লকডাউনে মারাত্মক ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্যর নারী গৃহকর্মীরা

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন:

শ্রম অধিকারহীন, নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা ও নির্দিষ্ট মজুরি ব্যতিরেকে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করে নারী গৃহকর্মীরা। মূলত দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা অঞ্চল থেকে এইসব নারী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমান ভাগ্য জয়ের আশায়। আরব নিউজ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে পাঁচ লাখের লাখের মতো বাংলাদেশী গৃহকর্মী কাজ করে। কিন্তু ভাগ্য জয়ের আশায় যাওয়া এসব শ্রমিকদের মাঝে মাঝে বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের নারী গৃহকর্মীদের বেতন না দেওয়া, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অহরহ ঘটনা ঘটেছে। শুধুমাত্র ২০১৯ সালে সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশে ফিরে এসেছে ৯০০ নারী গৃহকর্মী। লাশ এসেছে ৪৮ নারী গৃহকর্মীর যাদের মধ্যে ২০ জন নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে। জীবিত ফেরাদের মধ্যে নির্যাতনের কারণে মেরুদন্ডের পাঁজর ভেঙে যাওয়া নারীও রয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা নারী গৃহকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কোন কর্মঘন্টা মানা হয় না। নারী গৃহকর্মীদের গৃহকর্তারা বাড়িতে থাকতে বাধ্য করেন। যদিওবা সরকারের অভিবাসন আইন তাদের আলাদা বাসায় থাকার অনুমতি দেয়। কিন্তু গৃহকর্তারা তাদের সে সুযোগ দেন না যার ফলে সারাদিন ধরে বাড়িতে অতিরিক্ত কাজ করাতে বাধ্য হয় কর্মীরা।

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলা লকডাউনের ফলে এসব কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এমনিতে মধ্যপ্রাচ্যের নারী গৃহকর্মীদের রমজান উপলক্ষ্যে বিশেষ ও অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। আমাদের দেশে যেমন ঈদের আগের সাজসাজ রব হয় মধ্যপ্রাচ্যে সেটা হয় রমজানের শুরুর দিকে। সেই উৎসব চলতে থাকে পুরা রমজান জুড়ে। নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন, ভোজন পর্ব ও আলোক সজ্জায় ভরপুর থাকে সময়টুকু। যার অতিরিক্ত কাজের ধকল নিতে হয় গৃহকর্মীদের। এবার সেখানে যোগ হয়েছে লকডাউন।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে লকডাউনের সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সৌদি আরবে রমজান মাসে তারাবিহ মসজিদে না পড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সুতরাং পুরা রমজান জুড়ে চলতে পারে এই লকডাউন। এই লকডাউনে গৃহকর্তারা সারাদিন বাড়িতে থাকছেন। সেই সাথে বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। সুতরাং আরও অতিরিক্ত কাজের ধকল সইতে হচ্ছে গৃহকর্মীদের। আসন্ন লকডাউন রমজানে তা বৃদ্ধি পাবে কয়েকগুণ। মধ্যপ্রাচ্যে নারীদের কোন ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যতিরেকে এসব গৃহকর্মের কাজ করে। যাদের মধ্যে অনেকে আগুনে পুড়ে মারাত্মক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। লকডাউনে অতিরিক্ত কাজের পাশাপাশি কোভিড-১৯ ঝুঁকিতেও রয়েছেন তারা। এসব গৃহকর্মীরা মধ্যপ্রাচ্যে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের সেবায় বাধ্য হতে পারার আশঙ্কাও থাকছে।

বেশ কিছু আন্তজার্তিক মানবধিকার সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যেরর নারী গৃহকর্মীদের দৈনিক ২১ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করা, সাপ্তাহিক ছুটি না দেওয়া ও অপর্যাপ্ত খাবার খেতে দেওয়ার অভিযোগ করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা তো আছেই। এছাড়া গৃহকর্মীদের পাসপোর্ট জব্দ করে রাখে মালিকরা। ফলে আইনের ফাঁক ফোঁকরের কারণে এসব গৃহকর্মীদের প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের গৃহকর্মীদর কাফেলা বা মালিক পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই। শুধুমাত্র গৃহকর্তা অনুমতি দিলে বা ইচ্ছা পোষণ করে কর্মক্ষেত্র বা মালিক পরিবর্তন করা যায়। সহিংসতার মুখে কেউ যদি পালিয়ে যায় তবে তাকে ধরা পড়তে হয় পুলিশের হাতে। সেক্ষেত্রে আইন বলছে তাকে হয় মালিকের কাছে ফেরত পাঠানো হয় নতুবা যেতে হয় জেলে। জেল থেকে ফেরত পাঠানো হয় নিজ দেশে। সুতরাং যত অন্যায় ও নির্যাতন করা হউক না কেন তাদের তা মেনে নিতে হয়। ফলে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এসব নির্যাতন অত্যাচারের কথা চাপা থেকে যায়।

ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে করোনা পরিস্থিতির কারণে চাকরি হারানো, বেতন কর্তন ও অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা তৈরী হয়েছে। ফলে গৃহকর্তাদের এসব মানসিক অবসাদের বলি হতে পারেন গৃহকর্মীরা। ফলে এসব গৃহকর্মীরা প্রচন্ড রকমের ক্রিয়াঘটিত, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারেন।

যেহেতু গৃহকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কোন ওয়েজ বোর্ড নেই। ফলে মালিকদের অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা কর্মীদের বেতন বঞ্চিত করবে। লেবাননে ইতিমধ্যে গৃহকর্মীদের বেতন করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে লকডাউনে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অভিবাসী শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে সরকারের নির্দেশনা থাকলেও গৃহকর্মীদের নিয়ে কোন ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তাদের নিরাপত্তা, বেতন বা অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে সরকারের নীতি নির্ধারক থেকে নির্দেশনা বা মধ্যপ্রাচ্যের মূল ধারার গণমাধ্যমেও তেমন আলোচনা নেই। কিন্তু তারাই রয়েছেন চরম ঝুঁকিতে। খুব শিগগিরই অধিকার কর্মীদের এই বিষয়ে মূল ধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা তোলা উচিত।

লেখক

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.