মৃত্যুর দীর্ঘশ্বাসে আমি প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে ফিরি

সাবিরা শাওন:

আজকাল ভীষণ অস্থিরতায় কাটে দিনগুলো। পত্রিকা, ফেসবুক কিংবা সামাজিক সাইটগুলোতে শুধুই মৃত্যুর ছড়াছড়ি। ভালো খবর পাবো কীভাবে? পুরো পৃথিবীর অসুখ যে! কেউ ভালো আছে এই কথোপকথনটুকুই এখন কাল্পনিক।

তবুও দিন কাটছে। আতংকে, অস্থিরতায়। আজ সকাল থেকে পুরো ফেসবুক জুড়ে ছিলো সিলেটের ডাঃ মঈন স্যারের মৃত্যুর খবর। প্রথমেই খবর টা দেখে যে কথাটি মনে এসেছে তা হলো, সবে তো শুরু। এই প্রথম কোন ডাক্তার মারা গিয়েছে বলে আজকে শোকটা একটু বেশিই। অপেক্ষা করো বাংলাদেশ, লাশের ভারে নুয়ে পড়তে তোমার বেশি দেরি নেই। আরো কতো ডাক্তার মরবে, পুলিশ মরবে, নাম-পরিচয়হীন আম জনতা মরবে! কতো জনের জন্য শোক বাক্য লিখবো তুমি!!!

ঠিকই পড়েছেন। এই ভাবনাটাই প্রথমে আমার মনে এসেছে।

এরপর যখন সদ্য পুলিশ ফোর্সে জয়েন করা আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের টেক্সট আসলো। বান্ধবী, খুব টেনশনে আছি। আমার এখানে (বারহাট্টা, নেত্রকোণা) ছয়জনের করোনা পজেটিভ। কী করবো, বুঝতে পারছি না। আমি নিরুত্তর থেকে শুধু লিখেছিলাম, সাবধানে থাকিস।

তখন থেকেই আতংকটা আমার আশাবাদী সত্তার শ্বাসরোধ করছে বারবার। মনে হচ্ছে, আজ ডাঃ মঈনের কফিনে আমার কোন প্রিয়মুখ থাকতে পারতো! হাসপাতালে ডিউটিরত আমার বোন, শহরের অলিতে-গলিতে টহলকারী র‌্যাবে কর্মরত বড় ভাই কিংবা রেড ক্রিসেন্টের ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করা ছোট বোন।

একমুহূর্তে মনে পড়তে থাকে কত কত প্রিয় মানুষের মুখ। তারা সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশে-বিদেশে; পৃথিবীর নানা প্রান্তে জীবিকার প্রয়োজনে। তখনো কি আমি এড়িয়ে যেতে পারতাম সমূহ নিশ্চিত পরিণতিকে?

জার্মানিতে আছে আমার পরিবারের এক অংশ। ইউরোপের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে ভয় পেলেও একটু স্বস্তি পাই এটা ভেবে যে, ওরা অন্তত বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে না। আশায় থাকি আবার আমি আর জাওয়াদ ঘুড়ি বানাবো।

কিন্তু আমি নিরুত্তর থাকি যখন মা আমাকে জিজ্ঞেস করেন, যদি আমরা কেউ অসুস্থ হয়েও পড়ি, তাহলে কী হবে?
আমি তো কোন মন্ত্রী বা আমলা নই। তাই বলতে পারি না যে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত। তুমি চাইলেই ৫ মিনিটে হাজির হবে এম্বুলেন্স।

কেন বলতে পারি না জানেন? কারণ, চিকিৎসাটা দেয় চিকিৎসকরা। ভণ্ড, মিথ্যেবাদী, স্বার্থপর, নীচ জনপ্রতিনিধিরা নয়। যেদেশে খোদ চিকিৎসক চিকিৎসার অভাবে মারা যায়, সেদেশে প্রতিটা মানুষের নাম মৃত্যু অনিবার্য। এই স্বাভাবিক কথাটা বুঝতে বুদ্ধিজীবী হতে হয় না।

টলে যায় আত্মবিশ্বাসের ভিত যখন ফোনের ওপারে ডাক্তার বোনের আতংকিত গলা শুনি। যিনি নিজেই জানেন না নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবেন৷
টিভির পর্দায় নয়, নিজের চোখে যখন দেখি এক পুলিশ বোন কোনো ধরনের প্রটেকশন ছাড়াই শুধু মাস্ক পরে হাইওয়েতে ডিউটি করছেন। ডিপার্টমেন্টের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই লোকজনকে বুঝাতে গিয়ে গলদঘর্ম হচ্ছেন, কেন তিনি ঘরে থাকবেন? তবুও সব বিকারহীন। কেউ প্রয়োজন বোধ করছে না পরিস্থিতি বোঝার। কেউ পথেঘাটে ঘুরছে অন্নের সংস্থানে আবার কেউবা আনন্দে।
অথচ প্রতিদিন নিয়ম করে আমরা প্রকাশ করি আমাদের অকৃতজ্ঞতা। একেকটা ঘটনা নিয়ে হইহই রইরই করি। একবার বিবেচনা করি না পরিস্থিতি।

মানবিকতার মানদণ্ডে আমরা অনেক আগেই হারিয়েছি মানুষের পরিচয়৷ এখন যেটুকু আছে তা শুধু নিজেকে অমানুষ প্রমাণের চেষ্টা। আর তাই করছি। কোটি জীবনকে জিম্মি করে নিজের পকেট ভরাট করছি। ক্ষুধার্তের খাবার ছিনিয়ে নিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি। পায়ের নিচে হাজার হাজার লাশের স্তুপে ভর করে উঠছি উপরে, আরো উপরে। কবে বুঝবো আমরা জীবনের মূল্য!

পৃথিবীর এই সংকট যদি এখনো আমাদের শিক্ষা দিতে পারে তবে খোদ সৃষ্টিকর্তা-ই একদিন নিজেকে অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে মানুষ সৃষ্টির জন্য। অনেকেই বলছেন, বিশ্বাস করেন দুঃসময় শেষে আলো আসবেই। আমিও বিশ্বাস করবো, যেদিন আমি জানবো কীভাবে আসবে?
আচ্ছা, ক্ষতি নেই উত্তর না পেলে। তবুও আলো আসুক। মানুষে মানুষে ভরে যাক পুরো পৃথিবী।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.