এই সময়ে কী দেখছি, কী ভাবছি কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ!

শাহরিয়া দিনা:

পৃথিবীর এই অসুস্থতার সময়ে এসে জীবন নাকি জীবিকা বড়, এমন প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমরা। নিম্নবিত্ত আছে সাহায্যের আশায়, মধ্যবিত্ত ভাবছে এ মাসটা তো কোন রকম চললো, সামনের মাসে চলতে পারবো তো? চাকরিটা থাকবে তো? বাড়িভাড়া সময়মতো না দিলে কী হবে? এসবের মধ্যেই আমাদের বড় একটা সময় কেটে যায় অনলাইনে। সামাজিক দূরত্ব বজায়ের এইসব দিনে আমাদের সময় কাটানোর অন্যতম অনুষঙ্গ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

এই মাধ্যমেই জানছি কত ঠুনকো আমাদের পারিবারিক সম্প্রীতি। করোনা আক্রান্ত বলে বৃদ্ধ মা’কে জঙ্গলে ফেলে যাচ্ছে সন্তান, সন্তানকে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে পিতা-মাতা, গর্ভবতী নারীরও দাফন হয় না স্বামীর বাড়িতে। যে সমাজের চিন্তা করে ‘লোকে কী ভাববে’ বলে আমরা অস্থির থাকি, সেই সমাজের অবস্থাও তথৈবচ। জানাজা পড়াতে মানুষ পাওয়া যায় না, লাশ বহনের জন্য খাটিয়া দেয়া হয় না, গোরস্থানে দাফন করা যাবে না বলে সাইনবোর্ড টানানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে।

শাহরিয়া দিনা

সিলেট থেকে ঢাকায় আসার জন্য ডাক্তার মঈন একটা সাধারণ এম্বুলেন্স পান না, সেখানে শফী হুজুরকে এয়ার এম্বুলেন্সে করে ঢাকা আনা হয়। ডাক্তার মঈন মারা গেছেন। ধর্ম ব্যবসা আর ক্ষমতার লোভে বিভোর এই জনপদে মানুষ মানুষের জন্য না, স্বার্থের জন্যই মানুষ। আমরা ভালো না, কিন্তু ভালো সাজতে খুব পছন্দ করি। তাইতো ত্রাণ দিচ্ছেন এমন ছবি তোলার পর ত্রাণ ফিরিয়ে নেবার মতো ঘটনা হয়। ছবি না তুললে ত্রাণ দেয়া হবে না বলে দেয়। অনেক জায়গায় তো লোকের ভীড়ে বোঝাই যায় না আসলে কে ত্রাণ নিচ্ছেন। সবকিছুই আমাদের লোক দেখানো।

লোক দেখানোটা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে কেউ সুইসাইড করবে সে-ও ফেইসবুক স্টাটাস দিয়ে কে দায়ী, কার উপরে অভিমান, তা জানান দিয়ে যাচ্ছে। লাইভে এসে খুন করার মতো ঘটনাও ঘটলো। এইসব ঘটনার একটাই উদ্দেশ্য, নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে চাওয়া। স্বাভাবিকভাবেই তারা সফল হোন, কারণ মানুষ তাদের প্রতি সমর্থনমূলক সহানুভূতি দেখান। মানুষের সিম্প্যাথি পাওয়ার এই যে মনঃতাত্ত্বিক ব্যাধি, এর উপশম কী? করোনা ভাইরাস হয়তো একদিন বিদায় নিবে, কিন্তু এই মনের ভাইরাস থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় নেই যদি না আপনি নিজে নিজেকে সাহায্য করেন।

কিছুদিন আগে অনলাইনে জুয়া খেলে নিঃস্ব হয়ে এক ইঞ্জিনিয়ার নিজের স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন হাতুড়ি পেটা করে। এই আইডিয়া তিনি পেয়েছেন ভারতীয় সিরিজ ক্রাইম পেট্রোল দেখে। আজ যিনি স্ত্রীকে খুন করলেন তার টাইমলাইন ঘুরে দেখলাম সমস্ত মারামারি, খুন-খারাবি’র ভিডিও শেয়ারে ভর্তি। অর্থাৎ আপনি কী দেখছেন সেটা আপনার ভাবনাকে প্রভাবিত করছে।

কারো সামনে ভালো সাজবার কিছু নেই, মানুষকে দেখানোর কিছু নেই, নিজেকে কারো কাছে প্রমাণেরও কিছু নেই, দিনশেষে আপনার মানসিক শান্তিই গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে এসেছেন একা, চলেও যাবেন একা, মাঝখানের এই সময়টা শুধু এডজাস্ট করে নেয়া। মানিয়ে নেয়া আর মেনে নেবার বিষয়টা যদি একান্ত অসম্ভব হয়েই যায়, তবে ছেড়ে দিন নাহ! নিজের মতো করেই বাঁচুন।

শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি বেশিরভাগ মানুষ চরম স্বার্থপর এবং লোভী। এই স্বার্থ এবং লোভের পরিণতিই ভোগ করছে আজকের পৃথিবী। আপনি স্বার্থহীন হলেন আপনারে কেউ ঠকালো, ব্যাপার না। সে আসলে নিজেকেই ঠকালো, আপনার মতো বিশ্বস্ত বন্ধু হারালো। সে ওই বেশিরভাগের দলে ধরে নিন। আপনি ব্যতিক্রম। সবাই যদি একইরকম হতো, তবে মানবিক ব্যাতিক্রমদের নাম ইতিহাসে আলাদা করে লেখা হতো না। আপনার নাম হয়তো ইতিহাসে লেখা রবে না, কিন্তু বিশ্বাস করুন, কারো ক্ষতির কারণ হননি ভেবেই একবুক স্বস্তি আর তৃপ্তি নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারবেন। মৃত্যুই সত্যি, মৃত্যুই আমাদের গন্তব্য, স্মরণ রাখতে হবে।

নিজের যা করতে ভালো লাগে তা যদি অন্যের ক্ষতির কারণ না হয় তবে সেটাই করুন। ভালো মানুষের জীবনী পড়ুন। মানুষের কল্যাণে কাজ করুন। একজন মাদার তেরেসা বা একজন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল কিংবা একজন নেলসন ম্যান্ডেলা কিন্তু চিন্তা করেননি তাদের কেউ এপ্রিশিয়েট করলো কিনা! তারা শুধু নিজের কাজটাই করে গেছেন।

আপনি ভালো কিছু দেখুন, ভালো মানুষের সাথে গল্প করুন, একটা ভালো বই পড়ুন, সেটা যেমন আপনার চিন্তাকে প্রভাবিত করছে দৃষ্টিভঙ্গিতে বদলাতে সাহায্য করে, ঠিক তেমনি পর্ন- ভায়োলেন্স ইত্যাদিও আপনার ভেতর নেতিবাচক সত্ত্বাকে উসকে দেয়। আপনার আশেপাশের মানুষের আচরণ এবং পারিপার্শ্বিকতা মনোজগতে বড় ভূমিকা রাখে। দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপারটা হয়তো খুব সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু এই সামান্য ব্যাপারটাই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কখনো বড় ধরনের দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে, আবার দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করতেও পারে।

আমাদের জন্য এই সময়টা একটা ক্রান্তিকাল। নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। এরা না পারছে হাত পেতে লাইনে দাঁড়িয়ে সাহায্য নিতে, না পারছে কিছু করতে। এই সময়ে পরিবার-প্রিয়জনদের মানসিক সাপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগে মারা যাবেন, ক্ষুধায় মারা যাবেন, সেটা না ভেবে অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজবার সময় এখন না। ধৈর্য্য ধরে পাশে থাকুন শক্তি হয়ে, রাগের বশে ধ্বংস করবেন না নিজেকে এবং পরিবারকে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.