করোনার প্রতিষেধক হিসেবে হাইড্রোক্সাই-ক্লোরোকুইন কতটা নির্ভরযোগ্য?

জেবুন্নেছা জোৎস্না:

নিউইর্য়কের বাতাস আর রাস্তায় এখন এ্যাম্বুলেন্সের আর্তচিৎকার আর ছোটাছুটি। ছোট-বড় যাকে একটু দুর্বল পাচ্ছে তার জন্যই করোনা ভাইরাস এখন প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমদিকে এটি শুধু বয়োবৃদ্ধদের জন্য হুমকিস্বরূপ দেখা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে যে সংখ্যক তরুণ বয়সীদের মৃত্যু হয়েছে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে, তাতে করে একে আর বয়সসীমায় বাঁধা যাচ্ছে না।

এদিকে সুনির্দ্দিষ্টভাবে এখনও কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি এই ভাইরাসের। কিন্তু দেশে দেশে এ নিয়ে গবেষণা চলছে। আশা করা হচ্ছে অচিরেই একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে প্রতিষেধকের ব্যাপারে। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনা ভাইরাস নিরাময়ের জন্য হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন জরুরি প্রয়োজনে সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসাবে অনুমোদনের জন্য বার বার এফডিএকে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি স্বল্প প্রমাণের ভিত্তিতেই কোনরকম অনুমোদন ছাড়াই এই ওষুধটি এখন নিউইয়র্কসহ অনান্য স্টেটের করোনা রোগীদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে একটা নির্দ্দিষ্ট পরিমাণে, যা নিয়ে চিকিৎসক সমাজে তোলপাড় চলছে।

আজই দেখলাম যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওষুধটি রপ্তানির জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ওপর শুধু যে চাপ সৃষ্টি করেছেন তাই নয়, অন্যথায় ‘প্রতিশোধ’ নেয়া হবে বলেও হুমকি দিয়েছেন। তিনি এই ওষুধটিকে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন যে, এই মুহূর্তে তাঁরা রপ্তানিতে যেতে পারছেন না, কিন্তু প্রয়োজনে প্রতিবেশি দেশগুলোকে তাঁরা দেবেন। ভারতে এই হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন কাউন্টার থেকেই কেনা সম্ভব এবং মোটেও দামি কোনো ওষুধ নয়। তবে কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের ওপর এটির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার পর থেকে এর বিক্রয় এবং ব্যবহারের ওপর কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এমনকি গত শনিবার ‘কোনরকম ব্যতিক্রম ছাড়া’ এটি রপ্তানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত।

তো, মোটামুটি এই হলো মোদ্দা কথা। আর ঠিক এর পরপরই ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি।

হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনটা আসলে কী? এটি হলো ক্লোরোকুইনের মতোনই, যা ম্যালেরিয়া রোগের জন্য কেবল অনুমোদিত এবং বহুল প্রশংসিত।

করোনা মহামারির প্রাক্কালে এক সংবাদ সম্মেলনে মি. ট্রাম্প কোভিড -১৯ এর প্রতিরোধে ক্লোরোকুইন এবং হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের একত্র ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাই তৎক্ষণাৎ হোয়াইট হাউসের করোনা ভাইরাস টাস্ক ফোর্সের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান্টনি ফাউচি বলেন যে, “ওষুধগুলি করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে, তবে এটি যে নিরাপদ সেটা দেখার জন্য আরও ড্যাটা প্রয়োজন। তারা যেভাবে কাজ করতে পারে তার সাথে আমি একমত নই, তবে আমার কাজ হলো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করা”।

ড. অ্যান্টনি ফাউচি আরও বলেছেন যে ড্রাগগুলির কার্যকারিতার প্রমাণ এখনও অজানা; ওষুধের কার্যকারিতা কখনই ক্লিনিক্যালি পরীক্ষা করা হয়নি”। আর এই কারণে ট্রাম্প প্রথম থেকে দাবি করলেও মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন করোনা ভাইরাস চিকিৎসার জন্য ওষুধগুলিকে সে সময় অনুমোদন দেয়নি।

ট্রাম্প ওষুধের প্রশংসা করার কারণ হলো, ল্যাবগুলিতে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের তীব্র শ্বাসপ্রশ্বাসের সিন্ড্রোমের বিরুদ্ধে এটি কার্যকর হতে দেখা গেছে। ট্রাম্প তার এক টুইটে উল্লেখ করেছেন, “হাইড্রক্সাইক্লোরোকুইন এবং অজিথ্রোমাইসিন একসাথে নেওয়া, ওষুধের ইতিহাসে এক বৃহত্তম পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ রয়েছে”। ট্রাম্প তার আরও একটি টুইটে উল্লেখ করেন যে, “ক্লোরোকুইন কোভিড -19-এর সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। এটি ম্যালেরিয়া, লুপাস এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ছাড়াও সম্ভাব্য এন্টিভাইরাল হিসেবে গত কয়েক দশক ধরেই সমাদৃত। তবে এফডিএ করোনা ভাইরাস চিকিৎসার জন্য এখনও অনুমোদন দেয়নি”।

সিডিসির মতে, ‘কোভিড -১৯ রোগীদের মধ্যে ক্লোরোকুইন এবং হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন উভয়ই ভালভাবে কাজ করছে বলে জানা গেছে এবং এটি কাউকে মেরে ফেলবে না”। ক্লোরোকুইনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে খিঁচুনি, বমি বমি ভাব, বধিরতা, দৃষ্টি পরিবর্তন এবং নিম্ন রক্তচাপ অন্তর্ভুক্ত। এফডিএ এক বিবৃতিতে বলেছে যে ক্লোরোকুইন করোনা ভাইরাসের লক্ষণগুলি হ্রাস করতে পারে এবং ভাইরাসের হালকা থেকে মাঝারি ক্ষেত্রে আক্রান্তদের মধ্যে কোভিড -১৯ এর বিস্তার রোধ করতে পারে কিনা তা জানতে তারা সরকারি সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সাথে কাজ করে চলেছে।

জেবুন্নেছা জোৎস্না

এদিকে সিএনএনে প্রকাশিত, ব্যানার স্বাস্থ্যসেবার তথ্য অনুসারে ট্রাম্পের এ সংবাদ সম্মেলনের পর ২০শে মার্চ, অ্যারিজোনায় এক দম্পতি মাছের অ্যাকুরিয়ামে পরজীবীদের রোধের জন্য ব্যবহৃত ক্লোরোকুইন ফসফেট দিয়ে নিজেরা করোনার চিকিৎসা করাতে ষাট বছর বয়স্ক পুরুষটি মারা যায় এবং ওই নারীটি হসপিটালে চিকিৎসাধীন থাকে। এনবিসি নিউজ উক্ত নারীর সাথে কথা বলে এবং তিনি জানান যে তারা ট্রাম্পের সংবাদ কনফারেন্স থেকেই ক্লোরোকুইন এবং করোনা ভাইরাসের সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তারা অসুস্থ হবার ভয় থেকেই এটি গ্রহণ করেন। ব্যানারের পয়জন অ্যান্ড ড্রাগ ইনফরমেশন সেন্টারের মেডিকেল ডিরেক্টর ড. ড্যানিয়েল ব্রুকস এক বিবৃতিতে বলেছিলেন যে, আশেপাশে কোভিড -১৯ এর অনিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে আমরা বুঝতে পারি যে লোকেরা এই ভাইরাস প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য নতুন উপায় আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে, তবে স্ব-নির্ধারিত কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।”

স্বল্প পরীক্ষিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ হিসেবে ডা. অ্যান্টনি ফাউচি হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতার আহ্বান জানাবার পরও কিছু চিকিৎসক করোনা রোগীদের ওপর প্রয়োগ করাতে চিকিৎসক সমাজে এটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কেউ বলছেন, যদি সামান্য উপকারও হয় তো অনুমোদন ব্যতিরেকে এটির প্রয়োগে ক্ষতি কি? অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, এটি প্রয়োগেই বেড়েছে মৃত্যু হার।

অল্প বয়স্ক মানুষের ব্যাপক প্রাণহানীতে আতঁকে উঠছেন সবাই। কিছুই বলা যাচ্ছে না এখনও, করোনা ভাইরাসের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতো হবে হয়তো আরও কিছু সময়।

শেয়ার করুন:
  • 136
  •  
  •  
  •  
  •  
    136
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.