লকডাউন না অর্থনৈতিক ক্ষতি, কোনটা বেছে নেওয়া হবে?

নাসরীন রহমান:

বিশ্ব পরিস্থিতির খোঁজ-খবর যারা রাখছেন এই মুহূর্তে নিশ্চয় নিউজটি নজরে এড়ায়নি তাদের। যারা অসাবধানতাবশত স্ক্রল করেছেন নিউজটি তাঁদের জন্য জানাচ্ছি,

“নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট বিশ্বমহামারি কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ইউরোপজুড়ে আরোপিত লকডাউন ধাপে ধাপে শিথিল করা হচ্ছে। স্পেনের সীমিত পরিসরে লকডাউন প্রত্যাহারের ঘোষণার পর এবার অস্ট্রিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির কয়েক হাজার দোকান খুলে দেওয়ার।”
(বিবিসি)।

ইতালিতে পাঁচ সপ্তাহের লকডাউনের পর খুলছে বই, স্টেশনারি, বাচ্চাদের জামা কাপড়ের দোকান। এছাড়া কম্পিউটার ও কাগজপাতি তৈরির কাজও শুরুর অনুমতি দেয়া হয়েছে সেখানে।

লকডাউন কতদিন চলতে পারে এ প্রশ্নের উত্তরে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন ;”ক্ষমতার আসনে থাকলে কী সিদ্ধান্ত নিতাম বলা মুশকিল, কারণ তাতে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে কিছু লোককে মারা যেতে দিতে হবে। সব বন্ধ করতে কিছু বিলম্ব করলে বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। আবার অন্যদিকে, লোকের উপর বাড়িতে বসে থাকার, সবকিছু বন্ধ রাখার জন্য চাপ তৈরি করলে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। কারণ পাঁচ মাস সবকিছু বন্ধ থাকলে লোকে মনে করবে, নীতি তৈরির কোনও কেন্দ্রই আর কাজ করছে না। একদিকে মানুষের প্রাণ বাঁচানো, আর অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার বিপুল প্রশাসনিক ব্যয় ও অর্থনীতির প্রবল ক্ষতি, এই দুটোর কোনও একটার দিকে পাল্লা ভারী হবে। প্রাণ বাঁচানোর কাজে একটু খারাপ করলে অর্থনীতিকে বাঁচানোর কাজটা হয়তো একটু সহজ হতে পারে …” আমি জানি না। বলছি না যে বেছে নেওয়া সহজ কাজ হবে।”

আমরা যেন তাঁর কথার প্রতিধ্বনিই দেখতে পাচ্ছি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লকডাউন শিথিল করার সংবাদগুলোতে।

করোনা ভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া যে আগের যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের চেয়ে বেশি হবে, সে বিষয়ে কারও মনেই সংশয় নেই। অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলার জন্য প্রতিটি দেশই নিজস্ব কৌশল নিবেন স্বাভাবিক।

আমরা দেখছি, ভারতে ৩রা মে পর্যন্ত চলবে লকডাউন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই ঘোষণা করার পাশাপাশি আরও জানিয়েছেন, এখন থেকে ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় বিবেচনা করে দেখা হবে – এই সব বিধিনিষেধ থেকে কোথাও কোনও ছাড় দেওয়া সম্ভব কিনা!

তার মানে এই দাঁড়ায় সেখানেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হতে পারে অর্থনৈতিক স্বার্থেই। বাংলাদেশে করোনার কারণে সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে ১৪ এপ্রিল করা হয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩০ মে পর্যন্ত ছুটি। এই অবস্থায় সাধারণ ছুটি বাড়ানো হবে কিনা তা যদিও নীতিনির্ধারকেরা সিদ্ধান্ত নিবেন তবে সাধারণ সেন্স বলে যদিও বা ছুটি বাড়ানো হয়, তবে সেটা নিশ্চয় করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত নয়।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের মালিকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে করোনার কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকায় রেমিট্যান্স আসা কমে গেছে।

কৃষিপ্রধান এই দেশে এখনই ধান কাটার মৌসুম; এই সময় ধান মাঠ থেকে তোলা না হলে সামনে কালবৈশাখে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা। কিন্তু লকডাউনে কারণে কার্যত সবই বন্ধ। যেহেতু প্রতিষেধক আবিষ্কার সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, তাই সেই পর্যন্ত পৃথিবী থমকে থাকবে এমনটা যারা ভাবছেন তারা আসলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন!

একথা ঠিক যে বিধিনিষেধ আরোপের ফলে মৃত্যের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে; কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না। তাই এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দেশগুলোকে একটি কৌশল খুঁজে বের করতে হবে। বিধিনিষেধগুলো প্রত্যাহার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার উপায় খুঁজতে হবে।
জীবন রক্ষা এবং মানুষকে কর্মে ফিরিয়ে আনার কাজটি একই সঙ্গে করতে হবে, একটির আরেকটি বিকল্প হিসেবে নয়।
লকডাউন যেমন চূড়ান্ত সমাধান নয় তেমনি এভাবে জীবন বাঁচাতে ঘরে বসে থাকার সময় যত দীর্ঘ হবে, অর্থনৈতিক সংকট তত বাড়তে থাকবে।

পরিশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহামারি ও রোগবিস্তার-সংক্রান্ত বিদ্যার বিশেষজ্ঞ নট ভিটকস্কি কী বলেছেন, তা উদ্ধৃত করে লেখাটি শেষ করছি-

“করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় যে লকডাউন চলছে তাতে করোনা ভাইরাসের মহামারির সময় আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।” নুট ভিটকস্কি আরও বলেন, “যদি আমরা জনগণকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে দিতাম এবং বিপদ কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সবচেয়ে অসুস্থদের সহায়তা দিয়ে যেতাম তাহলেই বরং করোনা ভাইরাসকে নির্মুল করা যেত।”

শেয়ার করুন:
  • 240
  •  
  •  
  •  
  •  
    240
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.