‘ওদের’কে না দেখলে আপনি ভালো থাকবেন তো?

রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা:

যদিও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিকভাবে কোনরূপ জাতিগত বা নাগরিক বৈষম্যের চর্চা করার কথা না, তথাপি চর্চা জগতে এই বৈষম্য ক্ষেত্রবিশেষে খুবই স্পষ্ট। আমার এই লেখাটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সেই সকল ‘অদৃশ্য’ ও ‘অস্পৃশ্য’ জনগোষ্ঠীর করোনা মহামারী জীবন বাস্তবতা নিয়ে রচিত।

গত পহেলা এপ্রিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “স্বাস্থ্যকর্মী ব্যতীত অন্য কেউই পিপিই পরলে তাকে এখন থেকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিব রোগীর সেবা করতে।” প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ বিষয়টি আমলে নেয়ায়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর থেকেই আমার মাথায় বেশ কিছু চিন্তা ঘুরঘুর করতে শুরু করে। প্রথম যে চিন্তাটি আমার মাথায় আসে সেটি হলো, শুধু তো ডাক্তার নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীই কেবল করোনা আক্রান্ত রোগীর কাছাকাছি যায় না, করোনা আক্রান্ত রোগীর রক্ত, মলমূত্র যে হাসপাতালের ক্লিনার, অথবা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের যে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিরন্তর আমাদের সুস্থতার জন্য পরিস্কার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন, আমরা কি তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেছি? কেনইবা তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে আমাদের চিন্তাজগতে অথবা আমাদের আলোচনায় সেটি গুরুত্ব পায় না?

এর একটি সরল ব্যাখ্যা হচ্ছে স্বাভাবিক সময়ে আমি বা আপনি যাদেরকে ‘ক্লিনার’, ‘মেথর’ বা ‘সুইপার’ বলে চিনি, তাদের পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য ন্যুনতম যে বিশেষ পোশাক, গ্লাভস, অথবা যে সকল জীবানুনাশক সামগ্রী সরবরাহ করতে হয়, প্রশাসন সে বিষয়ে বরাবরই উদাসীন। তাদের জীবনের ঝুঁকি বা নিরাপত্তা কখনও কোন সময় কোন বিবেচনায় আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয় না। তবে এই বিশেষ সময়ে গোষ্ঠীগত সংক্রমণ বা কমিউনিটি টান্সমিশন ঠেকাতে দেশের সকল পরিচ্ছন্নতা কর্মীর নিরাপদ স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা আমাদের সকলের জন্যই জরুরি।

এবার আসি দেশের যৌনশ্রমিকদের কথায়। প্রশাসনের নির্দেশক্রমে দৌলতদিয়া যৌনপল্লী লকডাউন করা হয়েছে, কিন্তু সেখানকার যৌন শ্রমিকরা কীভাবে জীবনযাপন করবে তা নিয়ে আমাদের কি কোনো পরিকল্পনা আছে? এছাড়াও আমাদের অনেক ভাসমান যৌনকর্মী রয়েছে, তাদের কথা কি বিবেচনায় এসেছে? একবারও আমরা ভাবছি যে নারী যৌন শ্রমিক তার শরীরকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জন করতো, তারা কিভাবে তারা কীভাবে তাদের জীবনযাপন করছে? প্রথম আলোর সূত্রে জানতে পারলাম, কোন একজন যৌন শ্রমিক অর্থ উপার্জনের জন্য রাস্তায় নামলে তাকে পুলিশ পিটিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে, বলতে পারেন সে অথবা তার পরিবার কীভাবে এই করোনা ক্রান্তিকালে তার পেটের ক্ষুধা নিবারণ করবে?

ঠিক একইভাবে অপরাপর যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলো রয়েছে তাদের দিকেই বা আমাদের মনোযোগ দেয়ার সময় কোথায়? এই যেমন ধরুন, হিজরাদের কথা বলি। রাস্তায় চলার পথে যারা আপনার আমার সাহায্য নিয়ে অথবা যৌনবৃত্তির মধ্য দিয়ে যারা তাদের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতো, সেই মানুষগুলোর জন্য কেন এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতার আশ্বাস শোনা যাচ্ছে না।

করোনা মহামারীর এই ক্রান্তিলগ্নে দেশের এই সকল নিপীড়িত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে এসে যদি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই মুহূর্তে না দাঁড়াতে পারে, তবে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে মনে এই দুর্যোগ মুহূর্তে এই মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কী?

বাংলাদেশের হিজড়াদের একটি বৃহৎ অংশ চলার পথে মানুষের কাছে অথবা বিভিন্ন দোকানে দোকানে গিয়ে সাহায্য চেয়ে তাদের জীবন চালায়, অথবা যৌনবৃত্তির মধ্য দিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে, সেক্ষেত্রে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি আদৌ কি সরকারি-বেসরকারি কোনো পর্যায়ের কারো মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে? যেহেতু আমার পিএইচডির কাজ বাংলাদেশের হিজড়াদের নিয়ে, বিভিন্ন পরিসরে বছর দু’য়েক মাঠ পর্যায়ে আমার হিজড়াদের সাথে নিবিড়ভাবে মেলামেশা করার সৌভাগ্য হয়েছে।
সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি যে হিজড়াগোষ্ঠীর অনেকেই বিদেশে বসবাসরত প্রবাসীদের সাথে অনলাইন প্রণয়, এবং অফলাইন মানসিক ও শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত। সেহেতু দেশের হিজরা জনগোষ্ঠী যে কম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে সেটি বিবেচনা করার অবকাশ নাই। মজার বিষয় হলো, যেখানে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশি অথবা স্পর্শের মাধ্যমে আমাদের প্রত্যেকের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিগ্রস্ত করছে, সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই অনুমেয় যে, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়েও যে কেউ রোগ আক্রান্ত হতে পারে। এই বিষয়টি সম্পর্কে আমরা কি দেশের হিজড়াদের বা যৌনশ্রমিকদের ওয়াকিবহাল করেছি? বা তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি? নাকি বরাবরের মতো তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি আমরা আমাদের বিবেচনাতেই আনছি না?

সমাজসেবা অধিদফতরের জরিপ মতে, বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। যদিও হিজরাদের দাবি, তাদের সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রথম হিজড়াদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী- পুরুষ ভিন্ন পৃথক লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বলে রাখা ভালো স্বীকৃতি প্রদান করা আর হিজড়াদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে ও বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।

টুকরো টুকরো ফেসবুকে বিচ্ছিন্ন খবরে দেখেছি কয়েকজন হিজরা সমাজের দুঃস্থ, গৃহহীন, মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে এগিয়ে এসেছে। এর মানে এই নয় যে তাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই, হিজড়া সমাজ ব্যবস্থা যেহেতু একটি ক্রমোচ্চ বা হায়রার্কিক্যাল সমাজ ব্যবস্থা, সেহেতু কয়েকজন নায়েক হিজড়ার অবস্থান বিবেচনা করে সকল হিজড়াকে সমান মাপকাঠিতে মাপার অবকাশ নেই।

আবার বৃহন্নলা নামে একটি ফেসবুক পেইজের সূত্রে জানতে পেরেছি যে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে কয়েকজন হিজরা মানুষজনকে অনুরোধ করছে ঘরে থাকবার জন্য। এখানেই প্রতীয়মান হয় যে আমরা যাদের হিজড়া বলি, আমরা যাদের অবজ্ঞা করি, তারা আসলে অবজ্ঞা বা অবমূল্যায়নের মানুষ নয়, বরঞ্চ তারা আপনাদের মতোই বিবেকবান এবং দায়িত্ববান মানুষের কাতারে পড়েন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের পাশে এসে দাঁড়ানো, তাদের জীবনমান, মৌলিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা।

মনে রাখা ভালো, করোনার কিন্তু না আছে কোন জাত পাত, না আছে লিঙ্গ, করোনা কিন্তু আপনার সামাজিক অবস্থা বা ক্ষমতা চর্চার সক্ষমতা বিবেচনা করে আপনার থেকে দূরে থাকবে না। ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের সদস্যরা এবং স্বয়ং রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ করোনা থেকে কিন্তু মুক্তি পাননি। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকেই প্রশ্ন করছি, সমাজের এই সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, আপনি ভালো থাকবেন তো?

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা
পিএইচডি ফেলো, অকল্যান্ড ইউনিভারসিটি অফ টেকনোলজি,
নিউজিল্যান্ড।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.