নারীর হোম অফিস বনাম যম অফিস

মুশফিকা লাইজু:

এই মহাদুর্যোগে অন্য আর সকলের চেয়ে নারীরা সবচেয়ে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত। এটাই পৃথিবীর ব্যাকরণ, যেকোনো দুর্যোগে নারীরাই বেশি ভূক্তভোগী হয়। কারণ নারীরা নিপীড়িতদের চেয়েও নিপীড়িত, দরিদ্রদের চেয়েও দরিদ্র। টিকে থাকার জন্য তার যে অদৃশ্য যুদ্ধ, তার কোন পরিসংখ্যান নেই, থাকে না কখনও। এই খারাপ সময় পাড়ি দিতে যেয়ে এদেশের নারীদের কর্মঘণ্টা বেড়ে তিনগুণ-চারগুণ হয়েছে। বেড়েছে পারিবারিক নির্যাতন , মানসিক নির্যাতন। বৈবাহিক ধর্ষণ বেড়েছে।

আরও নানাবিধ যন্ত্রণার শিকার হচ্ছে নারীরা। উপরন্তু প্রফেশনাল নারীদের বেড়েছে পেশাগত নির্যাতন। সময়ের প্রয়োজনেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এবং দেশীয় বড় বড় সংস্থাগুলি হোম অফিস প্রথা চালু করেছে। মোটের উপর ভালো, কিন্তু আমাদের দেশে এর আগে এতো ব্যাপকভাবে হোম অফিসের কনসেপ্ট চালু ছিল না। সুতরাং এই হোম অফিসের নিয়মনীতির আদব কেতা দুপক্ষের কেউ ভালোভাবে রপ্ত করতে পারেনি এবং জানেও না।

গত এক সপ্তাহে দশটির উপরে ফোন কল পেয়েছি নারীদের কাছ থেকে, যারা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হোম অফিস করছেন। তারা প্রত্যেেকই অবসন্ন-ক্লান্ত। কারণ তাদের সুপারভাইজাররা মনে করছেন, বাড়ি থেকে কাজ মানে ঐ জুনিয়র সহকর্মীর রাতের ঘুমটুকু বাদে সকল সময় তার কাছে বাঁধা বা বাধ্য। তাদের বস নিজের সুপারভাইজারি টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বস হিসেবে কতটা যোগ্য, প্রমাণ করতে গিয়ে সক্ষমতার বাইরে কাজের ফরমাইস ঠুকে দেন, সময়ের সাথে কোন সমন্বয় না করেই।

মুশফিকা লাইজু

শুনেছি সকাল ৬ টায় ই-মেইল করে, রাত ১১টায় কাজের হিসেব চান। বিনীত হয়ে দুবির্নীত আচরণ করেন ফোনে। আবার রাত ১১টায় কাজ দিয়ে পরের দিন সকালে ১০ টার মধ্যে কাজের ডেলিভারি দিতে বলেন। ঐ কর্মকর্তা ভুলে যান যে ঐ নারীর রাতের ঘুম আছে, এবং পরের দিন ৯ টায় অফিসের কাজ শুরু করলে ১ ঘন্টায় সেই পরিমাণ কাজ শেষ করা সম্ভব কিনা! তার উপরে সকলের বাসার নেট সার্ভিস অফিসের মতো অত শক্তিশালী নাও হতে পারে। কারো কারো কাছে শুনেছি একঘন্টা খাবার সময় এবং যেহেতু বাড়িতে অফিস তো গোসলের সময়ও তারা দিতে কুন্ঠাবোধ করেন। তিনটা রিং হওয়ার মধ্যে ফোন না তুললে ওপাশ থেকে প্রশ্ন আসে, ‘কী করছিলেন’?

আর বেচারা নারী, পরিবারের লোক তো বাড়িতে অফিস করা দেখতে অভ্যস্ত নয়, তারা ভেবেই নেয়, যাক এই রুদ্ধ দিনগুলিতে গৃহকর্মীর অনুপস্থিতি এবার পূরণ হয়ে গেল। একজন নারী যখন স্বাভাবিক সময় অফিস করে তখন তার পোষাক, মনোভাব কাজের লক্ষ্য থাকে পুরো পেশাধারী, সে সময় মিলিয়ে কাজের লক্ষ্য পূরণ করে। দুপুরের খাবার ও চা বিরতি নিয়ে একজন নারী মোটামুটি ছয় ঘন্টা টানা কাজ করেন। তখন বাড়িতে তার হয়ে গৃহস্থালীর কাজগুলিতে কেউ কেউ সাহায্য করে থাকে। বাড়ির লোকও অভ্যস্ত যে সে অফিসে আছে, তাই তার কাছে সন্ধ্যার আগে তেমন প্রত্যাশা থাকে না। কিন্তু এখন নারীদের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। বাচ্চার স্কুল নেই, বরের বা ঘরের অন্যান্যদের অফিস নেই, বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা ঘরবন্দি। সাহায্যকারী গৃহকর্মী নেই। মাথার উপর খড়্গ নিয়ে নারী কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে যুদ্ধ।

গৃহস্থালীর সকল কাজ, সন্তান স্বামী ও অন্যান্য পরিবারের সদস্যদের আবদার মেটানো, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা এবং নিজের চাকুরীটি টিকিয়ে রাখার জন্য হামাগুড়ি দিয়ে কাজ করে যায় নারী। যেহেতু সে ঘরেই আছে তাই কেউ তাকে প্রয়োজন মিটানোর জায়গা থেকে ছাড় দেয় না। আর গৃহস্থালীর কাজে যদি দু/এক ঘন্টা ব্যয় করে ফেলে, তবে তা পুষিয়ে দেয়ার জন্য নারী রাত জেগে কাজ করে অফিসের বসের আনুকল্য পাবার জন্য। সুতরাং সারাদিন সংসারের পরিশ্রম, রাতে ঘুমহীন, পরিবার এবং অফিসের বসকে খুশি না করতে পারার হতাশা-বেদনা, আর পৃথিবীর এই গ্রহণকালে অনিশ্চিত ভবিষ্যত ভেবে নারী দিশাহারা। তার হোম অফিস তাকে যমের অফিসের দোড় গোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে।

ব্যতিক্রমী গল্পও কিছু আছে যেমন কারো কারো কাছে হোম অফিস মানে দেরী করে ঘুম থেকে উঠা, ইচ্ছে মাফিক কাজ করা, ফোন বন্ধ করে রাখা ইত্যাদি তবে তা সংখ্যায় খুবই অপ্রতুল।

মহামান্য বসদের একটু বলে রাখতে চাই। কাজ দেয়া আর কাজ নেয়াই কিন্তু সুপারভাইজারি রোল নয়। সহকর্মীর সক্ষমতা উপর নির্ভর করে, বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে, নারীর কাজের পরিমাণকে বিবেচনায় এনে “ওয়ার্ক ফ্রম হোম” কার্যক্রম পরিচালনা করুন। মনে রাখুন, আপনার জুনিয়র সহকর্মী কিন্তু ইচ্ছে করে বাড়িতে বসে অফিস করছেন না। পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করছে। বাড়িতে কাজ করছে বলেই ভাবার কোনো কারণ নেই যে সে ফাঁকিবাজি করছে। ঘুমিয়ে আছে। মানুষ ঘোড়া নয়, মেশিনও নয়। সহকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখাও একজন সুপারভাইজারের নৈতিক দায়িত্ব।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.