নারীর দোষের শেষ নেই!

নাসরীন রহমান:

করোনা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সারাবিশ্বে একদিকে যেমন নারী নেতৃত্ব ও নারী বিজ্ঞানীদের জয়গান হচ্ছে, তেমনি তার সাথে পাল্লা দিয়ে আরেকদিকে বাড়ছে এর বিরোধিতাকারীদের কণ্ঠস্বরও! লক্ষ্য করেছি নারীর শক্তি, দক্ষতা, ক্ষমতা, যোগ্যতাকে যারা ভয় পান, তারাই নারীকে নিয়ে ঢালাও মন্তব্য করেন। ‘পুরুষতন্ত্র’ শব্দটি শুনলেই যাদের গায়ে জ্বালা ধরে, তারাই নারীকে নিয়ে অসংবেদনশীল মন্তব্য করতে থাকেন।

তেমনি একটি উদাহরণ মাওলানা তারিক জামিল। পাকিস্তানের জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার ও তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় দাঈ মাওলানা তারিক জামিল।

সারাবিশ্বই আজ পর্যদুস্ত কোভিড ১৯ এর কাছে। সেই হিসেবে পাকিস্তানও আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত দেশটিতে ১২ হাজার ৭২৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, আর প্রাণহানি হয়েছে ২৬৯ জনের। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে দেশটিতে।

এই সংকটময় মুহূর্তেও বিশ্বের অন্যান্য জায়গার সাথে সাথে পাকিস্তানে থেমে নেই নারীর প্রতি দোষারোপ, অসংবেদনশীল বক্তব্য! দেশটিতে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় নারীদের দায়ী করে তারিক জামিল বললেন, নারীদের অসভ্যতা ও পোশাক-আশাকের অশ্লীলতার কারণে এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুবসমাজকে ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে বিপথগামী করায় সৃষ্টিকর্তা এই করোনা গজব দিয়েছে। এসময় তিনি লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের উপর গজবের বিষয়টিও তুলে ধরেন।

অথচ এই লোকটি কি জানেন না যে সারাবিশ্ব আজ তাকিয়ে আছে যার মুখের দিকে তিনি একজন নারী বিজ্ঞানী! মার্স ভাইরাস, ইবোলার মতো মহামারীকে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সেই সারাহ গিলবার্টের দিকে তাকিয়ে আছে এখন পুরো দুনিয়া, করোনার প্রতিষেধক আবিস্কার করছেন তিনি।

এই সময়ে মাওলানা তারিক জামিলের এই ধরনের বক্তব্য শুধু হাস্যকরই নয়, মুর্খতাও বটে!

আসলে কী চান এরা? নারীরা ঠিক কীভাবে চললে এরা খুশি হন?

নারীর পোশাক-আশাক নিয়ে এতো আপত্তি, এতো মন্তব্য শুনতে শুনতে এখন আর কোনো বোধ কাজ করে না। এসব লোকজন কিন্তু বলতে পারেন না কেন তবে হিজাব পরা নারীরাও ধর্ষিত হয়? তারা তো চানই যে নারীরা হিজাব, বোরখায় নিজেদের আবৃত করে রাখুক, তারপরও কেন ঘটছে এসব? কী উত্তর আছে তাদের?

রোগবালাই যদি নারীর পোশাক-আশাকের কারণে হয় তবে বিজ্ঞান, চিকিৎসা শাস্ত্র সবই কি মিথ্যে?

কিছুদিন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখছি, ধর্ম এবং বিজ্ঞান এই দুই বিষয় নিয়ে বেশ তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। আমি এ জাতীয় তর্ক সচেতনভাবে এড়িয়ে চলি। ধর্ম যার যার বিশ্বাসের ব্যপার। আর বিজ্ঞান যুক্তি, তর্ক, বিশ্লেষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার। একটিকে আরেকটির প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে আমি রাজি নই। কিন্তু তাই বলে ধর্মের নামে অজ্ঞতা, কুসংস্কার, গোঁড়ামি সমর্থন করা যায় না কোন অবস্থাতেই।

নারীকে নিয়ে যারা অসংবেদনশীল মন্তব্য করেন তারা আসলে নারীর সক্ষমতাকেই ভয় পান। নারী এদের ভাবনার চাইতেও বেশি কিছু বলেই এরা এতোটা চটে থাকেন নারীর উপর! বুদ্ধিতে না পারলে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হলেও জিততে হবে, যেন একটা প্রতিযোগিতা চলছে কোথাও!

আজ মাওলানা তারিক জামিল নারীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন কোভিড ১৯ এর জন্য, অথচ সারাহ গিলবার্টের প্রতিষেধক করোনার বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করলে এর সুবিধাভোগী হবে সারাবিশ্বের মানুষই। সেখানে “পুরুষ” বলে কেউ বঞ্চিত হবে না প্রতিষেধক থেকে; বেছে বেছে নারীকেই শুধু প্রতিষেধক দেয়া হবে না কিন্তু। তখন কোথায় যাবে এসব দোষারোপের রাজনীতি?

শুধু সারাহ গিলবার্ট এর নামই বলি কেন? এলিসা গ্রানাতো– অক্সফোর্ডের নতুন ভ্যাকসিনটা প্রথম তার শরীরে দেয়া হলো, শরীরে এন্টিবডি তৈরি হলে তারপর দেয়া হবে করোনা ভাইরাস। ভ্যাকসিন কাজ না করলে তার মৃত্যুও হতে পারে। সারাবিশ্বের মানুষের জন্য যে নারী নিয়েছেন জীবনের এই ঝুঁকি; তবুও কি আমরা বলবো নারী তুই নষ্টা, ভ্রষ্টা, পাপী, দায়ী!

পুরুষতন্ত্রের ধারক-বাহকদের বলছি, নারীকে নিয়ে আপনাদের অনেক ভাবনা, চিন্তা, অভিযোগ। নারীর আচার আচরণ পোষাক পরিচ্ছদ নিয়ে অনেক আপত্তি আপনাদের; আমরা নারীরা বলি কী, এবার এই সংকীর্ণ চিন্তাধারা থেকে বরং বেরিয়ে আসুন।
দৃষ্টিকে প্রসারিত করুন, রক্ষণশীলতা দূর করে প্রকৃত শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোন। দেখবেন অহেতুক নারীর প্রতি দোষারোপের সংকীর্ণতা থেকেও নিজেদের মুক্ত করতে পারবেন তখন!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.