প্যারেন্টিং!

tania morrshed
তানিয়া মোর্শেদ

তানিয়া মোর্শেদ: ‘প্যারেন্টিং’ এমন একটি শব্দ যার পরিধি যুগের সাথে পরিবর্তনশীল হলেও এর বেইজ (ভিত্তি) চির পুরাতন। বাবা-মা বা অভিভাবক হলে দায়িত্ব ও কর্তব্য যেন ঘুমের মধ্যেও একটি চোখ ও কান খোলা রাখার মত!

বলা হয়ে থাকে, আমিও বিশ্বাস করি, মা-বাবা হচ্ছে চিরকালের বেস্ট ফ্রেন্ড। যেকোনো সম্পর্কের মধ্যেই বন্ধুত্ব ভীষণ জরুরি। কিন্তু এখানে একটি কথা আছে, মা-বাবা বন্ধু মানে শুধুই বন্ধু নয়, তারা অভিভাবক বন্ধু। তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য জীবনে পথ চলবার জন্য শিশু বয়স থেকে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত (অন্তত পক্ষে) সন্তানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ হয় যদি সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুত্ব থাকে। তবে এই বন্ধুত্বের মধ্যে মনে রাখতে হবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষটিকে যে, তিনি শুধু বন্ধু নন, অভিভাবকও।

বন্ধুত্ব তৈরি শুরু করতে হয় একদম ছোট বয়স থেকে। সন্তানের সাথে সময় কাটানো, সব কথা শোনা, কি হলো সারাদিন, কার সাথে কি বললো, কি করলো, কি শুনলো সব সব জানা। আর মাঝে মাঝে গল্প ছলে নিজের মূল্যবোধ, পারিবারিক নিয়মনীতি, সাংস্কৃতিক পরিচয় ইত্যাদি জানিয়ে দেওয়া। বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথেও যে মূল্যবোধে, জীবনবোধে পার্থক্য থাকতে পারে তা সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলা। বুঝতে হবে, কখন শুধুই শুনতে হবে আর কখন কিছু বলতেও হবে।

আমার সন্তান কিছুদিন আগে কৈশোরে পা দিয়েছে। এই সময়টি ভীষণভাবে চ্যালেঞ্জিং, সন্তানদের জন্যও, বাবা-মা’র জন্যও। কোনো বাবা-মা প্যারেন্টিং-এর কোনো স্কুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাবা-মা হন না। প্যারেন্টিং হচ্ছে প্রতি নিয়ত শিক্ষার জিনিস। যুগের সাথে নূতন নূতন চ্যালেঞ্জ আসছে, বাবা-মা সচেতন হয়ে, কখনও ধাক্কা খেয়ে বাধ্য হয়ে নূতন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে সন্তান মানুষ করা বিষয়ে অনেক গবেষণা হয়, হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে গবেষণা হয়। যার জন্য কিছু কিছু বিষয়ে বাবা-মা কখনো কখনো কিছু দিক নির্দেশনা পেতে পারেন। তবে পৃথিবীর ছয়+ বিলিয়ন মানুষের ছয়+ বিলিয়ন সত্ত্বা! কোনো ধরা বাঁধা ছক দেখে প্যারেন্টিং করা যায় না! তবে কিছু বিষয়ে দিক নির্দেশনা থাকলে সাহায্য হয় কখনো কখনো। এই যুগের বাবা-মা’দের চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রথমেই আসে, “ড্রাগ বা মাদক”।

এই চ্যালেঞ্জ আজ সারা পৃথিবীর সব দেশে, সব সমাজে প্রায় একই। আমি আজ যে কথাগুলো বলছি, তা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে জানা/ দেখা/ শোনা থেকে ক্ষুদ্র শিক্ষা। আমি কাউকে জ্ঞান দেবার জন্য বলছি না। সে স্পর্ধা আমার নেই। জানা/ শোনা/ দেখা ও ব্যক্তিগত চিন্তা ভাবনা শেয়ার করছি মাত্র।

এদেশে বলা হয়ে থাকে, ড্রাগ বিষয়ে কথাবার্তা বলা শুরু করবার কোনো বয়স নেই। মানে কোনো বয়সই “ঠু আর্লি নয়।” পাঁচ বৎসর বয়সে এদেশে স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। স্কুল যাবার আগেই এ বিষয়ে কথা বলা শুরু করা যায়। স্কুলে যাওয়ার আগে প্রতি বৎসর একটি গাইড বুক দেওয়া হয়, অভিভাবকসহ সন্তানকে তা পড়ে, সাইন করে জমা দিতে হয়। লেখা থাকে স্কুলে কি কি করা যাবে, যাবে না। ড্রাগ বিষয়ে “জিরো টলারেন্স।” কোনো স্টুডেন্টের কাছে টাইলেনল (প্যারাসিটামলের মত ঔষধ) থাকলেও স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে। আর অন্য কাউকে সেই ঔষধ যদি দেয়, তাহলে খবর আছে।

এত কড়া নিয়ম, অথচ ড্রাগের কবলে কিভাবে পরে ছেলে-মেয়েরা?  এ এমনই একটি জিনিস ঠিকই পথ খুঁজে নেয়, উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পর্যন্ত। মেধাবী থেকে অমনোযোগী বা ফেইল করা স্টুডেন্ট। “খুব শান্ত/ ভদ্র/ বুদ্ধিমান/ চালাক/ বোকা …………” সবার কাছে। এর সাথে যে জড়িত বিশাল ব্যবসা! ড্রাগ আর অস্ত্র ব্যবসা হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যবসা। এর থেকে সন্তানদের রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ!

টিভিতে (এদেশের) সিগারেট, ড্রাগ নিলে কি ক্ষতি হয় তার ভীষণ গ্র্যাফিক অ্যাড দেখানো হয়। দেখলে অসুস্থবোধ হতে পারে অনেকের। তবুও তা দেখানো প্রয়োজন মনে করি। ছবি হাজার কথার থেকেও বড় ভূমিকা রাখে! সিগারেট যে কত ক্ষতিকর তা দিয়েই শুরু করা যায় কথাবার্তা, অনেক ছোট শিশুর সাথেই। আমাদের বাবা-মা’রা সন্তান সিগারেটে আসক্ত হবার পর বাধা দিতেন। যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে! আমাদের উচিৎ আগেই এ বিষয়ে কথা বলা।

সন্তান যদি ড্রাগ অ্যাডিক্ট (সিগারেটে আসক্তও) হয়েই যায় তবে সাথে সাথেই (জানবার পর) সঠিক চিকিৎসা, কাউন্সেলিং করাতে হবে। বকাঝকা, রাগারাগি করে কিছুই হবে না। অনেক ধৈর্য্য ধরে চেষ্টা করেই যেতে হবে।

এযুগের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ (মাঝে মাঝে মনে হয় ড্রাগের সমান চ্যালেঞ্জ) ইন্টারনেট, গেইমস-এর চ্যালেঞ্জ। বলা হয়ে থাকে টিভি, ইন্টারনেট ঘন্টা হিসাব করে ব্যবহার করতে দিতে। যা খুবই চ্যালেঞ্জিং। টিভির চ্যালেঞ্জ না থাকলেও গেইমসের চ্যালেঞ্জ চলছে আমার বাড়িতে! এক সন্তান বড় করার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, “আমি এখন কি করবো” এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া! অনেক কিছুর মধ্যে যেমন মিউজিক/ সংগীত শেখা, ছবি আঁকানো, লেখা, বই পড়া ইত্যাদি যা মানসিক বিকাশের জন্য খুব দরকারি এ সবে যুক্ত করে গেইমস থেকে বিরত রাখা কিছু সময়ের জন্য। তারপরও এই চ্যালেঞ্জ থেকেই যায়!

ইন্টারনেট ব্যবহার খুব দরকারি। অনেক কিছু শিখছে এ প্রজন্ম, আমিও। কিন্তু সঠিক বয়সের আগেই এমন কিছুর সাথে পরিচয় হওয়া উচিৎ নয় যা মানসিক বিকাশে ক্ষতিকর। বলা হয়ে থাকে, কম্পিউটার এমন জায়গায় থাকবে যা সবার দৃষ্টিসীমার মধ্যে। মানে সন্তান কি করছে, কি দেখছে তা যেন বাবা-মা দেখেন, জানেন, খেয়াল রাখেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লক করে রাখা উচিৎ, কিছু কিছু বিষয়। বাংলাদেশে তা সম্ভব কিনা জানি না। একই ব্যাপার টিভির ক্ষেত্রেও। অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ঘরে কম্পিউটার, টিভি দেওয়া উচিৎ নয়। টেকনোলজি নিজে খারাপ কিছু নয়। খারাপ কাজে তা যেন ব্যবহৃত না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

কিছু বৎসর আগে কিছু বাংলাদেশীদের মধ্যে খুব আলোচনা চলছিল, সেলুলার ফোন (মোবাইল ফোন) কিভাবে বাংলাদেশে একটি প্রজন্মের ক্ষতি করছে। আমি একটি কথাই বলছি, ফোনের বিল দেন কে? অভিভাবক নিশ্চয়। রাত ৮/৯ টার পর ফোন নিয়ে নেবেন। ফোন হচ্ছে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জিনিস। এদেশে ‘কারফিউ’ বলে একটি কথা চলে। রাত ক’টার পর বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ। কেন নিষেধ এসব, তা ভালো মত বুঝিয়ে বলা শুরু করতে হয় সেই বয়সে পৌঁছনোর অনেক আগে থেকেই। কেন সঠিক বয়সের আগে কি কি জিনিস করা যাবে না, তা বলেই যেতে হবে। মুভি থেকে গেইমস পর্যন্ত রেটিং খেয়াল করে দেখতে দেওয়া/ খেলতে দেওয়া খুব জরুরি।

যদি একটি বাচ্চার মনেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরে তাও অনেক ধ্বংস বয়ে আনতে পারে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এমনকি রাষ্টীয় জীবনে। সন্তান সঠিক পথে না থাকলে পুরো জীবনটাই ব্যর্থতায় ঢেকে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমার চ্যালেঞ্জ অনেক বড়! সন্তান বড় করার সময়ে ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করা কি জিনিস তা যারা এই পথে হেঁটেছেন তারাই জানেন! এযুদ্ধে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার সন্তান অনেক অল্প বয়স্ক, তাই আমায় যুদ্ধ করতেই হবে। আবার আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা, “আমার সন্তান এত অল্প বয়স্ক!” এত কথা বলবার পর যদি তার কিছু পারসেন্টও মনে রাখে! আমি বেশ কিছুদিন ধরে বলি, “আমাকে এভাবে বলবার কেউ ছিল না। তুমি কি বুঝছো আমি কি বলছি?”

লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.