ধর্ম ব্যবসার মহামারী রূপ- জানাযায় লাখো মুসুল্লীর ঢল

রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা:

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা জোবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজায় লাখ-লাখ মানুষ সমবেত হওয়ার ঘটনায় সত্যি বলতে কী আমি খুব একটা বিচলিত না। এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল!

বাংলাদেশের ধর্ম নিয়ে কোনো কথা বলাটা ট্যাবু এবং আত্মঘাতী। তাই এগুলো নিয়ে কিছু বলা বা লেখা মারাত্মক বিপজ্জনক। কিন্তু কারও ধর্মানুভূতিতে আঘাত না দিয়েই বলতে চাই, এই কাজটি কতখানি যৌক্তিক ছিলো? কারও শেষ যাত্রায় শরিক হওয়ার আবেদন যেকোনো অর্থেই মানবিক, কিন্তু বিশ্বের এই সংকট মুহূর্তে এরকম সাড়া দেবার বিষয়টি কি কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়াই হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, স্বভাবতই শিক্ষকতায় আগ্রহ থেকেই সেই ওয়াজগুলো আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে থাকি। নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক থাকাকালীন “রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞান” নামক একটি কোর্সের কোর্স শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম। সেই সময়ে এই সকল ওয়াজের মধ্য দিয়ে কীভাবে মানুষের ধর্ম, মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি রাজনৈতিক শক্তিশালী ডিসকোর্সে পরিণত হয়, তা ছিল আমার আগ্রহের মূল জায়গা। আমি মনে করি এই ওয়াজগুলো কেবলমাত্র ধর্মীয় মূল্যবোধ বা ধর্মীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশে ব্যবহার করা হয় না, বরঞ্চ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় শক্তিশালী রাজনৈতিক ডিসকোর্স।

আমির মাওলানা জোবায়ের আহমদ আনসারীও বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় ওয়াজকারী এবং ধর্ম নিরেপেক্ষতা নিয়ে তার সংকীর্ণতা, তার ওয়াজে খুবই দৃশ্যত ছিলো। এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি সম্ভবত ওয়াজ মাহফিলে যোগদান করতে পারেননি। আগেই বলে নিচ্ছি আমার এইসকল আলাপ যেহেতু নেটভিত্তিক তথ্য উপাত্তনির্ভর সেহেতু এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ কম। এছাড়া যেহেতু তিনি মারা গেছেন, কাজেই আমি তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে তার ওয়াজের রাজনীতি বিষয়ে আলাপটি সচেতনভাবেই বাড়াচ্ছি না। তবে এইসকল ওয়াজের ফসল হিসেবেই যে আজকের এই করোনা মহামারীকালেও মানুষেো ঢল নামে, সেটি কেনই বা প্রশাসন রোধ করতে ব্যর্থ হয়, সেটি বরং আমার লেখার মূল জায়গা।

প্রসঙ্গক্রমে বর্তমানের আরও কয়েকজন ওয়াজকারীর কথা বলছি।

গত ২৪ শে মার্চ মুফতি আমীর হামজার একটি ওয়াজ ভিডিও প্রকাশ হয়, সেখানে তিনি বলেন, “দেশে যদি করোনা আসে তবে কোরান শরীফ মিথ্যা হয়ে যাবে”।

১৩ মার্চ ইউটিউব ভিডিওতে আল্লামা তারেক মনোয়ার বলেন, “মাস্ক কিনবেন না, কোন হুজররে দেখছেন মাস্ক পড়তে? আমরা হুজুররা হাত ধরি দোয়া করি, আমরা হাত ধইরা যে দোয়া পড়ি, ভাইরাস চৌদ্দ মাইল দূরে চলে যায়।”

১২ এপ্রিল ইউটিউব ভিডিওতে তিনি আরও বলেন, “করোনার মহামারীতে যে মুমিন সফর করবেন সে একজন শহীদের মর্যাদা পাবে, সুবহানাল্লাহ”।

১২ এপ্রিল অপর এক ভিডিওতে মুফতি কাজী ইব্রাহিম বলেন, “কোরআন যাদের হাতে আছে তাদের কীসের ভয়?… তাদের করোনা কিছু করতে পারবে না”। উল্লেখ্য, এর আগে তিনি একাধিক মাহফিলে ঘোষণা দেন, ভাইরাসের ইন্টারভিউ সূত্রে তার কাছে করোনা রোগের চিকিৎসা রয়েছে।

আমি বলছি না, যে বা যারাই এই সকল ওয়াজগুলো পরিচালনা করেন, তারা সকলেই এরকম অযৌক্তিক বা ভ্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন যারা যৌক্তিক এবং বিজ্ঞানসম্মতভাবে ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রদান করে থাকেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ওয়াজের জনপ্রিয়তার বিচারে এবং ইউটিউবে ভিডিও চ্যানেলগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের ভিডিও দর্শনকারী সংখ্যা বিচারে কোনো এক অদ্ভুত কারণে উপরে উল্লেখিত ওয়াজকারীদের থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক কম জনপ্রিয় এবং গণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ।

আমি অনেক প্রগতিশীল সুশীল সমাজের মানুষকে বলতে শুনেছি, মূলধারার প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া হতে শুরু করে বেশীরভাগ শিক্ষক, লেখক, ও বিশিষ্টজনেরা কোনো এক অজানা কারণে এই সকল ওয়াজ, ওয়াজকারীদের ডিসকোর্স এর উৎপাদন, ক্ষমতা চর্চার বিষয়গুলোকে এড়িয়ে যেতে চান।

কয়েকজনকে এমনও বলতে শুনেছি যে এদেরকে এতো গুরুত্ব দেয়ার কী আছে, এরা কিছু জানে না। জানে না দেখে এ সকল অপব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু এই সকল অপব্যাখ্যায় সাধারণ জনমনে কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করে, সেটি ভেবে দেখেছেন?

মাফ করবেন, আমার কাছে কখনোই এ সকল ওয়াজ অথবা ওয়াজকারীদেরকে অরাজনৈতিক বা নির্বোধ বলে মনে হয় না। এবং তারা যে খুব সরল সহজ মন থেকে এই ধরনের ডিসকোর্সের তৈরি করেন বা প্রমোট করেন, তাও মনে হয় না।
তাদের এই প্রমোশন যেকোনো ভাবেই নিরপেক্ষ বা অরাজনৈতিক নয়, আর তারই প্রমাণ আজকের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আলেমের জানাজায় এই গণমানুষের ঢল। শুধু সুশীল সমাজই নয়, প্রশাসনও এদের ক্ষেত্রে একেবারে নিশ্চুপ। এই নীরবতা প্রমাণ করে যে, আমরা কীভাবে এই ধর্মান্ধ একটি চর্চার মাঝে কুক্ষিগত হয়ে পড়ছি।

এখন সে প্রসঙ্গে আসি, আমি কেন এই ওয়াজগুলোর কথা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উল্লেখিত আলেমের জানাজার অংশগ্রহণের প্রসঙ্গে নিয়ে এসেছি। আমার কাছে মনে হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই আলেমের জানাজায় যে গণমানুষের ঢল, তার নেপথ্যে এ সকল ওয়াজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একইসাথে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আলেমদের যে অংশটি মসজিদে নামাজ না পড়ার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বিপক্ষে অবস্থান করছেন, তারা এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া অপরাপর রাজনৈতিক উস্কানিও ফেলে দেওয়ার সুযোগ নেই বলে আমি মনে করি।

আমার প্রশ্ন হলো, যদি কারও ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে কেন ধর্মানুভূতি নিয়ে ব্যবসা করা বা ধর্মের নামে বিভ্রান্তি প্রচার করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না? কেন এই সকল ওয়াজ মাহফিলের প্রতিষ্ঠানগুলোকে, ওয়াজকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে না? কেনই বা আজকে জানাযায় অংশগ্রহণের এই ঘটনার নেপথ্যের বাস্তবতা নজরে নেয়া হবে না? নাকি ধর্ম ব্যাবসায়ীদের ভয়ে আমরা এভাবেই সাধারণ আমজনতাকে জিম্মি করেই রাখতে চাই! আর মাঝরাতে আযান দেয়া, গাছে পানি দেবার গুজব বলে, এই জাতিকে নির্বোধ ভেবে সচেতনভাবেই এই সকল ধর্মব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে যাই!

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.