আমরা এবং আমাদের গৃহকর্মীরা

মেহেরুন নূর রহমান:

কিছুদিন আগে তথাকথিত এক নারী সমাজকর্মীর তার গৃহকর্মীর উপর অত্যাচার নিয়ে বেশ হৈচৈ হয়ে গেলো। যদিও কাজের কাজ কিছুই হয় নাই এবং ওই তথাকথিত সমাজকর্মী শাস্তিও পাবে না। এর আগেও এরকম অনেক ঘটনা ঘটেছে। গৃহকর্মে সাহায্যকারীকে বীভৎসভাবে অত্যাচার থেকে শুরু করে খুন করা পর্যন্ত হয়েছে।

গৃহকর্মে সাহায্যকারীরা সমাজের যে আর্থসামাজিক অবস্থান থেকে আসে তা আমাদের চেয়ে নিচে, সুতরাং আমরা ধরেই নেই তারা যথাযথ সম্মান পাবার যোগ্য নয়। তুচ্ছ কারণে তাদের অবজ্ঞা করা যায় এবং আরও মনে করি, তারা সবসময়ই আমাদের কথা শুনতে বাধ্য। তাদের আমরা ‘তুই’ বলে সম্বোধন করি, তা সে যে বয়সেরই হোক না কেন, মাটিতে শুতে দেই, সস্তা চালের ভাত রাঁধা হয় তাদের জন্য এবং খাবারের সব পদ পাবার যোগ্য তারা নয়, যদিও সেসব পদ তারাই রাঁধে।
অথচ এরা কারও মুখোপেক্ষী না হয়ে নিজের শ্রমে বাঁচে এবং তাদের পরিবারকে বাঁচতে সাহায্য করে। আমি মনে করি এরা অন্য অনেকের চেয়ে বেশি সম্মানের অধিকারী।

গৃহকর্মীদের সাথে যেসব অপরাধমূলক আচরণ করা হয় তা নিয়ে আজকে নাহয় না বলি। সেসব পরিবারের কথা বলি যারা গৃহকর্মীদের উপর মোটামুটি সদয়। খাটে শুতে দেয়, খাবার নিয়ে ভিন্নতা তেমন করে না, বাজার অনুযায়ী প্রতিযোগিতামূলক বেতন দেয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তারা গৃহকর্মীদের যথাযত মূল্যায়ন করছে। আসলেই কি তাই?

এসব ঘরে গৃহকর্মীরা ভোরে সবার আগে ওঠে এবং ঘুমোতে যায় সবার পরে। তাদের কাজের কোন নির্দ্দিষ্ট সময়সীমা নেই। সবসময় তাদের কাজ করতে হয় অথবা কাজের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কোন কোন পরিবারে হয়তো দুপুরের খাবারের পর সবকিছু ধুয়ে গুছিয়ে তারা কিছু সময় রেস্ট নিতে পারে, কিন্তু জেগে আবার কাজে ঢুকে যেতে হয়। তাদের কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নাই। সাতদিনই তাদের কাজ করতে হয় দিনরাত।

ভেবে দেখুন পুরো বিষয়টা একবার। মনে করুন আপনি একটি জব করছেন যেখানে আপনাকে সারাদিনই কাজ করতে হয়। মাঝে হয়তো টুকটাক একটু বিশ্রামের সময় পান কিন্তু প্রতিদিনই সকাল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত আপনি কাজ করেন এবং সপ্তাহের সাতদিনই আপনাকে এভাবেই কাজ করতে হয়। খুব অস্বাভাবিক লাগছে, তাই না? মনে হচ্ছে না নিয়োগকর্তা খুব অমানবিক? বুঝে নিন আমরা কিন্তু দিনের পর দিন এইরকম আচরণ করে যাচ্ছি আমাদের গৃহকর্মীদের সাথে। আমরা এতোটাই গৃহকর্মীদের উপর নির্ভরশীল যে সপ্তাহে একদিন নিজের ঘরের কাজ করতে পারি না।

বিটিভি আমলের কথা, একজনকে দেখেছিলাম যিনি শুক্রবারে বিটিভিতে যে বাংলা সিনেমা দেখানো হতো তা গৃহকর্মীকে দেখতে দিতেন, কিন্তু হাতে ধরিয়ে দিতেন কাপড় এমব্রয়ডারি করার জন্য। কাজের বুয়া কাজ ছাড়া থাকবে? সচেতন/অবচেতনে গৃহকর্মীদের আমাদের ‘স্লেভ’ ভাবার মানসিকতাই এসব আচরণের জন্য দায়ী।
গৃহকর্মীদের আমরা এভাবে দিনরাত কাজ করতে দেখে বড় হয়েছি বলে আমাদের অভ্যস্ত চোখে এসব অসঙ্গতি ধরা পড়ে না, বরং স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু সব স্বাভাবিক সঠিক নয় কিংবা ন্যায্য নয়।

বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের কাজের উপর নীতিমালা থাকুক বা নাই থাকুক, আপনি নিজ থেকে উদ্যোগ নিতে পারেন। গৃহকর্মীকে কাজের বুয়া না ভেবে কর্মচারি ভাবুন না কেন! তাদের বেতন এমনভাবে নির্ধারণ করুন যেন তারা নিজেদের শোষিত মনে না করে। সপ্তাহে অন্তত একদিন তাদের ছুটি দিতে পারেন। দিনরাত যখন চান তখন সে আপনাকে সার্ভিস দেবে এই মনোভাব ত্যাগ করে তাদের কাজের দৈনিক একটি নির্দ্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে পারেন। আপনিই দিতে পারেন তাদের প্রাপ্য সম্মান এবং সম্মানী যা তারা পাবার যোগ্য। আমি বিশ্বাস করি বিনিময়ে আপনারাও তাদের থেকে ভালো কাজ পাবেন এবং তারা আরো বেশি মনোযোগী হবে তাদের কাজে।

দিন পাল্টাচ্ছে, আমরা কি আমাদের বদলাতে পারি না? মানুষ হিসেবে না হয় আর একটু বেশি মানবিক এবং সঠিক হবার চেষ্টা করলাম!

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
নাম: মেহেরুন নূর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর। ১৪ বছর ধরে লন্ডন এ বসবাসরত। বর্তমানে লন্ডনে IPG Mediabrand নামে একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং এডভার্টাইজিং সংস্থায় অপারেশনস ডিরেক্টর হিসাবে কর্মরত।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.