চন্দ্রা দত্ত, সারাহ গিলবার্টদের কথা ইতিহাস মনে রাখবে

নাসরীন রহমান:

বিজ্ঞানী বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে নিউটন, আইনস্টাইন আরও পুরুষ বিজ্ঞানীদের ছবি; সেখানে নারী বিজ্ঞানীরা একপ্রকার অবহেলিতই বলা চলে।

বিজ্ঞানের জগতের নিয়ন্ত্রণ এখন পর্যন্ত পুরুষের কব্জায়। সেই ১৯০৩ সালে যখন মেরি কুরি বিজ্ঞানে প্রথম নোবেল পুরস্কার পান তারপর থেকে রসায়ন, পদার্থ ও চিকিৎসা শাস্ত্রে ছয় শ পুরুষ নোবেল বাগিয়ে নিতে পারলেও, নারীরা পেয়েছেন মাত্র ১৯টি।

হাজার বছর ধরে নারীরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কারে অসাধারণ অবদান রাখলেও তাঁদের মূল্যায়ন হয়েছে কম! জীবন বাঁচানো ওষুধ থেকে শুরু করে দুনিয়া বদলে দেয়া যন্ত্রপাতি ও সুদূরপ্রসারী গবেষণা কীনা করেছেন নারী বিজ্ঞানীরা, তবু্ও নারীর এই অবদানকে অবহেলাই করা হয়।

সারাহ গিলবার্ট

অনেক নারী বিজ্ঞানীদের নাম আবার ইতিহাসের পাতায় ঠাঁইও হয়নি! কিন্তু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নারীদের এই অসম মূল্যায়নের দিন বোধকরি শেষ। নারী বিজ্ঞানীদের দক্ষতা, ক্ষমতা, শক্তিমত্তা নতুন করে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে আজ। কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধক আবিষ্কারের চলমান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নারী বিজ্ঞানীরা তাদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছেন আবারও!

আজ সারাবিশ্ব যেখানে ভয়ে আক্রান্ত, সেখানে ত্রাণের দেবী হয়ে এসেছেন নারী বিজ্ঞানীরাই। সারাহ গিলবার্ট, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাকসিন বিজ্ঞানী অধ্যাপক, সারা পৃথিবীই বলতে গেলে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। এর আগে ইবোলা ভাইরাসের সফল ভ্যাকসিন তৈরি করেছিলেন তিনি। মার্স ভাইরাসটি আবিষ্কারের পিছনেও তাঁর অবদান।

এবার করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক পরীক্ষা করে দেখছেন সারাহ ও তার দল। সারাহর নেতৃত্বে অক্সফোর্ডের গবেষক দলটি ২৩ এপ্রিল মানবদেহে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করেন। প্রথম ধাপে ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ৫৬১ জন স্বাস্থ্যবান স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে প্রয়োগ করা হবে ৫৫১ জনের শরীরে। মে মাসেই চলে আসবে ফলাফল।

শুধু সারাহ গিলবার্ট এর নামই বা বলি কেন? এলিসা গ্রানাতো– অক্সফোর্ডের নতুন ভ্যাকসিনটা প্রথম যার শরীরে দেয়া হলো, তিনিও নারীই। তার মানে বিশ্বকে বাঁচাতে নিজেকে গিনিপিগ হয়েছেন তিনি। শরীরে এন্টিবডি তৈরি হলে তারপর দেয়া হবে করোনা ভাইরাস। ভ্যাকসিন কাজ না করলে তার মৃত্যুও হতে পারে। এটা জেনেও নতুন আবিষ্কারের পথে হেঁটেছেন তিনি।

চন্দ্রা দত্ত

আরেকজন নারী, বাঙালী নারী, চন্দ্রা দত্ত। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এই বিরাট কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাঙালী এই নারীর নাম! কোভিড-১৯ মহামারীর প্রতিষেধক তৈরির কাজে চন্দ্রার দায়িত্ব ছিল ওষুধের কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্সের দিকে নজর রাখার। যাতে মানুষের শরীরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা না দেয়। গবেষণাপত্রের খসড়া দেখে একাধিক পরিবর্তন ও পরিবর্ধনও করেছেন চন্দ্রা। এই ভ্যাকসিন সফল হলে সারাবিশ্ব বেঁচে যাবে এই মহামারী থেকে। বিশ্বসভ্যতা অনেকদূর এগিয়ে যাবে।

কলকাতায় বড় হওয়া এবং পড়াশোনা করা চন্দ্রা এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, গবেষণার সমস্ত কাগজপত্র পরীক্ষা করে কোয়ালিটি প্রফেশনালদের কাছে তা পাঠানো হয়। তারা সব দেশে যখন সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন, তখনই এই ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত হয়। সেদিক দিয়ে গত বুধবার দিনটি ছিল ইতিহাসের এক বিখ্যাত দিন। তিনি এটাও বলেন যে, ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির হয়ে এতোদিন কাজ করেছেন, কিন্তু মানব ইতিহাসের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের অংশ হতে পেরে তিনি যারপরনাই আনন্দিত এবং গর্বিত।

এই নারী বিজ্ঞানীদের অসামান্য অবদান, সাহস যোগাচ্ছে বিশ্বের তাবৎ মানুষকে। সবাই আজ তাকিয়ে আছে এই নারী বিজ্ঞানীদের দিকে। হাজার বছর ধরে নানারকম বাধা সত্ত্বেও নারী বিজ্ঞানীরা নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনে মেধা ও শ্রম দিয়েছেন। তাদের কাজের মাধ্যমে তারা প্রতিনিয়ত চেনা পৃথিবী বদলাতে ভূমিকা রেখেছেন।

বর্তমান কোভিড – ১৯ এর এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সারাহ গিলবার্ট ও তার সহকর্মীদের এই সাফল্য তাই যেমন মহামারীর পরিস্থিতিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস, তেমনই চন্দ্রা দত্তের অসামান্য অবদান তথা কোভিড-১৯ মহামারীর প্রতিষেধক তৈরির কাজে চন্দ্রার সম্পৃক্ততা বাঙালী হিসাবে আমাদের জন্য গর্বের বিষয়ও বটে।

শেয়ার করুন:
  • 321
  •  
  •  
  •  
  •  
    321
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.