লকডাউনে পুরুষের কৌতুক বনাম নারীর প্রতি সহিংসতা

মেহেরুন নূর রহমান:

কোভিড – ১৯ এর কারণে লকডাউনের পর আমি খেয়াল করলাম এক ধরনের কৌতুক দারুণভাবে ভাইরাল হচ্ছে। সেসব কৌতুকের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে এই সময়ে স্বামীরা স্ত্রীদের দ্বারা কীভাবে নির্যাতনের শিকার। শুধু তাই নয়, তারা কতভাবে স্ত্রীদের অনুনয় করছে তাদের অত্যাচার না করতে, সেটাও এই সব কৌতুকের বিষয়বস্তু। নারী পুরুষ নির্বিশেষে হাহা রিয়েক্ট দিচ্ছে সেসব কৌতুকে। আমার সেন্স অফ হিউমার হয়তো এতো ভালো না তাই এসব জোকস এ হাসির বদলে আমার বিরক্ত লাগে। অনেকেই বলে, এতো সিরিয়াস হবার দরকার কি? জাস্ট এ জোক। আসলেই কি তাই?

যেমনটি ভাবা হয়েছিলো, বিশ্বজুড়ে এই মুহূর্তে নারী ও শিশুরা মানসিক ও শারীরিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ডমিস্টিক অ্যাবিউজ হেল্পলাইন এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হেল্পলাইন ওয়েবসাইট পরিদর্শন গত মাসের তুলনায় এই মাসে বেড়েছে ১৫০% এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে সাহায্য চাওয়া কলের সংখ্যা বেড়েছে ২৫%। অস্ট্রেলিয়ায় এই কলের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫% এবং ফ্রান্সে ৩২%। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে পুলিশের কাছে ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে ঘরোয়া সহিংসতার কল বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০% থেকে ৪০%। পুরুষসঙ্গীরা তাদের স্ত্রী সঙ্গীকে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে যাতে তারা অসুস্থ হয় এবং মরে যায়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে লেবানন ও মালয়েশিয়ায় ডোমেস্টিক হেল্পলাইনে সাহায্যের জন্য গত বছরের একই মাসের (মার্চ) তুলনায় দ্বিগুণ কল এসেছে। চীনের ক্ষেত্রে এটি বেড়েছে তিনগুণ।

মেহেরুন নূর রহমান

নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণগুলোর একটি হচ্ছে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর প্রতি চিরায়িত অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য, ঘৃণা যা নিয়ে একটি পুরুষ বড় হয় এবং সচেতনে/অবচেতনে নারীকে নিজের চেয়ে নিকৃষ্ট ভেবে অশ্রদ্ধা করতে থাকে। ফলত তাদের কাছে নারীকে আঘাত করাটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তাছাড়া নারীকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে বা হাতের মুঠোয় রেখে পুরুষরা একধরনের পুরুষালী প্রশান্তি অনুভব করে এবং যার হাতিয়ার হিসেবে অনেকেই ব্যবহার করে সহিংসতাকে।

করোনার এই অনিশ্চয়তার মুহূর্তে সকলের জীবনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। লকডাউন এবং কোয়ারেনটাইন এর কারণে অনেক নারী তাদের হিংস্র সঙ্গীদের সাথে দীর্ঘ সময় একসাথে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। মৃত্যু ভয়, অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ এইসব হিংসাত্মক সম্পর্কগুলোকে করে তুলছে আরও বেশি সহিংস। একজন অত্যাচারী পুরুষ যখন তার চারপাশেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না তখন তাদের রাগ ক্রোধ গিয়ে পড়ছে সঙ্গী এবং সন্তানদের উপরে। স্ত্রী/সঙ্গী এবং সন্তানদের অত্যাচার করে তারা ভালো বোধ করছে। এবং এই কারণেই নারী এবং শিশুদের উপর ঘরোয়া নির্যাতন এই সময়ে ভয়াবহভাবে বেড়ে চলছে।

পূর্ব চীনের আনহুই প্রদেশের ২৬ বছরের লেলেকে তার স্বামী চেয়ার দিয়ে যখন মারছিলো তখন লেলের কোলে ছিল তাদের ১১ মাসের শিশু কন্যা। ক্রমাগত এই আঘতে লালের পা ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে এবং এক পর্যায় লালের একটি পা অনুভূতি হারিয়ে ফেলে এবং সে মাটিতে পড়ে যায়। তখনও সে দুহাতে আঁকড়ে ধরেছিল তার কন্যাকে। এই ঘটনা ঘটে মার্চের ১ তারিখে।

এই ঘটনার মতো আরও অসংখ্য ঘটনা চারপাশে ঘটছে এবং ঘটবে।
বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে ৮০% এর বেশি নারী ঘরোয়া সহিংসতার শিকার, সে দেশে এই লকডাউনের সময় নির্যাতনের পরিমাণ যে কত বেড়েছে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। অত্যাচারিত হয়ে সাহায্যের জন্য ঘর থেকে বের হতেও পারছে না, আর এই সময় পুরুষদের এইসব নাকি কান্নার কৌতুক আমাকে কেন যেন ঠিক হাসাতে পারছে না। ওয়াইফ শেমিং এর এই জোয়ারে আমি গা ভাসতে পারছি না। বিরক্ত হয়েন না এবং দয়া করে জাস্ট এ জোক বলে উপদেশ দিতে আসবেন না। আমি না হয় নাই হাসলাম, আপনারা হাসতে থাকেন।

লেখক পরিচিতি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর।
লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং এডভার্টাইজিং সংস্থায় অপারেশনস ডিরেক্টর হিসাবে কর্মরত।
গত ১৪ বছর ধরে লন্ডন এ বসবাসরত।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.