তরুণদের করোনা ভাইরাসে মারা যাবার রহস্য কী?

জেবুন্নেছা জোৎস্না:

এটি সত্য যে কোভিড -১৯ প্রবীণ ব্যক্তিদের ছাড়াও যাদের হৃদরোগ, ফুসফুস রোগ এবং ডায়াবেটিস আছে তাদের জন্য খুব মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনে। কিন্তু এখন কোনো রোগ ছাড়াই অসংখ্য সুস্থ তরুণ বয়সীদের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়াটা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এটা এখন স্পষ্ট যে, কোভিট -১৯ কেবলমাত্র বৃদ্ধদের আক্রান্ত করে না, বরং এটি সকলকেই আক্রান্ত করে, যদিও অল্প বয়সীদের মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। ডা. অ্যান্টনি ফাউচি’র ভাষায়, এটি এখন একটি অস্বাভাবিক প্যাটার্নে দেখা যাচ্ছে, এবং তিনি করোনা ভাইরাসকে একটি “অস্বাভাবিক রোগ” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

বিবিসি জানিয়েছে, ব্রাজিলের একজন ১৫ বছর বয়সী আদিবাসী কিশোর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। গবেষকরা বলছেন, এই ঘটনায় আশংকা করা হচ্ছে যে কোভিড-১৯ ওই আদিবাসী কমিউনিটির মধ্যে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বেন লুডার এবং ব্র্যান্ডি, তারা কেবল স্বামী এবং স্ত্রী ছিল না, সেরা বন্ধুও ছিলেন। দুজনেই একই ডিস্ট্রিক্ট স্কুল কাজ করতেন এবং প্রতিদিন একই সাথে ড্রাইভ করে কাজে যেতেন। ৩০ বছর বয়সী বেন লুডার যখন অসুস্থ বোধ শুরু করলেন, তখন তিনি অতোটা সিরিয়াস হননি, কারণ কিছুদিন আগে, তার স্ত্রী ব্র্যান্ডি’র করোনা ভাইরাস যখন পজিটিভ হলো, তেমন কিছু হয়নি। তার সামান্য জ্বর, কিছুটা কনজেশন ছিল। তারপরও তিনি যখন অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেছিলেন তখনও তিনি এতোটা চিন্তিত ছিলেন না, কারণ তারা উভয়ই তরুণ এবং সুস্থ ছিলেন। তবে বেনের পক্ষে তবে তাঁর লক্ষণগুলি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তার শ্বাসকষ্ট বেশি ছিল এবং মার্চের শেষ শুক্রবারে তিনি ব্র্যান্ডিকে বলেছিলেন যে তার ইমার্জেন্সিতে যাবার প্রয়োজন। ব্র্যান্ডি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে বেন’কে অক্সিজেন এবং টায়ানল দিয়ে একই সন্ধ্যায় বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

পরের রোববার তিনি সুস্থ হয়ে বিছানা থেকে উঠে প্রথমবারের মতো রাতের খাবার খান। ব্র্যান্ডি বলেছিলেন যে, রোববার তিনি আমাদের সাথে কথা বলছিলেন, এবং ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল বেন সুস্থ হয়ে উঠছে। কিন্তু সেই রাতেই আবার তার লক্ষণগুলি ফিরে এলো। বেন ঘামাচ্ছিল এবং শ্বাস নিতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। ব্র্যান্ডি তাকে ইমার্জেন্সিতে যেতে হবে কিনা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এবং বেন উত্তর দিয়েছিলেন যে তিনি লড়াই করছেন, এখনও নিশ্চিত নন। রাতে ব্র্যান্ডি কাউচের ওপর ঘুমিয়েছিলেন আর বেন বিছানায়; গভীর রাতেও ব্র্যান্ডি খোঁজ নিয়েছেন বেনের; কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্র্যান্ডি দেখেন যে বেন আর শ্বাস নিচ্ছেন না। ব্র্যান্ডি’র জন্য এ এক অসীম রহস্য, কীভাবে একজন ত্রিশ বছরের স্বাস্থ্যবান যুবক কোন রকম পূর্ব অসুস্থতা ছাড়াই চলে গেলেন!

তো, এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?

বিজ্ঞানীরা এবং গবেষকরা ভাবছেন যে হয়তো এর উত্তর আমাদের জিনে থাকতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা সিভিয়ার লক্ষণযুক্ত করোনা রোগে মৃতদের সাথে মৃদু সিম্পটম পাওয়া লোকদের মধ্যে কী কী পার্থক্য রয়েছে তা বোঝার চেষ্টা শুরু করেন।

সাইন্স ম্যাগাজিনের একটি আর্টিকেলে, “করোনা ভাইরাস আপনাকে কতোটা অসুস্থ করবে? উত্তরটি আপনার জিনে থাকতে পারে”, উল্লেখ আছে ‘ACE2’ জীন ভেরিয়েশনের একটা সম্ভাবনার কথা; অনান্য জীনের মতোই ACE2 জীন হলো এনজাইম যেটা ফুসফুসের এবং হার্টের বাইরের স্তরের সাথে সংযুক্ত থাকে। সায়েন্স ম্যাগাজিনের নিবন্ধটিতে জাতীয় অ্যালার্জি এবং সংক্রামক রোগের ইমিউনোলজিস্ট ড. ফিলিপ মারফি বলেছেন যে, “এসিই 2 জিনের পরিবর্তনের ফলে রিসেপ্টর বদলে যাওয়ায় ভাইরাসটির জন্য ফুসফুসের কোষে প্রবেশ করা কখনও সহজতর, আবার কখনও বা শক্ত হয়ে উঠতে পারে”।

সার্ফ্যাক্ট্যান্ট (surfactant), আমাদের শরীরের একটি উপাদান যা ফুসফুসকে ভালভাবে প্রসারিত এবং সংকোচন করতে সাহায্য করে; ফুসফুসকে যদি স্পঞ্জ হিসাবে মনে করা হয়, তবে সার্ফ্যাক্ট্যান্ট হলো ডিটারজেন্ট, যা ফুসফুসকে নরম এবং নমনীয় করে তুলে। সার্ফ্যাক্ট্যান্ট ব্যতীত ফুসফুস শক্ত হয়ে যায় এবং এটি স্কুইজ করতে কঠিন হয়ে পড়ে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সার্ফ্যাক্ট্যান্টের ক্ষয় হয়, হয়তো এ কারণেই কিছু রোগী শ্বাসযন্ত্রের যন্ত্র দ্বারা শ্বাস নিতেও সমস্যা বোধ করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম কীভাবে ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইমিউন সিস্টেম ভালো থাকলে অল্প বয়স্ক এবং স্বাস্থ্যকর লোকেরা করোনার বিরুদ্ধে খুব শক্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তাদের ফুসফুস এবং অন্যান্য অঙ্গগুলিকে রক্ষা করতে পারে, যা একজন দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের তরুণ অথবা বৃদ্ধ দ্বারা সম্ভব নয়। সম্ভবত এটিই হলো কারণ যে কিছু অল্প বয়স্ক স্বাস্থ্যবান মানুষ, তারা ভেবেছিল যে তারা এই রোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়, আর তাই তারা কোয়ারেন্টাইনসহ অনান্য সর্তকতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ অনান্য শারীরিক পরিশ্রম থেকে বিরত ছিলেন, এবং ফলস্বরূপ পরিবেশ থেকে সহজেই এই ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন।

ভাইরাসটির অন্তর্নিহিত প্যাথলজিটি আরও ভালভাবে বুঝতে এখনও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তখন হয়তো এটি প্রমাণিত হবে যে বয়স নয়, রোগী ভেদে করোনা আক্রমণের তীব্রতার হেরফের হতে পারে। কারণ আমেরিকান তরুণদের একটা বড় অংশ ডায়াবেটিকসসহ অতিরিক্ত ওজনজনিত সমস্যায় ভুগছে। তাই আপনার বয়স যাই হোক, যদি সামান্য লক্ষণও দেখা যায় এই মুহূর্তে, তবে বাসায় থাকুন, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন, আর অবশ্যই শ্বাসকষ্ট হলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.