লকডাউন: কিন্তু কতদিন? পরবর্তী প্রস্তুতি নিচ্ছেন তো?

নাসরীন রহমান:

কোভিড ১৯ এর কারণে কার্যত গোটা বিশ্বই আজ অবরুদ্ধ! এই মহামারী থেকে বাঁচতে এবং এর সংক্রমণ কমিয়ে আনতে হোম কোয়ারান্টাইন এবং স্যোশাল ডিস্টান্সকে একমাত্র কার্যকর পন্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশে দেশে। মূলত এই ভাইরাসকে ঠেকানোর ক্ষেত্রে পুরো বিশ্ব যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটি নজিরবিহীন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এর শেষ কোথায়? মানুষ কবে নাগাদ আবার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে? আজীবন তো চলতে পারে না এভাবে।
ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া!

অনেকেই ভাবছেন লকডাউন আর কতদিন চলবে? এভাবে ঘরে বসে বসে কি জীবন চলে?

বাংলাদেশেও ১৪ তারিখ পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে; কিন্তু ঘুরে ফিরে সবার মনেই একটা প্রশ্ন, এই ছুটি বাড়ানো হবে কি?

ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত যদিও নীতিনির্ধারকেরা পরিস্থিতির উপর বিবেচনা করে নিবেন, তবুও সাধারণ সেন্স থেকেই বলা যায়, ছুটিটা বাড়তে যাচ্ছে। বিশ্বের সবদেশেই বাড়ানো হয়েছে, কাজেই বাংলাদেশে না বাড়ানোর কোনো কারণই নেই।

আমরা বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে যদি লক্ষ্য করি, দেখবো চীন ডিসেম্বর থেকে প্রায় এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্ত ছিলো করোনা সংক্রমণ নিয়ে। আমেরিকা, ফ্রান্স, ইতালির অবস্থা ভয়াবহ; প্রতিদিন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে সেসব দেশে। ভারতে মার্চে করোনা আক্রান্তের খবর আসে পত্রিকায়, এবং যা বর্তমানে চলমান, এবং বাড়ছে প্রতিদিন। বাংলাদেশেও গত ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে আজ এক মাসে আক্রান্তের হার শতকরা ৭২ ভাগ। মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

সার্বিক বিবেচনায় অনুমান করা যায় বাংলাদেশেও কোভিড ১৯ ভুগাবে!
অন্তত করোনা ভাইরাসটি যে রাতারাতি এদেশ থেকে উধাও হয়ে যাবে, এমনটি ভাবার যৌক্তিকতা নেই। আক্রান্তের ধরন, সংখ্যা সেটা অন্য হিসাব।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে যদি সাধারণ ছুটি বাড়ানো হয় তবে কীভাবে চলবে অর্থনীতির চাকা?

এটা পরিষ্কার যে যেভাবে সারা বিশ্বে বড় বড় শহর লকডাউন করা হচ্ছে এবং মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরার উপর বিধি আরোপ করা হচ্ছে, সেটি দীর্ঘমেয়াদি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এভাবে সবকিছু বন্ধ থাকলে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব হবে মারাত্মক।

এ প্রসঙ্গে অঅর্থনীতিবিদ অভিজিৎকে প্রশ্ন করেছিলেন অর্থনীতিবিদ এস্থার। কী জবাব দিয়েছিলেন তিনি? আসুন দেখি, জীবন না জীবিকা?

“ক্ষমতার আসনে থাকলে কী সিদ্ধান্ত নিতাম বলা মুশকিল, কারণ তাতে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে কিছু লোককে মারা যেতে দিতে হবে। সব বন্ধ করতে কিছু বিলম্ব করলে বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। আবার অন্যদিকে, লোকের উপর বাড়িতে বসা থাকার, সব কিছু বন্ধ রাখার জন্য চাপ তৈরি করলে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। কারণ পাঁচ মাস সবকিছু বন্ধ থাকলে লোকে মনে করবে, নীতি তৈরির কোনও কেন্দ্রই আর কাজ করছে না। একদিকে মানুষের প্রাণ বাঁচানো, আর অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার বিপুল প্রশাসনিক ব্যয় ও অর্থনীতির প্রবল ক্ষতি, এই দুটোর কোনও একটার দিকে পাল্লা ভারী হবে। প্রাণ বাঁচানোর কাজে একটু খারাপ করলে অর্থনীতিকে বাঁচানোর কাজটা হয়তো একটু সহজ হতে পারে …” আমি জানি না। বলছি না যে বেছে নেওয়া সহজ কাজ হবে।”

এটা ঠিক যে মানুষ দীর্ঘমেয়াদে লকডাউন মেনে নিবে না! মানুষ ইতিমধ্যেই হাঁপিয়ে উঠতে শুরু করেছে। ঘরে বসে থাকা যে কী কঠিন তা এরই মধ্যে মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। ঘরে ঘরে পারিবারিক নির্যাতন বাড়ছে, নানা অনিয়ম, অপরাধ ঘটছে।
এবং তা সবই গৃহবন্দী জীবনে উদ্ভুত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঁচ মাস! অসম্ভব! দু সপ্তাহ, চার সপ্তাহ।
এর বেশি কিছুতেই মেনে নিবে না মানুষ! এমনকি ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিলেও মানবে না।
অর্থনৈতিক ক্ষতির ব্যাপারটি মাথায় রেখে হলেও একসময় বাধ্য হয়েই লকডাউন তুলে নিতে হবে।

অর্থনৈতিক মন্দা: পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছেন তো?

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না উদ্ভুত লকডাউন পরিস্থিতিতে বিশ্ব এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। এমনকি করোনার সংক্রমণ বিস্তারের আগে থেকেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল; করোনার কারণে সেই মন্দার গতি আরও তরান্বিত হলো।

করোনা ভাইরাস বাংলাদেশের দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তিক্ত করে তুলবে নিঃসন্দেহে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ব্যবসা, বাণিজ্য, অফিস, আদালত কার্যত প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই বন্ধ। রপ্তানি বাণিজ্য, রেমিট্যান্স সব বন্ধ থাকার কারণে বাংলাদেশকে এক অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
দোকানপাট বন্ধ থাকায় গড়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা লস গুনতে হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের। আছে বেসরকারি বা বিভিন্ন কর্পোরেট অফিসের কর্মীদের চাকরি হারানোর অনিশ্চয়তা! সবমিলিয়ে এক অরাজকতা সবক্ষেত্রে! এর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে যাচ্ছে মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ব্যবসা বাণিজ্যে আর্থিক ক্ষতির কারণেই অনেকে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।
অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের বেতন প্রদানের ব্যাপারে অব্যবস্থাপনার ঝুঁকিতে পড়বেন এবং তার প্রভাব পড়বে সাধারণের জীবনে।

বেকারত্বের আশংকা করছেন অনেকেই! এটা শুধু বাংলাদেশেই না, উন্নত বিশ্বেও এরই মধ্যে চাকরি ছাঁটাই শুরু হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) একটি নতুন মূল্যায়ন অনুযায়ী কোভিড -১৯ মহামারী দ্বারা সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও শ্রম সংকট বিশ্বব্যাপী বেকারত্বকে প্রায় ২৫ মিলিয়ন বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশ্বব্যাংকের পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিকের প্রধান আদিত্য মাত্তু বলেছেন, ‘এই মহামারীর কারণে থমকে যেতে পারে উন্নতি এবং এই অঞ্চলে বাড়তে পারে দরিদ্র লোকের সংখ্যা।’

তবে প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, “যদি আমরা একটি আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত নীতিগত প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই, যেমনটি ২০০৮/০৯-এর বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটে ঘটেছিল, তবে বৈশ্বিক বেকারত্বের প্রভাব কমবে উল্লেখযোগ্যভাবে”।

বিভিন্ন প্রতিবেদন, বিশেষজ্ঞদের মতামত আমলে নিলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় অর্থনৈতিক এই ধাক্কা কমবেশি সকলকে সামলাতে হবে। দরিদ্র আরও দরিদ্র হবে; মধ্যবিত্তের অবস্থা হবে অনেক ক্ষেত্রেই করুণ!

শেয়ার করুন:
  • 141
  •  
  •  
  •  
  •  
    141
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.