Domestic Violence- অনুচ্চারিত দু’ শব্দের নাম

যূথিকা গোলদার:

Domestic Violence এর শাব্দিক অর্থ পারিবারিক সহিংসতা। দাম্পত্য জীবনের কলহ সম্পর্কিত  আলোচনাতে বা সামাজিক সমস্যাভিত্তিক আলোচনাতে এই শব্দ দুটোর ব্যবহার ভীষণ কম। পাশ্চাত্যে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স একটি অপরাধ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমাদের দেশে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে  প্রকাশ্যে আলোচিত হয় না, কিংবা বিচার অবধি গড়ালেও কয়টা সাজার মুখ দেখে, তা বলাই বাহুল্য। তাই বলে কি আমাদের সমাজে এই ঘৃণ্য অপরাধটা নেই ? নিশ্চয়ই আছে, বরং অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে রয়েছে। কিন্তু এই অপরাধটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য তো করা হয়ই না, উল্টো গোটা বিষয়ের অস্তিত্বকে সযত্নে এড়িয়ে চলি আমরা।

Domestic Violence এর সংজ্ঞা অনেক রকম হতে পারে।  বিশাল পরিসরের বিষয়টিকে এখানে ছোট্ট পরিসরে নিয়ে এসে শুধু পারিবারিক সম্পর্কের মাঝে ঘটে যাওয়া অত্যাচারের অংশবিশেষ নিয়ে লিখছি আজ।

এই অত্যাচার হতে পারে শারীরীক অথবা মানসিক। মেয়েদের নিয়ন্ত্রণের নানান কৌশল যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একবিংশ শতাব্দীর দু’দশক পার করে এসেছি আমরা,  পৃথিবী অনেকটা এগিয়েছে, মেয়েরা অনেকটাই প্রগতিশীল হয়েছে, তবুও তাদের সামগ্রিক ভাগ্য বদলেছে কি ? মেয়েদেরকে নিয়ন্ত্রণ করবার কৌশল হয়তো খানিকটা বদলেছে, কিন্তু “মেয়েদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে”  এই মূল ভাবনাটা তেমনভাবে বদলায়নি।

একটি ছেলে আর একটি মেয়ে যখন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি নতুন সংসার শুরু করে,  সেখানে থাকবার কথা ছিলো একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসা। তেমনটি হয় কি?

অলিখিত ভাবে মেয়েটি তথা বাড়ির বৌটি ঐ বাড়ির একটি বস্তুতে পরিণত  হয়, যার মালিকানা সম্পূর্ণ ছেলেটির, তথা ছেলেটির গোটা পরিবারের। এরপর সংসারে সুখ ধরে রাখবার দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া হয় মেয়েটির ওপর। দায়িত্ব পালনে ঘাটতি হলে অকথ্য নির্যাতন নেমে আসে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সীমাবদ্ধ থাকে মৌখিক নির্যাতনে, কারণ গায়ে হাত তোলাটা ভদ্র সমাজে একটুখানি অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হয়। একটা মানুষের কাজে ভুল হতেই পারে, তাকে সংশোধনের জন্যে কিছু বলা যেতেই পারে, কিন্তু সে ভাষাতে কেনো থাকবে বর্বরতা ? মেয়েটি যদি শ্বশুরবাড়িতে কাজে ভুল করে তবে শাশুড়ি তাকে কাজ শেখাতে গিয়ে টেনে আনেন মেয়ের মায়ের ব্যর্থতার কথা। মায়ের অপরাধ হলো কেন মেয়েকে সব কাজ না শিখিয়ে শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়েছেন। শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যরাও বৌকে শুধরানোর গুরু দায়িত্বে সানন্দে অংশগ্রহণ করেন। ব্যতিক্রম কিছু রয়েছে, সেই ব্যতিক্রমের জয় হউক, এটা আমাদের সকলের চাওয়া।

এ তো হলো শ্বশুর বাড়ির সদস্যদের কার্যকলাপ। যে মানুষটির হাত ধরে এই নতুন যাত্রা, তার কাছে থেকে ভালবাসা আর সম্মান পাবে এমনটিই হবার কথা, কারণ একটি বিয়ে শুধু ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নেওয়া নয়। অথচ স্বামীর কাছ থেকে যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছেন স্ত্রী, খুব ভালো করে খতিয়ে দেখলে অমন সৌভাগ্যবতীর সংখ্যা হবে ভয়ানক রকমের সীমিত। দেশে-বিদেশে এই গল্পগুলো কিছুটা ভিন্ন রূপ নিলেও  নির্যাতিতা মেয়েদের ভাগ্য কম বেশী একই রকম।

যদি ঘরের বৌ বাইরে চাকরি না করে ঘর সামলাতে সবটুকু শক্তি ক্ষয় করে, দিনশেষে তবুও হয়তো তাকে শুনতে হয়, “এই কাজটাও ঠিকমত করতে পারোনি? সারাদিন কী করো ঘরে?

ইনকাম তো করো না, বুঝবে কী ? “

আর যদি চাকরি করে বৌ, তবে তো হয়েই গেলো। অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলেই নানান কৈফিয়ত তলব করা হবে। চাকরিতে উন্নতি করলে সে ক্ষেত্রে ধরেই নেওয়া হবে বৌ নিশ্চয়ই বসের সঙ্গে রাত্রিযাপন করেছে।

কোনো কোনো মেয়ের নিজের সম্পর্কে নোংরা উক্তি শুনতে শুনতে গা সওয়া হয়ে যায় । কেউ বা সহ্য করতে পারে না, তবুও হজম করে নেয়। এই হজম করতে পারাটাও খুব কঠিন,  প্রতিবার একই রকম কষ্টে নীল হয় তারা। বেশ্যা, মাগী এমন গালাগাল তথাকথিত শিক্ষিত পুরুষের মুখ থেকেও অনর্গল বের হয়।

স্বামীদের নিজেদের স্বভাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকবার দায়ও মেয়েদের। রেগে গিয়ে বৌ এর গায়ে হাত তুলবে তারা কিন্তু সে দায় এসে পড়বে বৌ এর ওপর- “তুমি আমাকে রাগালে বলেই তো হাত তুলতে হলো“।

মেয়েরা শিখে নেয় আত্মসম্মান ভুলে বেঁচে থাকবার বোধহীন কায়দা। নির্যাতনের দাগ লুকোতে শাড়ি, ওড়নার আশ্রয় নিতে শিখে নেয় অনায়াসে। মুখের ওপর কালচে দাগ ঢাকতে ফেইস পাউডার মেখে নেয় দারুণ নৈপুণ্যে র সাথে। এমনি নানান কষ্ট চেপে প্রতিদিন মরে মরে বেঁচে থাকে সহস্র নারী।

চার দেয়ালের ওপাশের গল্পগুলো বাইরে আসে না, তাই জানা হয় না কারও সেসব নীলবেদনার সাতকাহন।

একটা মানুষকে মানুষের মর্যাদা না দিয়ে, তাকে অত্যাচারে অত্যাচারে জর্জরিত করে হাতের মুঠোয় বা পায়ের তলায় রেখে দেবার অধিকার এ পৃথিবীতে কারো নেই। স্বামীর তকমা পেয়ে যারা মনে করে যে স্ত্রী বা নারীর মনিব হয়ে যায় তারা, তাদের সে সুখস্বপ্ন ভেঙ্গে দেবার সময় এসেছে। অকথ্য নির্যাতনে মেয়েটির সর্বস্ব শেষ করে দেবার মত অপরাধ করে যারা,  তাদেরকে অপরাধী ভাবতে শিখবার সময় এসেছে। পরিবারের অন্যান্য সদস্য যারা এই অপরাধটিকে প্রশয় দিয়ে আসছে, আমার চোখে তারাও সমান অপরাধী।

আসুন আমরা অপরাধকে অপরাধ বলতে শিখি, সে অপরাধে অপরাধীকে শাস্তি দেবার দাবিতে সোচ্চার হলে হয়তো বদলাবে কিছু মেয়ের ভাগ্য। আসুন বদলে দেই এ পৃথিবীটা,  ধীরে ধীরে হলেও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের খাতিরে।

যূথিকা গোলদার
ট্রাফিক ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার,
এস সি ডি ও টি , ইউ এস এ

শেয়ার করুন:
  • 687
  •  
  •  
  •  
  •  
    687
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.