কিছু প্রশ্নের উত্তর যখন মেলে না …

আয়েশা অণু:

বহুকাল আগে যখন নামাজ পড়তাম, বিশেষত্বহীন রাতগুলোতে তিনটা পর্যন্ত বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকতে পারলেও শবেবরাতের রাত এলে বারোটা-সাড়ে বারোটা পার হওয়ার আগেই মনে হতো যেন আমি অনন্তকাল ঘুমাইনা, যেন এই রাত আর কোনোদিন শেষ হবে না। কে যেন বলেছিল, হাজার বছরের দীর্ঘ সে রাত! জহির রায়হান নাকি? ভুলে গেছি। বুঝলাম এই ঘুম আসলে মোটিভেশনের অভাব।

এর পরের বছরগুলোতে মাজারে মাজারে ঘুরলাম। এমনিও ঘুরতাম, এমন ফজিলতপূর্ণ (!) রাতে তো ঘোরার মোটিভেশন আরো বেড়ে যেত। আমার কেবলই মনে হত ফজিলত সত্যিই থাকুক বা না থাকুক, এত মানুষের হাত যখন একসাথে ওঠে আকাশের দিকে, রাতের অন্ধকারে আকাশের কোনো এক নির্জন নক্ষত্রের বাগানে হঠাৎ জ্বলে তো উঠতেও পারে কোনো নীল স্ফুলিঙ্গ। পৃথিবীতে তো অনেক মিরাকল হয়, কত মানুষ তো মিরাকলের অপেক্ষায় বেঁচে থাকে জনম জনম। কোথাও তো কিছু থাকতেও পারে ব্যাখ্যার অতীত।

তো এভাবে ঘুরতে ঘুরতে মাজারে ঘোরার একটা দল তৈরি হলো আমার। অফিস থেকে বের হয়েই কোনো না কোনো মাজারের দিকে চলে যাই। মরমী সাধক ডঃ হাসান রাজা ভাইকেও দেখতাম মাঝে মাঝে ওদিকে। ভাই বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দেননি আমাকে কোনোদিন। শুধু বলতেন, ধুর আপা, আপনি পড়াশোনা করেননা কিছু না, খালি প্রশ্ন করেন। তাকে কখনো বলাই হয়নি যে এই বিষয়ে পড়াশোনার মোটিভেশন পাচ্ছিনা, মোটিভেশনের জন্যই তো প্রশ্ন করি, ঘুরি।

তো এক শবে বরাতের রাতে আমার দলের সাথে শাহ্ মখদুমের দরবারে গেলাম, আশেপাশে আরো কিছু আওলিয়ার খানকাহ্। রাজশাহীতে থাকা অবস্থায় আমার পোষাক-পরিচ্ছদ মাজারে যাওয়ার পক্ষে বিরাট সহায়ক ছিল। মানে শুধু মাথায় একটা ঘোমটা টেনে দিলেই পার্ফেক্ট ফকিরনি লুক চলে আসত, বলাবাহুল্য আমার চেহারাও খুব ফেভার করেছে। এর অকাট্য প্রমাণ পেলাম সে রাতে যখন বাড়ি ফেরার পর দেখলাম আমার কাছে মোট ৯ প্যাকেট বিরিয়ানি। মানে এক মাজারে গিয়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়েছি জিয়ারতের জন্য, এক লোক এসে সবার হাতে পোলাও এর পোটলা দিয়ে চলে গেল। পরে বুঝলাম সেটা শিরনির লাইন ছিল। পোলাও এর পোটলা হাতে নিয়ে ঘোরার কী আছে, ভেবে ওটা ব্যাগে ঢুকিয়ে জিয়ারত শেষে পাশেই আরেক মাজারে গেলাম। অনেক ভিড়, পেছনের মানুষের ধাক্কায় যে ঘরে পৌঁছে গেলাম সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিরিয়ানির উচ্ছিষ্ট। দরজা দিয়ে বের হওয়া আমার সাধ্যের বাইরে, এতো মানুষ ঢুকছে। ভাবলাম এক কোনায় বসি, দরজা ফাঁকা হলে বের হবো। কিন্তু তার আগেই একজন আমার সামনে প্লাস্টিকের লাল থালায় বিরিয়ানি আর লাল গ্লাসে পানি দিয়ে চলে গেল। গ্লাসটাও প্লাস্টিকের। বাজারে এখনও প্লাস্টিকের গ্লাস পাওয়া যায় কে জানতো! মনে পড়ল বাসায় খাবার চাইতে আসা বহু ভিক্ষুককে আমি এই থালায় খাবার নিতে দেখেছি। এদিক-ওদিক তাকিয়ে খেয়ে ফেললাম। ওখানে জিয়ারত সেরে ফেরার পথে দেখি এক স্কুল ঘরে টুল-টেবিলে খাবার সার্ভ হচ্ছে। এলাকার ফান্ডে অথবা কারো ব্যক্তিগত মানতের খাওয়া মনে হলো। আমার সঙ্গিরা ওদিকে যাচ্ছে কেন জিজ্ঞাসা করতেই জানলাম তারা আবার বিরিয়ানি খেতে চায়।

বললাম, আমার পেট ভরা। উনি বললেন আগের বিরিয়ানিটাতে মাংস কম ছিল, এটাতে বেশি, চালটাও চিকন। চল খাই। আবার খেলাম। পরের মাজারে জিয়ারতের লাইনে পেছনে ফিরে দেখি আমার দলের লোক কমে গেছে, কিছু বুঝলাম না। বের হয়ে দেখি হাতে অনেকগুলো বিরিয়ানির পলিথিন নিয়ে ওরা দাঁড়িয়ে আছে। পাশের এতিমখানা থেকে নিয়ে এসেছে।

আমার ভাগে পড়লো চার প্যাকেট। বললাম, নেবো না আর। ব্যাগে তো অনেক কয়টা আছে। উনি বললেন, আরে নাও, এটা বেস্ট, খাসির বিরিয়ানি। জিজ্ঞাসা করলাম, কিভাবে বুঝলেন বেস্ট? জবাব এলো, আমরা একপ্লেট করে খেয়ে নিয়েছি।

পরের মাজারে শিরনি ছিল পায়েস৷ খড়ির চুলায় টগবগ করে শিরনি ফুটছিল। দাঁড়িয়ে রান্না দেখছিলাম, ওরা বোধহয় ভেবেছে ক্ষুধায় ওদিকে তাকিয়ে আছি। ডেগচি থেকে এক ডাবু পায়েশ প্লাস্টিকের থালায় ঢেলে আমার দিকে এগিয়ে দিল একজন।

পেটে আর জায়গা ছিলনা, ব্যাগও ফুলে উঠেছে ততক্ষণে। বাসায় ফিরে এলাম। খাবারগুলো ফ্রিজে রেখে পরবর্তী কয়েকদিন ধরে একাই খেলাম। বিরিয়ানির উৎস বাসায় প্রকাশ করাটা আত্মঘাতি হতে পারে ভেবে চেপে গেলাম।

গত মাসে চট্টগ্রামে বায়োজিদ বোস্তামির দরবারে ঢুকলাম। মাগরিবের আবছা সন্ধ্যা। সাথে নিয়েছি কিছু আতর, মোমবাতি, আগরবাতি, গোলাপ জল আর কচ্ছপের জন্য এক ঠোঙ্গা খাবার। কচ্ছপগুলোর পেট ভরা, ওরা খেলো না কিছু।

ভেতরে ঢুকে দেখি বোস্তামির পায়ের কাছে জ্বলছে সারি সারি মোমবাতি, অজস্র আগরবাতি ধোঁয়া হয়ে উড়ে যাচ্ছে আকাশে। অন্ধকারে মোমের আলোয় সৃষ্টি হয়েছে আলো-আঁধারি। আগরবাতির টেবিলের পায়ার সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা ক্ষুদ্র একটি কালো রঙের ছাগল শাবক। আশেপাশে কেউ নেই। হবে কারো মানতের দান। বাচ্চা ছাগলটা অচেনা পরিবেশে অন্ধকারে এতো আগুন, এতো ধোঁয়া দেখে ভয় পেয়ে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। এখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায় পাশেই এক নামহীন বৃক্ষ। তার সারা শরীর ঢেকে আছে মানুষের প্রার্থনা আর মানতের রঙ্গিন সুতোয়।

বিশ্বসংসারের হিসেব আমি কোনোদিনই বুঝে উঠতে পারিনি, তবুও আরো একবার চেষ্টা করলাম হিসেব মেলানোর। কেউ একজন এসেছিল বোস্তামির করুণা ভিক্ষায়, সুতা বেঁধেছিল গাছের শরীরে। ভিক্ষা হয়তো মিলেছে, হয়তো প্রার্থনা পূরণ হয়েছে, মিরাকল হয়তো ঘটেছে কোনো আকাশ প্রদীপের গায়ে। বিনিময়ে সে উৎসর্গ করেছে এই ছাগল শিশুর প্রাণ! ভিক্ষুক তো ভিক্ষা পেয়েছে, বোস্তামিও পেয়েছে স্তব, নিঃসংশয় স্তাবক আর বন্দনা, পেয়েছে মহত্বের দরজা। কিন্তু ছাগল শিশুটি কী পেল? তার পৃথিবীতে এসে কী লাভ হলো? সে যা দিয়ে গেল সংসারে, তার বিনিময় কোথায়? পৃথিবীতে ওর অংশের মিরাকল কোথায়?

অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে, ঝিঁঝিঁর ডাক হয়েছে তীব্রতর। কখনো কখনো অন্ধকার জিনিসটাও ভালো, অন্ধকারে অনেক কিছু আড়াল করা যায়, মুছে ফেলা যায়। হাতে থাকা কচ্ছপের খাবারের ঠোঙ্গাটা খুললাম। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল টুকরো করা পাউরুটি, কয়েকটি কলা। ছাগল শিশুটিকে ওগুলো খেতে দিয়ে আমি বেরিয়ে গেলাম। বোস্তামির কাছে রেখে গেলাম আমার প্রশ্ন। হয়তো কোনো এক মিরাকলে মিলে যাবে আমার প্রশ্নের উত্তর।

শেয়ার করুন:
  • 462
  •  
  •  
  •  
  •  
    462
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.