পরীক্ষা। তাই শিক্ষিকা ভাবলেন নতুন ছেলেটি তো আর এতো তাড়াতাড়ি পারবে না, তাই যেন সে পড়তে থাকে সেজন্য গল্পের বইটি দিয়ে বললেন, তুমি আস্তে আস্তে পড়তে থাকো। কিন্তু বইপড়ুয়া ছেলেটি ক্লাসে এক বসাতেই শেষ করে ফেললো। ক্লাস পরীক্ষায়ও অনেক ভালো করে শিক্ষিকার প্রশংসাও পেল। কিন্তু সেটাই সব কথা নয় বরং আবেগ আপ্লুত সে বাসায় এসে আমাকে বললো, ‘মা, একটা অসাধারণ গল্প, পড়ে দেখো’। আমিও পড়লাম এবং সত্যিই খুব ভালো একটা বই। একটা নাটক।

J.B Priestley (John Boynton Priestley) জে বি প্রিসলির লেখা “An Inspector Calls”.

গল্পটা এরকম, খুব বিত্তশালী এক পরিবারে ডাইনিং টেবিলে বসেছে ঐ পরিবারের সবাই, বাবা, মা এবং তরুণ দুটি ছেলেমেয়ে আর তাদের সাথে আছে তাদেরই মতো বিত্তশালী অন্য একটি বন্ধু পরিবারের ছেলে, যার সাথে এই পরিবারের মেয়েটির বিয়ে হবার কথাই হচ্ছিল খেতে খেতে। এমন সময় একটি ফোন কল আসে যে ইভা স্মিথ নামের একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে, আর তাই এক পুলিশ ইন্সপেক্টর আসছে তাদের বাসায় সেটি (Inquiry) অনুসন্ধান করার জন্য। যে সময় গৃহকর্তা মি. বার্লিং তার হবু জামাতা জেরাল্ডকে বলছিলেন, ‘A man has to mind his own business and look after himself’ সে সময়ই ইন্সপেক্টর দরজার কলিং বেল দেয়।

পুলিশ প্রথমে বাবাকে আলাদা করে একটি মেয়ের ছবি দেখায় যাকে সে চিনতে পারে এবং নানা কথায় একসময় বেরিয়ে আসে দুই বছর আগে সে তার ফ্যাক্টরির শ্রমিক ছিল এবং তাকে তার নির্দেশেই ছাঁটাই করা হয়। মেয়েটি আরও কয়েকজন মেয়েকে নিয়ে তাদের সাপ্তাহিক বেতন ২২.৬ শিলিং এর জায়গায় ২৫ শিলিং দাবি করেছিল!

তারপর মেয়ে শেইলাকে আলাদা করে নিয়ে এই ছবি দেখালে সেও চিনতে পারে এবং নানা কথায় বেরিয়ে আসে যে মেয়েটি একটি ফ্যাশন শপে কাজ করতো। সেখানে একদিন ক্রেতা হিসাবে যায় শেইলা। বিক্রেতা মেয়েটি একটি ড্রেস পরে দেখালে সেটা শেইলার খুব পছন্দ হয়, কিন্তু যখন সে নিজে পরে আয়নায় দেখছিল তখন তার চোখ পড়ে ঐ বিক্রেতা মেয়েটির দিকে, এবং তার মনে হয় সে হাসছে তাকে দেখে। দারুণভাবে লেগে যায় তার বিত্তবান ইগোতে; সে ঐ দোকানের মালিককে চাপ দেয় ঐ মেয়েকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করার জন্য। সবচাইতে বিত্তবান নিয়মিত কাস্টমারের কথা ফেলতে পারে না ঐ দোকান মালিক।

একই প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন করা হলে বেরিয়ে আসে এই পরিবারেরই ছেলেটি ঐ মেয়ের সাথে সম্পর্ক করার পর তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে চলে যায়।
অবস্থার আরও অবনতি হলে মেয়েটি একটি চ্যারিটি সংস্থায় আবেদন করে সাহায্যের জন্য। সেই চ্যারিটি সংস্থার সভাপতি এই বিত্তশালী পরিবারেরই গৃহকর্ত্রী। তিনি সেই আবেদন নাকচ করে দেন।
এভাবে ঐ দরিদ্র মেয়েটির আত্মহত্যার জন্য এই পরিবারটির প্রত্যেকটি সদস্য কোন না কোনভাবে দায়ী।

গল্পের শেষটা মারাত্মক মেটাফোরিক!

ইন্সপেক্টর চলে যাবার পর ঐ পরিবার ফোন করে জানতে পারে যে কোন মেয়ে আত্মহত্যা করেনি আর কোন ইন্সপেক্টরও পাঠানো হয়নি। তারা আরও ভাবে, যে ছবি দেখানো হয়েছে এক একজনকে আলাদা আলাদা করে, সেটি কি একই মেয়ের ছবি নাকি ভিন্ন ভিন্ন মেয়ের ছবি!
ঘটনাটি সত্য নয় জেনে তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও নিজেকে দেখতে পায় নিজের আয়নায়। তবে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পরেই আর একটা ফোন কল আসে এবং এবার সত্যি সত্যি একটা মেয়ে আত্মহত্যা করেছে, এবং অনুসন্ধান করতে আসছে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর! নাটকটি এখানেই শেষ হয়।

খেয়াল করে দেখুন, উপরে যেখানে ঐ পরিবারটি ভাবছে তারা কি একই ছবি দেখেছিল নাকি ভিন্ন ভিন্ন ছবি, এই অংশটাতে লেখক চমৎকারভাবে একটা সমাজের চিত্রকে তুলে ধরেছেন। কারণ ছবিটা ঐ একটি মেয়ে ইভা স্মিথ বা ভিন্ন ভিন্ন মেয়ের হলেও বাস্তব অবস্থার কোনো পার্থক্য হয় না। কারণ সুতার কারখানায় কাজ করা, দোকানে কাজ করা, বিত্তবান ছেলের কাছে ধোঁকা খাওয়া, বিচার চেয়ে না পাওয়া এই মেয়েরা সবাই একই অবস্থার শিকার। আর এই অবস্থা তৈরি করে একটি অথবা অল্প কয়েকটি পরিবার।

লেখক প্রিসলির জন্ম ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের ব্রাডফোর্ড নামক একটি স্থানে ১৮৯৪ সালে। সেই সময় এই ব্রাডফোর্ড ছিল একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউন, যা ছিল উল আর ডাইং ফ্যাক্টরিতে ভরা। চল্লিশের দশকের মতো সেটা দুর্ভিক্ষ আর প্লেগের আতংকে না থাকলেও দারিদ্র্য সে স্থান ছাড়েনি। প্রিসলি এখানেই বড় হোন এবং হেম এন্ড কোম্পানি (Helm and Company) তে জুনিয়র ক্লার্ক হিসাবে চাকরি করতেন। এই নাটকটি লেখা এবং মঞ্চস্থ হয় ১৯৪৫ সালে, কিন্তু এর প্রেক্ষাপট নেয়া হয়েছে ১৯১২ সালের, যে সালে টাইটানিক ডুবেছিল। নাটকটিতে এক পর্যায়ে বিত্তবান গৃহকর্তা মি. বার্লিং বলেন, ‘Titanic is unsinkable’। কিন্তু সেই টাইটানিক ডুবে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিবিসি থেকে জেবি প্রিসলির একটা সাপ্তাহিক রেডিও টকশো প্রচারিত হতো, যা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। যদিও কনজারভেটিভরা সেটি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বলা হয় এইসবই ১৯৪৫ সালে লেবার পার্টির ভূমিধস বিজয় (Landslide Victory) এনে দিয়েছিল।

পাঠক, ইংল্যান্ডের ব্রাডফোর্ডে এখন আর অসংখ্য উল আর ডাইং ফ্যাক্টরির সেই অবস্থা নেই, আপনারা কি বলতে পারেন সেগুলো এখন কোথায়?সেগুলো এখন বাংলাদেশের মতো দেশে আর আপনার আমার আত্মীয় যাদেরকে গ্রামে ফেলে এসেছি, তারাই শ্রমিক এইসব ফ্যাক্টরিতে। আর আপনি আমি যারা একটু আধটু পড়াশুনার সুযোগ বা পড়াশুনা ছাড়াই আসার সুযোগ পেয়েছি ইংল্যান্ড এর মতো দেশগুলোতে, তারা এখানে এসেও সেই একই শ্রমিক!

পৃথিবীতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থ, সম্পদের এতো এতো জয়জয়কার, কিন্তু ইভা স্মিথদের কোনো পরিবর্তন নেই; তারা চাকরি হারায়, আত্মহত্যা করে! আর মাঝখানে কিছুটা সুবিধা পাওয়া আমরা একবারও প্রশ্ন করি না, পৃথিবীতে হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজের মত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এতো কম কেন? কেন অক্সফোর্ডের সারা গিলবার্ট করোনা ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পেলেও আমাদের দেশের ইভা স্মিথদেরকে সেই করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সমস্ত ঝুঁকিকে মাথায় নিয়ে কারখানায় ছুটতে হচ্ছে!

মে দিবসের শুভেচ্ছা নয়, বলবো না শ্রমিক মুক্তি পাক! বরং বলবো, আপনার আমার চিন্তা মুক্তি পাক! আমাদের কণ্ঠ অথবা কলম চিৎকার করুক জে বি প্রিসলির মতো!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.