এ মুহূর্তে কৃষিকে বাঁচাতে হবে, নইলে বাঁচবে না দেশ

নাসরীন রহমান:

করোনায় থমকে গেছে বিশ্ব, ইতিমধ্যে বিভিন্ন আক্রান্ত দেশে খাদ্য সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন, সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যঘাটতির ব্যাপক সংকট দেখা দিতে পারে। কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে দুর্ভিক্ষের আলামতও দেখছেন!

যাদের সামর্থ্য আছে খাদ্য মজুদ করে রাখছেন। কিন্তু দেশের এই সুবিধাভোগী শ্রেণী দিয়ে আপাময় জনগণের বিচার করলে চলবে না। ইতিমধ্যে কাজ না থাকায় বহু নিম্নবিত্তের অবস্থা শোচনীয় আকার নিয়েছে। অর্ধাহারে, প্রায় অনাহারে কাটছে তাদের জীবন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণ বন্ধ। শোনা যাচ্ছে রেশনিং কর্মসূচির কথা। কিন্তু চাল বিতরণ বা রেশনিং যাই বলি, এটা বর্তমান পরিস্থিতি ট্যাকল দেওয়া মাত্র। কিন্তু ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখা এখন সবচাইতে জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এবং কৃষি বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যাপক কর্মসূচি নিতে হবে।

সরকার ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন। বলা হচ্ছে, এই তহবিল থেকে গ্রামাঞ্চলে যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষি তাদের দেওয়া হবে। যারা পোলট্রি, কৃষি ফার্ম, ফলমূল, মশলাজাতীয় খাদ্যপণ্য উৎপাদন করবেন, তারা এখান থেকে ঋণ নিতে পারবেন, যাতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং সরবরাহ হয়।

কোনো জমি অনাবাদি না রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন, কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে পারেন, কারণ সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামজাতকৃত মোট মজুদ ১৭.৫১ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ১৪.২৯ লাখ মেট্রিক টন এবং গম ৩.২২ লাখ মেট্রিক টন। খাদ্যশস্যের মজুদ সন্তোষজনক, মাসিক চাহিদা ও বিতরণ পরিকল্পনার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এ মুহূর্তে খাদ্যশস্যের কোনো ঘাটতি নেই বা ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই।”
আর মিল মালিক, পাইকার, কৃষক, ভোক্তাসহ বেসরকারি খাত মিলিয়ে দেশে এখনও খাদ্য মজুদ আছে দেড় কোটি টন।

কথা হচ্ছে, খাদ্যমজুদ নিয়ে যদিও উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, কিন্তু ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা অনিয়ম সংবাদ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। ত্রাণের চাল পাওয়া যাচ্ছে সরকারি লোকজনের বাড়িতে বাড়িতে। গরিব লোকের হাতে যাতে করে যথাযথভাবে খাদ্য পৌঁছানো যায়, সে ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বনের বিকল্প নেই।

এতো গেল বর্তমান পরিস্থিতি। কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য সবরকমের নেতিবাচক পরিস্থিতি সামলাতে সরকার যদি এখনই কঠোর না হয়, সতর্ক না হয়, তবে এর ফলাফল যে ভয়াবহ হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

দরিদ্র কৃষক যাতে করে সহজে ঋণের টাকা নিতে পারেন তার ব্যবস্থা করতে হবে। এমন যেন না হয় যে ঋণের টাকা নিতে গিয়ে হাজারও ভোগান্তি পোহাতে হয়!

এ প্রসংগে রাজনীতির বিশ্লেষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ তাঁর একটি কলামে লিখেছেন, এখানে তা উদ্ধৃতি করলে বোধকরি অত্যুক্তি হবে না।
তিনি লিখেছেন,
“যেখানে লক ডাউন এবং বাজারে চাহিদা হ্রাসের কারণে কৃষকরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে শুরু করেছেন এবং তাদের ওপরে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে কৃষকদের জন্যে অন্যান্য শিল্পের মতো ঋণের ব্যবস্থা যথোপযুক্ত বলে মনে হয় না। ছোট ও মাঝারি কৃষকরা এ থেকে লাভবান হবেন নাকি আরো বেশি ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়বেন সেটা ভাবা দরকার। এটা মনে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশে বড় আকারের শিল্প ঋণগ্রহীতারা আইনের ঊর্ধ্বেই থাকেন, তারা ঋণখেলাপি হলেও তাদের কিছুই অসুবিধা হয় না; তাদের ঋণ অবলোপন হয়। অন্যদিকে সামান্য কৃষি ঋণের কিস্তি না দিতে পারলে কৃষকদের কোমরে দড়ি বাঁধা হয়। ফলে কৃষকদের ঋণের বদলে এককালীন বা মাসভিত্তিক সাহায্য দেয়া যায় কিনা সেটা এখনই বিবেচনা করা দরকার।”

যাহোক প্রসঙ্গে আসি, বর্তমানে বোরো ধানের সময়। এই সময় সরকারের উচিত হবে কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান কিনে নেওয়া। তাতে করে কৃষক যেমন ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে, তেমনি সরকারের কাছে খাদ্যের সন্তোষজনক মজুদের নিশ্চয়তা থাকবে।

অর্থনীতির এই থমকে যাওয়া বিরাটসংখ্যক নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষকে আরও অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্যতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। মূলত দিচ্ছেও। লোকের বেঁচে থাকতে হলে বা সহজ কথায় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে খাদ্যের যোগান নিশ্চিত রাখতে হবে আর তাই কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই কৃষক এবং কৃষিখাতকে বাঁচানোর দিকে নজর দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে কৃষি না বাঁচলে বাঁচবে না দেশ। বস্তুত কোভিড – ১৯ আমাদের অর্থনৈতিক দিকে এমন হতাশাজনক অবস্থার মুখোমুখি করেছে, যা আমরা কল্পনাও করিনি।

আমরা জানি না এ অবস্থা আর কতদিন চলবে; কবে নাগাদ আমরা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবো! আর যদি স্বাভাবিক অবস্থা ফিরেও আসে, কবে নাগাদ আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক হয় তা বলা মুশকিল। বিশ্লেষকরা বলছেন,
বেশকিছু দেশে ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার মতো রক্ষণশীলতারও উত্থান ঘটছে! এই মুহূর্তে এই রক্ষণশীলতা শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় বা জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে। কিন্তু এটা আরও অনেক জায়গায় ছড়িয়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশংকা।

যদি এমন হয় তবে বাংলাদেশকেও এই পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করতে হবে। বাংলাদেশকে তখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থায় স্বয়ংস্বম্পূর্ণ হতে হবে।

আমরা যদি নিজেরা উৎপাদন ঠিক রাখি তবেই এই সঙ্কট মোকাবেলা করতে পারবো।

তাই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি ও কৃষকের দিকে নজর দেয়ার এখনই সময়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.