জীবনের চেয়ে বাণিজ্য যখন গুরুত্বপূর্ণ!

নাসরীন রহমান:

‘শনিবার কারখানার সুপারভাইজারের ফোন পেয়ে হেঁটে নরসিংদী থেকে ঢাকায় এসেছি। এখন গোটা পা ফুলে গেছে। কোনও যানবাহন পাইনি। এখন শুনি কারখানা বন্ধ। তাহলে কেন আমাদেরকে এই ভোগান্তি দেওয়া হয়েছে? আমরা এখন কোথায় যাবো? যদি কারখানা বন্ধ রাখা হয়, তাহলে আমাদেরকে নিরাপদ যানবাহন দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হোক। এভাবে ডেকে এনে ফিরিয়ে দেওয়ার তো কোনও মানে হয় না।”

“করোনা ভাইরাসের কারণে ছুটি হইল। টাকা নাই। বাড়িত চইলা গেলাম। চাকরি বাঁচাবার জন্য শনিবার চইলা আসলাম। আইসা শুনি আবার ছুটি। আগে জানাইলে কি হইতো? আসলে আমরা শ্রমিক না মানুষ, বুঝতে পারি না।’”

পুনরায় গ্রামের পথে ফিরে যাওয়া পোশাক শ্রমিকের কথা; কথা নয় আক্ষেপ!

এদিকে যানবাহন বন্ধ থাকায় অনেক কষ্ট ও ঝুঁকি নিয়ে পোশাক শ্রমিকেরা যেভাবে কর্মস্থলে ফিরেছিলেন, নির্ঘুম রাত শেষে পরদিন সকালে কিছু কিছু কারখানায় তারা কাজেও যোগ দেন। কিন্তু মাত্র ৪ ঘণ্টার মধ্যেই নোটিশ দিয়ে অধিকাংশ কারখানা আবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে শাঁখের করাতের মতোন অবস্থায় পড়েছেন এই শ্রমিকেরা। তারা জানিয়েছেন, যেসব বাসায় তারা ভাড়া থাকেন, করোনার ভয়ে সেইসব বাসার মালিকরা এ মুহূর্তে থাকতে দিচ্ছেন না। বাড়িতেও আর যাওয়ার পথ নেই। এমন একটি উন্মাদ দেশে জন্ম নেয়ার আমূল খেসারত দিচ্ছেন এই মানুষগুলো।

৪ এপ্রিল দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা দলে দলে ঢাকায় আসছিলেন কাজে যোগদানের জন্য; যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও দৃশ্যমান মাধ্যমগুলোতে দেখা গেছে। এ অবস্থায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ফের কারখানা বন্ধ রাখার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

শ্রমিকদের জীবন নিয়ে এই  যে খেলা, এর দায় নিবে কে? এই গার্মেন্টস শ্রমিকেরা পায়ে হেঁটে, ট্রাকে চেপে এতো পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসে শুনছেন কারখানা বন্ধের নোটিশ! এখন তারা গ্রামেও যে ফিরে যাবেন তারও উপায় নেই; হাতে যে টাকা ছিল তা খরচ করেই এসেছেন ঢাকায়। এখন তারা পড়েছেন উভয় সংকটে; না পারছেন ফিরে যেতে, না পারছেন থাকতে।

যারা কষ্ট করে যদিও বা ফিরছেন পথে পড়ছেন হাজার ভোগান্তিতে! ইতিমধ্যেই আবার ঘোষণা করা হয়েছে ঢাকা থেকে কেউ বের হতে পারবেন না বা ঢাকায় কেউ ঢুকতে পারবেন না।

সংবাদমাধ্যম এ দেখা যাচ্ছে, কষ্ট করে যে পোশাক শ্রমিকেরা ট্রাকে চেপে যাচ্ছিল, তাদের নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে পথে! অচেনা জায়গায় নেমে তারা আরোও বিপদে পড়ছেন; এদের কাছে এতো অর্থ নাই যে নতুন জায়গায় দু একদিন থাকবেন ,বা থেকেই কীভাবে বাড়ি যাবেন তাও অনিশ্চিত!

এই সময় এসব শ্রমিকদের যদি ঢাকায়ই আনা হলো, আবার কারখানা বন্ধের নোটিশ দেওয়া হলো, তবে প্রশ্ন হচ্ছে এদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো না কেন?? বা এদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো না কেন? কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালির মাশুল দিতে হচ্ছে এখন এই দরিদ্র খেটে খাওয়া শ্রমিকদের! এদের এই বিপদে ফেলার দায় নিবে কে এখন?

মুখে বড় বড় কথা বলে খালাস উন্নয়নের নেতারা! কিন্তু প্রদীপের নিচেই অন্ধকার! এই শ্রমিকদের ঘামে গড়ে উঠেছে এক একটি গার্মেন্টস শিল্প, কিন্তু এই শ্রমিকদের অবস্থানটা কোথায়? মালিকপক্ষ কখনও এইসব শ্রমিকদের ন্যুনতম সুযোগ সুবিধা দেখেছেন কি?

তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা ধস; এক একটি দুর্ঘটনার পর মালিকপক্ষ নড়ে চড়ে বসেন। প্রতিবাদ হয়, সভা, সেমিনার হয়। বড়, বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়, শ্রমিকদের স্বার্থে দিস্তা দিস্তা কাগজ খরচ হয় প্রস্তাবনা লিখে লিখে!
আবার যা তাই থেকে যায়!

কতটুকু উন্নত পরিবেশ দিতে পেরেছেন মালিকপক্ষ গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের জন্য? কয়টা কারখানায় কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ আছে?

আজ বলা হচ্ছে কারকানায় করোনা প্রতিরোধের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে; কারখানায় সাবান পানি রেখে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকবে, কিন্তু এ বক্তব্যে কতোটা ভরসা করা যায় তা বলাই বাহুল্য। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এই বক্তব্যের উপর ভরসা রাখতে পারি না।

আমরা দেখেছি, রানা প্লাজা ধসের পর আজ অবধি অনেক কারখানায়ই কাজের যথাযথ পরিবেশ, শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নাইই বললে চলে।

শিল্প মালিকেরা বুঝে মুনাফা; শ্রমিকের রক্ত চুষে মুনাফা অর্জন।

মুনাফাই এদের কাছে মুখ্য, শ্রমিকের স্বার্থ নয়। শ্রমিকের স্বার্থ দেখলে এদের মুনাফায় টান পড়বে! ঢাকামুখি এই শ্রমিকদের ঢল শুধু তাদের এই যাত্রাপথের দুর্দশার চিত্রই তুলে ধরেনি, বরং পোশাক শিল্পের মালিকদের সেই পুরোনো, অমীমাংসিত প্রশ্নের সামনেই দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে;
“শ্রমিকের স্বার্থ উপেক্ষিত হবে আর কতকাল??”

পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থ উপেক্ষিত হলে, তাঁদের মানুষ হিসেবে ন্যুনতম মর্যাদা না দিলে সেই ফল যে খুব শুভ হবে না তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

যেভাবে টেনে হিচঁড়ে এই পোশাক শ্রমিকদের ঢাকায় আনা হলো, আবার বন্ধ ঘোষণা করা হলো কারখানা, তা শুধু কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিপনা, অদূরদর্শিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মানুষ হিসেবে এই পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের করা হয়েছে চূড়ান্ত অপমান।

এই হেঁটে আসা শ্রমিকের ক্ষত বিক্ষত “পা” তাই ছবি হয়েই থাকবে না, বরং কষে পুঁজিবাদের দেয়ালে লাথি মেরে জিজ্ঞাসা রেখে যাবে, ‘আমাদের স্বার্থ আর কতকাল হবে উপেক্ষিত??”

শেয়ার করুন:
  • 288
  •  
  •  
  •  
  •  
    288
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.