এ মুহূর্তে কৃষি ও কৃষকদের বাঁচানো জরুরি

তানিয়া ওয়াহাব:

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। করোনার প্রভাবে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে আমাদের কৃষিখাত। খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে পরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে যাবে। এবং এই বিপুল সংখ্যক জনবহুল দেশের মানুষের খাদ্য যোগানের নিশ্চয়তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তাই অন্যান্য খাতের পাশাপাশি সরকারের উচিত কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত কিছু কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

আমাদের দেশের মাত্র ৩০ ভাগ চাষী তার নিজস্ব জমিতে চাষাবাদ করে থাকে। বাকি ৭০ ভাগ চাষীর নিজস্ব কোনো জমি নেই। তারা বর্গা চাষী হিসেবে চাষাবাদ করে। সরকারের উচিত হবে এ সকল কৃষিজীবিকে এ সময়ে বিশেষ সুযোগ সুবিধার আওতায় আনা।

তানিয়া ওয়াহাব, উদ্যোক্তা

# বর্তমান সময়ে সারা দেশে স্থবির অবস্থা বিরাজ করার কারণে আসন্ন বোরো ধান ঘরে তোলার কাজে কৃষক বিপাকে পড়েছে।

# পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ থাকার কারণে কৃষক তার উৎপাদিত শাকসব্জি বাজারজাতকরণ করতে পারছে না।

# উৎপাদিত পোল্ট্রি পণ্যের ক্ষেত্রেও বাজারজাতকরণ প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। দেশে প্রতি সপ্তাহে উৎপাদন হয় ১ কোটি ৩০ লাখ মুরগীর বাচ্চা, যার উৎপাদন খরচ প্রায় ১৫-২০ টাকা, কিন্তু বিক্রির অবস্থা না থাকায় এই পণ্যের দাম ৩/৪ টাকায় নেমে এসেছে এবং অবিক্রিত মুরগীর বাচ্চা মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। যা পরবর্তীতে তীব্র খাদ্য সংকট তৈরি করতে পারে।

# ডেইরিতে উৎপাদিত হাজার হাজার লিটার দুধ গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে না পারার কারণে নষ্ট হচ্ছে এবং ফেলে দেওয়া হচ্ছে।

একদিকে কৃষক যেমন তার উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম পাচ্ছে না, যার দরুণ পরবর্তিতে সে আর এই পণ্য উৎপাদনের আগ্রহ এবং পুঁজি দুটোই হারিয়ে ফেলবে, অন্যদিকে বিভাগীয় বা জেলা শহরগুলোতে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এবং যোগান স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে।

এই মুহূর্তে কৃষি খাতে সরকারে কিছু স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দ্রুত গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।

১: মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের ভূমিকা হ্রাস করে উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তা পর্যায়ে সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় একটি সমন্বিত বিপণন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

২: কৃষকদের জন্য বিনা সুদে এবং অত্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

৩: সরকারি ত্রাণের আওতায় পচনশীল কৃষি পণ্যসহ পোল্ট্রি ও ডেইরি পণ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে দুস্থ মানুষেরও পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হবে এবং প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

৪: ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিনা মূল্যে সার ও বীজ প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৫: বিনামূল্যে এবং ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের উন্নত মানের কৃষি যন্ত্রপাতি প্রদাণ করতে হবে। (ইতিমধ্যেই কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হাওর এলাকায় বোরো ধান দ্রুত কেটে ঘরে তোলার জন্য উন্নত ধান কাটার যন্ত্র দেয়া হয়েছে।)

৬: কৃষকদের সহজ শর্তে দ্রুত দূর্যোগ কালীন বীমার আওতায় আনতে হবে।

৭: কৃষি প্রধান এলাকায় সরকারী উদ্যোগে পচনশীল পন্য সংরক্ষনের জন্য কেন্দ্রীয় হিমাগার স্থাপন করতে হবে। ইত্যাদি।

শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগই নয় বরং এর পাশাপাশি বেসরকারি ও সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণ করে এ সময়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

১: অনেক সংগঠনই এ সময়ে বোরো ধান ঘরে তোলার কাজে সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে। ধান কাটা থেকে পরবর্তি প্রক্রিয়াজাতকরণে সহযোগিতা করার জন্য আরও ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

২: ব্যক্তি বা সাংগঠনিক ত্রাণ কার্যক্রমে চাল, ডাল ইত্যাদির পাশাপাশি সব্জি, পোল্ট্রি ও ডেইরি পণ্য সংযোজন করা যেতে পারে। এতে করে উৎপাদকরা তাদের পণ্যের মূল্য পাবেন।

৩: ব্যক্তি উদ্যোগে যারা দুস্থদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তারা কৃষকদের নগদ সহায়তা, সার, বীজ ইত্যাদি দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।

৪: আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের মতো স্কুল বা কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের খণ্ডকালীন কৃষি কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

৫: বিদেশী দামি ফল না খেয়ে উৎপাদিত দেশী ফল খাওয়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে হবে।

৬: কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করণ বা ভ্যালু এ্যাড করার মতো প্রজেক্ট এর বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ইত্যাদি।

আমাদের দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য শস্য মজুত রয়েছে। সে সাথে এবার বোরো ধান ও আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড: অমর্ত্য সেন বলেছেন,

“খাদ্যের অভাবে পৃথিবীতে কখনো দুর্ভিক্ষ হয়নি, হয়েছে খাদ্যের সুষম বণ্টনের অভাবে”

তাই কৃষি ক্ষেত্রে সরকারের দ্রুত কিছু কার্যকরি পদক্ষেপ, সমন্বিত বিপণন ব্যবস্থা, আর আমাদের সকলের সহযোগিতাই পারে এই আপদকালীন বা তার পরবর্তি সময়ে দেশকে টিকিয়ে রাখতে, এগিয়ে নিতে।

কৃষি বাঁচলেই বাঁচবে দেশ,
আমার সোনার বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.