হাতে হাত নয়, সময় এখন মনে মন রাখার

কৃষ্ণা দাশ:

এসময়টায় আমরা সবাই অনেকটা বন্দী হয়ে আছি। সময়ের চাহিদার দরুন, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ বিশেষ একটা বের হচ্ছি না। প্রতিটা ভোরের সাথে একটা করে নতুন দিন ঠিক আসে, আসে না আর নতুন কোন খবর। বন্দীত্ব আমাদের সব কিছু ঘিরে, না পারছি নতুন কিছু ভাবতে, নতুন কিছু করতে, এমনকি নতুন স্বপ্নও আর আসে না।

মৃত্যু এসে আজ প্রতিটি ঘরের দরজায় সরবে ধাক্কা মারছে, খুললেই অবধারিত মৃত্যু। কে কবে ভেবেছিল, এতো ব্যস্ততা! যেখানে হয়তো ছয় মাসের দুধের শিশুকে রেখে মাকে যেতে হয় তার কর্মস্থলে, হয়তো সকাল কিংবা রাত ছাড়া দেখা যায় না বাবার মুখ, যেখানে ব্যস্ততাই কারণ হয়ে যায় সম্পর্ক ভাঙ্গার, একাকিত্বের আর হতাশার কারন ওই ব্যস্ততা, কেউ’বা নেশাগ্রস্ত সন্তানকে ব্যস্ততার দরুণ এতোটুকু সময় দিতে পারেন না। দেখার কোন লোক নেই বলে বাবা – মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে হয়, এমন হাজারটা সমস্যা কারণ শুধুমাত্র ব্যস্ততা। ছুটতে হবে! প্রতিটা মুহূর্ত কেবল ছুটে চলা, এতটুকু সময় নেই কারো জন্য। অথচ আজ সব স্থবির। থমকে গেছে সময়ের গাড়ি, যেন চলতেই ভুলে গেছে৷ আজ সবার হাতে এতো এতো সময় কিন্তু কিছু করার আকাঙ্খাটা কোথায় যেন আটকে আছে।

সবার মনে একটাই প্রশ্ন, কতদিন আর কতদিন এই বন্দীত্ব?

এরপরও আমরা মানুষ, প্রচণ্ড আত্মশক্তিতে ভরপুর। অমানিশিতেও আলোক ছটাটা ঠিক খুঁজে নেয়। প্রতিটা সকাল আমরা একরাশ আশায় চোখ মেলে নিউজফিডটা দেখি, এই বুঝি জানবো, সব ঠিক হয়ে গেছে, সব সব, আর আতঙ্কিত হতে হবে না। সবাই আমরা আবার মুক্ত, আবার স্বাধীন৷

গোটা পৃথিবী জুড়ে এই অস্থিরতা আর আতঙ্ক, তবুও আমাদের বাঁচতে হবে। বাঁচতে হবে সবাইকে নিয়ে। আশার আলো যতই ক্ষীণ হকো না কেন, আশাহত হলে চলবে কেন?! বরং ভাবতে হবে ব্যস্ততার দরুন আমাদের জীবনে যে সমস্ত সমস্যাগুলো ছিলো, তা সযতনে মিটিয়ে দেয়ার এই তো সময়। ব্যস্ততার ফলে যেখানে পারিবারিক হৃদ্যতা কমেছে, তা মেটানোর উপযুক্ত সময়ই তো এখন’ই। আজ, এখুনি না হলে তো, হয়তো আর কোনদিনও সম্ভব হবে না।

ভাইরাসের এই কারণে প্রতিটা মানুষের মন’ই আজ বিক্ষিপ্ত, হতাশ, আগামী দিন বেঁচে থাকবো কিনা সেই চ্যালেন্জটা নিয়েই রাত্রি যাপন। কিন্তু এই বিক্ষিপ্ততা নিয়ে আর কতদিন? যেহেতু বেঁচে আছি, মানব মনের অদম্য ইচ্ছা শক্তির প্রয়োগ করেই বাঁচার মতো বাঁচতে হবে। চারিপাশের এতো এতো খারাপ কিছুর মধ্যেও ভাল টা খুঁজে নিতে হবে। মনে করুন, এই সময় চারদেয়ালকে আবার ঘরে পরিণত করে নেয়ার। এসময়ে খুব করে বুঝতে চেষ্টা করা যায় পাশের জনকে। সন্তানদের দিকে একটু নজর দিয়ে দেখুন, ওদের মনের কোথাও জমাট মেঘ নেই তো?! কিংবা বুঝতে চেষ্টা করুন পরিবারের কার, কিসে ভাল বা মন্দ লাগে। বিশেষ করে সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিন, হয়তো আমরা বেশিরভাগ সময় বাবা-মা হিসেবেই ওদের বুঝতে চেষ্টা করি, এবার বন্ধুর মতোও না হয় কিছুটা সময় কাটায়। সম্পর্কগুলো আবার নতুন করে সাজানোর এই তো সময়।

পাশাপাশি নিজেকে ভাল রাখুন। নিজেকে সময় দিন। ঘরের সদর দরজায় তালা ঝুলালেও মনের দরজা-জানালা খোলা রাখুন। আলো-বাতাস আসতে দিন। নিজেকে নিয়ে বসবার এটাই উপযুক্ত সময়।

প্রতিটি মানুষের মধ্যে সুপ্ত কিছু প্রতিভা লুক্কায়িত থাকে, কোনদিন হয়তো সময় করে বসা হয়নি! সেই সুপ্ত প্রতিভাদের বাইরের আলো-বাতাস লাগানোর সুযোগ করে দিন। মোট কথা, যেখানে যেভাবেই থাকি না কেন, মন খারাপ করে রাখা যাবে না। কারণ আরও অনেক, অনেক দিন বাঁচতে হবে। স্বপ্নপূরণ বাকি আছে আরও অনেক৷ বেঁচে থেকে দেখে যেতে হবে, এই মহামারীর শেষ কোথায়? জানতে হবে, জানাতে হবে, দেখতে হবে আর দেখাতেও হবে কিভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হয়!

শেয়ার করুন:
  • 587
  •  
  •  
  •  
  •  
    587
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.