সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহার এবং এক কর্মজীবী মায়ের অভিজ্ঞতা

উপমা মাহবুব:

শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নাকি উচিত নয়? দিলে কতটা সময়ের জন্য দেওয়া যায়? কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করবো কিভাবে – এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়৷ অধিকাংশক্ষেত্রেই দেখা যায় যে বিশেষজ্ঞ এবং অভিভাবকরা শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেওয়ার বিরোধী।

শিশুদের উপর মোবাইল বা ট্যাবে ইন্টারনেটে অতিরিক্ত সময় কাটানোর প্রভাব বিষয়ক অনেক গবেষণা হয়েছে। সেগুলোর বেশিরভাগের ফলাফলও নেতিবাচক৷ শিশুর বিকাশ বিষয়ে আমার কোনো এক্সপারটাইজ নেই। তাই কোনো গবেষণাকে চ্যালেঞ্জও করবো না। তবে একজন কর্মজীবী মা হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই। এগুলো যদি কারো কাজে লাগে বা শিশুর ইন্টারনেট ব্যবহারের ভালোমন্দ বিষয়ে নতুন কোনো চিন্তার উদ্রেক ঘটায় সেটাই হবে এই লেখার সার্থকতা৷

আমি ফেসবুকে একটা প্যারেন্টিং পেজ অনুসরণ করতাম। সেখানে এক ভদ্রলোক তার পোস্টে লিখেছিলেন, তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকুরীজীবী। সারাদিন অফিস করে তারপর ক্লান্ত শরীরে সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া বা তার মানসিক বিকাশের জন্য সময় বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পরে। তাই বাধ্য হয়ে তারা সন্তানকে ইন্টারনেট দেখতে দেন। তাঁরা লক্ষ্য করেছেন ইউটিউবে অনেক ভালো ভালো কনটেন্টও আছে৷ ওনারা চেষ্টা করেন উনাদের বাচ্চা যেন সেগুলো বেশি দেখে আর সময় কাটানোর পাশাপাশি সেখান থেকে ভালো কিছু শিখতে পারে। এই পোস্ট পড়ে ঐ পেজের এ্যাডমিনসহ সদস্য বাবা-মায়েরা পোস্টদাতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। একের পর এক কমেন্ট আসতে লাগলো-শিশুদের মোবাইল বা ট্যাবে ইন্টারনেটে সময় কাটানো মোটেই ভালো কাজ নয়, এতে শিশুর চোখ নষ্ট হয়, মেধার বিকাশ ব্যাহত হয়। পোস্টদাতা ভুল তথ্য দিয়ে নতুন বাবা-মায়েদের বিভ্রান্ত করছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি কিন্তু পোস্টদাতা ভদ্রলোকের সঙ্গে একমত৷ সমস্যাটা আসলে ইউটিউব ভিডিও দেখাতে নয়, সমস্যাটা নিহিত আছে, শিশুরা ইউটিউবে কী দেখছে, সেখান থেকে কী শিখছে এবং কতক্ষণ ধরে ইন্টারনেটে সময় কাটাচ্ছে সেখানে।

আমাদের কন্যা প্রমিতির বয়স যখন তিন বছর তখন সে একদিন একটা বোর্ডে ইংলিশ বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘এ’ লিখে আমাদের অবাক করে দিয়েছিল। অথচ আমরা তাকে কোনো বর্ণমালাই শিখাইনি। সে ইউটিউবে ইংরেজি বর্ণমালা নিয়ে বানানো এনিমেটেড ভিডিও দেখতে দেখতে নিজে নিজেই ‘এ’ লেখা শিখে নিয়েছিল। বিভিন্ন রং-এর নাম, ছড়া ও গানও প্রমিতি ইউটিউব থেকে শিখেছে।

আস্তে আস্তে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রমিতি ইন্টারনেটে আরও নানা রকম কনটেন্ট দেখা শুরু করে। একদিকে আমরা স্বামী-স্ত্রী চাকুরিজীবী হওয়ায় ওকে তেমন সময় দিতে পারিনা, অন্যদিকে আমরা চাইতাম প্রমিতি প্রযুক্তির ব্যবহার জানুক, আধুনিক যুগের সুবিধাগুলো উপভোগ করুক এবং প্রগতিশীল মানসিকতায় বেড়ে উঠুক। সে সময় আমরা তাই তাকে তার পছন্দমত কনটেন্ট, যেমন: গেইমস, বিভিন্ন খেলনার রিভিউ, বাচ্চাদের উপস্থাপনায় নানারকম শো ইত্যাদি দেখতে দিতাম। একইসঙ্গে ইউটিউবে রুপকথার গল্পের এনিমেটেড ভিডিও দেখা, ছড়া ও গান শোনা, ছবি আঁকা শেখা ইত্যাদিতে অভ্যস্ত করে তুলতে লাগলাম। এটা ঠিক যে এমন একটা সময় আসে যখন প্রমিতি অতিরিক্ত ইউটিউব নির্ভর হয়ে পড়ে। আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে সে দিনে নয়-দশ ঘন্টা ইউটিউব দেখতো। এ সময়টাতে সে অস্থিরতায় ভুগতো, খাওয়া ও ঘুমানো দুটোই তার অপছন্দের বিষয় হয়ে গিয়েছিল। কথা শুনতে চাইতো না, মেজাজও খারাপ থাকতো। আমার হাসবেন্ড বিষয়টা খেয়াল করে তার ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় কঠোরভাবে নির্ধারণ করে দেয়। এরপর প্রমিতি আবারও তার স্বভাবসুলভ হাসিখুশি অবস্থায় ফিরে আসে।

তবে এটা মুদ্রার একপিঠ মাত্র। নিয়ম মেনে ইউটিউব ব্যবহার করতে দেওয়ার যে সুফল পেয়েছি তার মাত্রা কুফলগুলোর চেয়ে অনেক অনেক বেশি। মাত্র সাত বছর বয়সেই প্রমিতি প্রযুক্তির ব্যবহার খুব ভালো বোঝে। ও বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়ে কিন্তু ও খুব ভালো ইংলিশ বলে। যখন অনেক ছোট ছিল তখন থেকেই ওকে আমি ওর বয়সী কোন শিশুর আঁকা ছবি ইউটিউব থেকে বের করে বলতাম- এটা দেখে দেখে আঁক। তখন থেকে আঁকাআঁকিতে তার অনেক আগ্রহ। এখনো বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ছবি নেট থেকে বের করে আমি প্রমিতিকে সেগুলো আঁকতে উৎসাহিত করি। বিষয়টা এমন হয়ে গেছে যে ইউটিউব থেকে প্রমিতি এখন ধাঁধাঁ, জাদু- এসবও শেখে! সৃজনশীলতার বিকাশে সে বাবা-মায়ের উপর নির্ভরশীল নয়। আমাদের তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করছি মাত্র।

লকডাউনের এই সময়টাতে আমরা সবাই যখন কিভাবে সময় কাটাবো তা নিয়ে চিন্তা করছি, তখন প্রমিতিকে ইউটিউবে কাগজ দিয়ে নানা রকম জিনিস বানানোর টিউটোরিয়ালের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিয়েছি। বন্ধের এই দিনগুলোতে কাগজ দিয়ে নিত্য নতুন ওরিগামি বানিয়ে তার সময় কাটছে। প্রমিতি হলিউডের বিভিন্ন এনিমেটেড ছবির খবর জানে, মাঝেমাঝেই ইংলিশ গান গেয়ে আমাদের অবাক করে দেয়। তাই আমার মনে হয় বাবা-মা যদি সন্তান ইউটিউব কতক্ষণ দেখবে আর ইউটিউবে কী দেখবে – এই বিষয়গুলোর দিকে একটু নজর রাখতে পারেন এবং শিশুকে ইউটিউব থেকে তার বয়সোপযোগী কোনো স্কিল অর্জনে উৎসাহিত করা যায় তাহলে তা শিশুর বিকাশে সহায়কই হবে। শিশুকে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ ও আধুনিক মানসিকতার ব্যক্তি হিসেবে বড় হয়ে উঠতে সহযোগীতা করবে।

অনেক বাবা-মাকে বলতে শুনি – আমরা আমাদের বাচ্চাকে একদমই মোবাইলে ইন্টারনেট দেখতে দেই না। এমনও বলতে শুনেছি, আমরা বাচ্চাকে বাণিজ্য মেলায় নিয়ে যাই না। আমরা ওকে নিয়ে বইমেলায় যাই যেন সে সৃজনশীল হয়ে বেড়ে উঠে। হতে পারে এগুলো ভালো অভ্যাস। শিশুর মানসিকতা ও সৃজনশীলতার বিকাশে প্রয়োজনীয়ও বটে। তবে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, যে শিশুটিকে বই পড়তে অভ্যস্ত করে তুলছি বা যাকে ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাটি করতে দিচ্ছি না তার মধ্যে ভবিষ্যতে ইউটিউবার হওয়ার বা প্রযুক্তিবিদ হওয়ার যেকোনো সম্ভাবনা নেই তা আমি কীভাবে বুঝলাম? আমার মতে চারপাশের পরিবেশ এবং বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় হওয়াটাও অনেক জরুরি। তাই শিশুকে তার পারিপাশ্বিক বাস্তবতা ও আধুনিক বিশ্বের সব সুযোগসুবিধার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত। বিশেষ করে প্রযুক্তির সঙ্গেতো অবশ্যই৷

শিশুকেই নির্ধারণ করতে দেওয়া উচিত সে কী বড় হয়ে সাহিত্যিক হবে নাকি ইউটিউবার হবে। আঁকিয়ে হবে নাকি গ্রাফিক্স ডিজাইনার হবে। ডাক্তার হবে নাকি মডেল হবে। দিন শেষে জীবনটা তার নিজের। তাই আমরা চেষ্টা করি আমাদের কন্যার সামনে সম্ভাব্য সবগুলো পথই খুলে রাখতে। কোন পথটি সে হাঁটার জন্য বেছে নেবে সেটা না হয় একটু বড় হয়ে সে নিজেই নির্ধারণ করবে।

উপমা মাহবুব
উন্নয়ন পেশাজীবী ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.