করোনা ভাইরাসের চেয়েও বড় পুরুষতান্ত্রিক ভাইরাস

সানজিদা খান রিপা:

ভাবছেন, এটা আবার কি কথা? বিশ্বব্যাপী মহাদুর্যোগে এই ভদ্রমহিলা আবার এসব কী বলছেন? পৃথিবীশুদ্ধ মানুষ যখন ঘরবন্দী হয়ে মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রতিদিনের আপডেট জানতে ও জানাতে মোবাইলের এবং ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাচ্ছে না, এমন সময়ে আমার কথাগুলো একটু বেমানানই লাগবে আপনাদের অনেকের কাছে।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বের ১৫৩টি দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন এবং নতুন করে আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিতও হচ্ছেন। করোনা ভাইরাসকে কাবু করার জন্য এখনও পর্যন্ত কোনো ঔষুধ আবিস্কার করতে পারেনি উন্নত দেশের বিজ্ঞানীরা। তবে কাজ চলছে জোরেশোরে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মতে করোনার ভয়ে দেশে দেশে অসহায় এবং ভীতসন্ত্রস্ত সরকার প্রধানরা স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতের কাজকর্ম সব কিছু বন্ধ ঘোষণা করে মানুষদেরকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই, পৃথিবীতে এখন লকডাউন, শাটডাউন চলছে আর মানুষজন বাড়িতে বসে একপ্রকার অলস সময় কাটাচ্ছে। অর্থাৎ পুরো পৃথিবীটাই এখন ক্লোজড্ অবস্থায় আছে।

যাই হোক প্রসঙ্গে আসি, অলস সময় মানুষ কীভাবে কাটাবে? কিছু তো একটা করতে হবে। তাই বেশিরভাগ মানুষই নেটকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। প্রতিদিন শুয়ে-বসে নানা শব্দমালার গাথুঁনি দিয়ে ঝড় তুলছেন ফেসবুকের টাইমলাইনে আর কমেন্ট বক্সে। সাথে যদি থাকে ঘন্টায় ঘন্টায় চা আর সুস্বাদু মুখরোচক সব খাবার তাহলে তো আর কথাই নেই।

সেদিন এক বন্ধু বলছিলো, ‘জানিস বিরক্ত ধরে গেছে, আর পারছি না।’ আমি কারণ জানতে মুখ খোলার আগেই সে বলতে শুরু করে দিল, ‘… আগেই ভালো ছিলো, দুপুরের খাবার ক্যারিয়ারটাই শুধু ধরিয়ে দিতাম। আর এখন ঘন্টায় ঘন্টায় চা-নাস্তার অর্ডার, আরও আছে এটা দাও, সেটা দাও কত কি! প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও এখন অসহ্য লাগে। কোথায় বাড়িতে থেকে আমাকে একটু কাজে সাহায্য করবে বা বাচ্চাদের পড়াটা একটু দেখিয়ে দেবে, তা না। আর যখন বলেছি যে চা দিতে পারবো না, সে কী চিৎকার আর বকাঝকা! আমি নাকি ঘরে শুয়ে-বসে বসে খাই আর শরীরের চর্বি জমাই!’

এই পরিস্থিতি এখন অধিকাংশ বাড়িতেই দেখা যাচ্ছে। গৃহিণীরা তাদের স্বামীর দ্বারা নানাভাবে হেনস্থা হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকারও হচ্ছে পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

নানাভাবে নারী নির্যাতন এখন এই দুর্যোগের সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও নারীরা নিজ গৃহে নির্যাতিত হচ্ছে। করোনা মহামারির এই দুর্যোগে নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ৬ এপ্রিল জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস উদ্বিগ্ন হয়ে এক বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। কোভিড-১৯ মোকাবেলা পরিকল্পনায় নারী সহিংসতা প্রতিরোধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি সকল দেশের সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন এই লকডাউনের সময় নারীরা সরাসরি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, আফ্রিকার সাব সাহারন দেশগুলোতে এই হার ৬৫ শতাংশ। পারিবারিক কলহ ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে অস্ট্রেলিয়াতে সরকারের কাছে অনলাইনে নারীদের সাহায্য প্রার্থনার হার বেড়েছে ৭৫ শতাংশ, এবং ফ্রান্সে ঘরোয়া নির্যাতন বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

এমনকি শুধুমাত্র ঢাকা শহরেরই বিভিন্ন থানায় মাত্র দশদিনে নারীর প্রতি বিভিন্ন সহিংসতার অভিযোগে ২৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিছু ভাবতে পারছেন আপনারা? এ তথ্য আমার নয়। দৈনিক প্রথম আলোতে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত ৪ এপ্রিল ২০২০। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা মহানগর এলাকায় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৯টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। ৮টি মামলা হয়েছে যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায়। ৬টি মামলা হয়েছে যৌন নিপীড়নের অপরাধে। এবং ৫টি মামলা হয়েছে অপহরণের ঘটনায়। মামলা হওয়ার কারণে এই পরিসংখ্যানগুলো পাওয়া যায়। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের বাইরেও অনেক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে নিরবে, বেশিরভাগ নারীরাই সেটা মুখ বুজে সহ্য করছে।

আবার দেখা যাচ্ছে নারীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে নানারকম ট্রল করা হচ্ছে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে। হাস্যরসাত্মক এই ট্রলগুলো কিন্তু আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই বহিপ্রকাশ। তর্কের খাতিরে অনেকেই বলবেন যে ছেলেদের নিয়েও তো ট্রল হচ্ছে। আপনারা যারা সাফাই গাইবেন তারা কি একটু পরিসংখ্যানসহ দেখাতে পারবেন?
এখন আপনারাই বলুন তো পুরুষতান্ত্রিক ভাইরাস নির্মূলের ঔষুধ কি আদৌ আবিষ্কার হবে? আমি আশাবাদী।
উপসংহারটা আপনারা টানুন।
ঘরে থাকুন, নিরাপদ থাকুন, অন্যকে নিরাপদ রাখুন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.