করোনাক্রান্ত বাংলাদেশ: নারী নির্যাতনের নতুন অধ্যায়

জিনাত আরা হক:

কেস ১: সোহানার (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়েছে পাঁচ মাস। মাত্র পাঁচদিনের মুগ্ধতায় সিঙ্গেল পরিচয়ের ইতি টেনে বিয়ের পিঁড়িতে বসে সোহানা। পাপনের (ছদ্মনাম) জোরাজুরি, স্মার্টনেস আর প্রতিশ্রুতিতে সোহানা তার কন্যাসন্তান নিয়ে দ্বিতীয়বার সংসার গড়ার আশায় বুক বাঁধে। নিজের চাকুরি, ঠিকানা সব ছেড়ে উঠে ধানমন্ডিতে পাপনের সংসারে। ডিভোর্সি পাপনের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে বুকে টেনে নেয়। এপ্রিল মাসে যখন পুরো দেশ কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ প্রকোপ আর সরকারের হুঁশিয়ারি-ঘরে থাকার নির্দেশ; তখন পাপন সোহানাকে ঘর থেকে বের করে দেয়, হাতে ধরিয়ে দেয় ডিভোর্সের নোটিশ।

কেস ২: পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার মাছপাড়া ইউনিয়নের কালামনগর গ্রামের নুরজাহান (ছদ্মনাম)। স্বামী মোত্তালেব (ছদ্মনাম) দিনমজুর। করোনার প্রকোপে মোত্তালেবের দিনমজুরির কাজ নেই। মোত্তালেবের চিন্তা, সংসার চলবে কীভাবে! উপায় তো আছেই, নুরজাহানের বাপের বাড়ি। না কোন যৌতুক না, যেহেতু মেয়ের জামাইয়ের কাজ নাই, হাত খালি, তাই শ্বশুরই ভরসা। মেয়ের জামাই বলে কথা; শ্বশুরের কাছে তো আর ছোট হওয়া যাবে না, তবে শ্বশুরের মেয়েকে কাবু করা সম্ভব। আর মেয়ের উপর নির্যাতন বন্ধ করতে শ্বশুর যেনো টাকা পয়সা পাঠায়, তাই নুরজাহানের উপর চলে অকথ্য নির্যাতন।

কেস ৩: চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের শিকার চামেলি (ছদ্মনাম)। কোর্টে চলছিলো সাক্ষিদের জবানবন্দি। ধর্ষণ মামলার অন্যতম আসামি চামেলির এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। করোনার ত্রাণ এসেছে চেয়ারম্যানের কাছে, কিন্তু চামেলির ঘরে তা পৌঁছেনি। অটোচালক চামেলির স্বামী অসহায়ের মতো কখনো ওসি, কখনো উকিলকে বলছে, কীভাবে চেয়ারম্যানের চামচারা হাসিঠাট্টা করছে তাদেরকে নিয়ে, বিচার চাওয়ার আগে তো না খেয়েই মরার উপক্রম তাদের।

জিনাত আরা হক

কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়, প্রতিদিন এমন ভিন্ন ভিন্ন নির্যাতনের ঘটনা আসছে আমাদের কাছে, সকলে ব্যস্ত করোনার আপডেট নিয়ে আর আমাদের ঘরে ঘরে নারীরা লড়ছে তাদের পুরোনো শত্রু “পুরুষ ভাইরাসের” বিরুদ্ধে।

কোভিড-১৯ এর আশংকা থেকে মুক্ত হতে যে ঘরকে আশ্রয়স্থল হিসেবে গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে, সে ঘর তো অধিকাংশ নারীর জন্য করোনা ভাইরাসের মতই অনিরাপদ, ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পুরো বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন তার স্বামী ও তার পরিবারের সদস্য দ্বারা শুধুমাত্র শারীরিক নির্যাতনের শিকার। সারাবছর যে শঙ্কায় নারীর জীবন কাটে, এই বুঝি তাকে ঘরছাড়া হতে হবে, আজ বাগে পেয়ে পুরুষ নারীকে হারে হারে বুঝিয়ে দিচ্ছে এই ঘর পুরুষের। পুরুষ যখন ইচ্ছা, যেভাবে খুশি নারীকে ঘরহীন-আশ্রয়হীন করতে পারে।

ঘরহীন যেন না হতে হয় তাই নারী বিনা পারিশ্রমিকে বেগার খেটে যায়। সংসারে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে। যদিও ঘর-গৃহস্থালীর কাজকে পরিবারের কোনো সদস্যই খুব একটা সম্মান বা মর্যাদা দেয় না। কাজ বলতে তো আজও ঘরের বাইরের কাজ, আয়মূলক কাজকেই গণ্য করা হয়। তাই আয় রোজগারের নামে পুরুষ যে হাতি-ঘোড়া মারে, আর ঘরে এসে নারীর (স্ত্রী/বোন/মা/বান্ধবী) খাতির-যত্ন পায়, তাকে সে নিজের প্রাপ্য বলেই মনে করে। ঘরের দায়িত্বরত নারীর প্রতি কোন কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রশ্নই আসে না।

আজ যখন পরিবারের সকলে ঘরে আবদ্ধ তখন প্রযুক্তির সুবিধা প্রাপ্ত পুরুষ সময় কাটাচ্ছে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, গুগল ঘেঁটে আর বাদবাকি পুরুষরা টিভি-রেডিওতে করোনা পরিস্থিতি শুনে অথবা মোবাইলে গেম খেলে, ফোনে খোশগল্প করে। আর নারী সদস্যরা পরিবারের সকলের খাবার তৈরি করে, শিশুদের খাদ্য সময়মতো সরবরাহ করে, ঘরের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে, বয়স্কদের সেবা শুশ্রুষা করার পাশাপাশি তাদের ঘন্টায় ঘন্টায় পরিবারের সকল সদস্যদের বাড়তি খাওয়ার আবদার, বিনোদনের আবদার পূরণ করতে হচ্ছে।

তার মধ্যে আছে কর্তা ব্যক্তির (অবধারিতভাবে পুরুষ) পান থেকে চুন খসলেই দোষ ধরার প্রবণতা। সকালের নাস্তা দেরি হলো কেন, তরকারিতে লবন বেশি কেনো, সন্তানরা লেখাপড়া করছে না কেন, সকল কৈফিয়ত দিতে হবে নারীকে। তারপর রাতের বেলা স্বামী ক্লান্ত স্ত্রীকে শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য চাপ দিবে। যদি স্ত্রী/নারী রাজি না হয়, তখন খারাপ স্বামী শারীরিকভাবে নিপীড়ন করে, আর তথাকথিত ভালো স্বামী বন্ধুদের আড্ডায় বলবে, “বৌ’তো শীতল”। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিবে, “সম্পর্ক এখন ভাইবোনের মতো”। “নারীদের যৌনাকাঙ্খা কম” এমন ভাবনা তো ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত করা গেছে এ সমাজে। করোনার মতো মৃত্যুর হাতছানিও নারীর জন্য কোন সহানুভূতি তৈরি করে না পরিবারগুলিতে। নারীর স্বাস্থ্য, নারীর মানসিক চাপ তাই বরাবরের মতোই উপেক্ষিত করোনার দিনগুলিতেও।

করোনার প্রকোপে দেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। পরিবারগুলিতে শুরু হয়েছে আর্থিক টানাপোড়েনের সুর। টাকা না থাকলে নাকি পুরুষের মাথা ঠিক থাকে না। আর মাথা নষ্ট পুরুষ তার কাতরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় বাড়িতে চেঁচামেচি করে, স্ত্রীর গায়ে হাত তুলে, স্ত্রীকে সকলের সামনে ছোট করে এবং স্ত্রীর মা-বাবাকে অসম্মান করে। এই সকল আচরণের পিছনে বেশিরভাগ সময় থাকে স্ত্রীর সম্পদ আত্মসাৎ করার চক্রান্ত। তাই করোনার ভয়ে যেমন চলছে নারীদের সঞ্চয় কেড়ে নেয়ার চেষ্টা, তেমনি করোনা পরবর্তি সময়ে চলবে স্ত্রীর মা-বাবার কাছ থেকে সম্পদ আনার চাপ।

আর নারীদের তো মানসম্মান স্বামীর সংসারে বাঁধা! তাই নারী তার স্ত্রী পরিচয় টিকিয়ে রাখতে চোখ মুছতে মুছতে যাবে মা-বাবা-ভাইবোনের কাছে হাত পাততে। মধ্যবিত্ত পুরুষরা বেশ আত্মতৃপ্তিতে ভোগে যেনো এসব ঘটনা, ছোটলোকি কাজ কেবল গরীবের ঘরে হয়। ঘটনা কিন্তু বিত্ত-শ্রেণি নির্বিশেষে ঘটে। কেউ খাবারের টাকার জন্য বৌকে পেটায় আর কেউ ব্যবসার মূলধন আনতে বৌকে মা-বাবার কাছে পাঠায়। আর যে নারী নিজে আয় রোজগার করে, তার সঞ্চয়ের প্রতি এখন পরিবারের সকলের দৃষ্টিতে দাবি তো একটাই “তুমি কি পরিবারের ভালো চাও না?”। ভালো মা, ভালো স্ত্রী হবার এই পরীক্ষায় পাশ করতে নারী ক্রমাগত নিঃস্ব হয়ে পড়ছে এই বিপর্যয়ে।

চিকিৎসা পেশায় জড়িত কাউকেই সেরকম সুরক্ষা দিচ্ছে না সরকার, সেক্ষেত্রে নারী স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স বা চিকিৎসকদের বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে, কোনভাবেই যেনো তাদের মাধ্যমে পরিবারের বাকি সদস্যরা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত না হয়। অনেক স্বাস্থ্যকর্মীদের চাকরি ছাড়তে চাপ দেয়া হয়েছে এ সময়ে। চিকিৎসা পেশায় জড়িত নারীদের এখন প্রয়োজন বাড়তি পুষ্টি, বাড়তি বিশ্রাম। কিন্তু কে আর নারী সদস্যের জন্য খাবার বেড়ে রেখে দিবে! অনেক পরিবারই বলবে “আমরা কি খেতে মানা করি”, কিন্তু নারীর জন্য আলাদা করে খাবার বাটি তৈরি করার মানুষই যে পরিবারে নেই, তা আর কাকে বোঝানো যাবে! কত নারী চিকিৎসককেই তো দেখা যায় স্বামী, সন্তান আর বয়স্কদের ওষুধ দিয়ে নিজের ওষুধটাই খেতে ভুলে যায়।

যে কন্যা সন্তানটি স্কুলে যেতে পারছে না সে আবার স্কুলে ফিরে যেতে পারবে কিনা সে সন্দেহ মনে দানা বাঁধছে। যতই অনলাইনে স্কুল হোক না কেনো মেয়েশিশুর জন্য ঘরের কাজের ফাঁকে ফাঁকে লেখাপড়া করাই কষ্টকর হয়ে পড়ছে।
করোনাতে গোটা বিশ্ব যখন বিপর্যস্ত, তখন নির্যাতনের শিকার নারীরা মুখোমুখি হচ্ছে নতুন নতুন নির্যাতনের। না আছে পুলিশি নজরদারি, না আছে প্রশাসনের আগ্রহ, আর বিচার চাইতে গিয়ে তো তারা ইতিমধ্যেই স্থানীয় নেতাদের চক্ষুশূল; তাই নতুন করে তাকে আর তার পরিবারকে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

নারীদের পাশে এসে দাঁড়ানো তাই খাবারের সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানোর মতই জরুরি হয়ে পড়েছে। কত মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে এই হিসেব নিতে গিয়ে কতজন নারী নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে যাচ্ছে, কতজন নির্যাতনে জীবন হারাচ্ছে, কতজন শিশু মানসিক ট্রমায় চলে যাচ্ছে, তা যেনো আমরা ভুলে না যাই। নারী অধিকার কর্মীদের (সংগঠনভিত্তিক হোক, ব্যক্তিগত পর্যায়ে হোক) নতুন কোন কৌশল বেছে নিতে হবে তৃণমূলের নারীদের কাছে যাবার। সরকারকে নারী নির্যাতনের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় রাখতে হবে।

সর্বোপরি পুরুষদেরও নিজেদের আচরণগুলি সংশোধনের সময় এসেছে, ঘরের কাজ -নারীর কাজ এই প্রথাগত ধারণা থেকে বের হবার সময় এখন, যে ঘরকে পুরুষতন্ত্র সম্মানজনক অবস্থান দেয় না আজ সেই ঘরই নারী-পুরুষের রক্ষাকবচ হয়ে এসেছে। যে কাজগুলিকে পুরো বিশ্ব নিচু চোখে দেখে সেই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার মতো কাজ যা নারীরা মোটামুটি একাই সামলে গেছে তা জীবন বাঁচানোর মহামন্ত্র হয়ে এসেছে।

করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় আজ তাই সময় এসেছে নিজেকে পাল্টানোর, ঝালাই করে নেয়ার যে কতদিন আর তথাকথিত পুরুষালি আচরণ বহন করে যাবে মানুষ; নাকি এবার নারী পুরুষের সহাবস্থানে সমমর্যাদা আর সমঅধিকারকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিবে। মনে রাখতে হবে এবারের লড়াই শুধু ভাইরাসের বিরুদ্ধে না আমাদের মানবতা প্রমাণ করারও।

লেখক: নির্বাহী সমন্বয়কারী, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.