পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে এই খেলাটা না খেললেই কি হতো না?

শামীম আরা নীপা:

ঢাকা থেকে সব জড়াজড়ি করে বাড়ি গেলো এবং বাড়ি থেকে সব জড়াজড়ি করে ঢাকা এলো।
কাকে দোষ দিবো? কী বলবো?
পেটের দায়ে আসছে তারা, বাঁচার তাগিদে আসছে, চাকরি বাঁচাতে আসছে। তারা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বুঝে না। বুঝলেও কিছু করার নাই তাদের। তবে তাদের শতকরা ৯৫ ভাগ এই মহামারীকে বুঝতেই পারতেছে না। কত অসহায় তারা! তারা বাঁচবে তো? তাদেরকে মহামারী নিয়ে সচেতন করার পরিবর্তে, তাদেরকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার সুযোগ না দিয়ে বরং তাদেরকে জন্তু জানোয়ার দাস যন্ত্র জ্ঞান করে তাদেরকে ঘর থেকে হাঁটিয়ে বের করে নিয়ে আসছে ঢাকা পর্যন্ত!

বাংলাদেশের সরকারের মতো হিংস্র শ্বাপদ আর অন্য কোনো দেশে নাই!
এই করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মহামারীতে এই পৃথিবীর কোনো দেশকে আপনারা এমন করতে দেখছেন? দেখেন নাই নিশ্চিত।

এই মহামারীতে চা বাগানের শ্রমিকদের ছুটি দেয়নি মালিকরা, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে আবার ১০ দিনের মাথায় ঢাকায় টেনে এনে আবার ১১ তারিখ পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা — এমন ফাজলামো জীবনেও কোথাও দেখেছেন? বিশ্বের কোনো দেশে এমন দৃষ্টান্ত আছে এখন পর্যন্ত?

নাই… পুরো ব্যাপারটা ভেবে খুব ভয়ংকর লেগেছে আমার। কারা দেশ চালায়? কাদের ভরসায় আছে এই দেশের নাগরিকগণ? এই দেশের নাগরিকের বিপদে আপদে কারা তাদের দায়িত্ব নিবে? এই মহামারী ঠেকাতে সরকারের ভূমিকা কী? জাতির বিপর্যয়ের দায় কে নিবে? এইসব মালিক এবং তাদের সাথে এই রাষ্ট্রযন্ত্র কেউ কম অপরাধী নয়। কেউ কম অমানবিক নয়!

এতো বড় ঝুঁকি জেনেও সরকার ইচ্ছা করে এই কাণ্ড করলো। ১৪ টা দিনও না, ১০ দিনেই সব মাখামাখি করে ফেললো। ঢাকায় সাসপেক্টেড রোগী অসংখ্য। অন্যান্য বছরের তুলনায় ঠাণ্ডা কাশি নিউমোনিয়ার রোগী এই মার্চে ১৪ গুণ বেশি। বিশ্বের প্রতিটা দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে স্বাস্থ্যসেবা সেক্টর ভেঙে পড়েছে, আর বাংলাদেশের তো স্বাস্থ্যসেবা বলতে কিছুই নাই উন্নত বিশ্বের তুলনায়। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কীভাবে রোধ করবে এই সরকার? কী স্বাস্থ্যসেবা দিবে নাগরিকদের এবং কীভাবে দিবে?

শামীম আরা নীপা

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট জাতীয় বাজেটের ৪.৯২%। সেই হিসাবে এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জনপ্রতি বরাদ্দের পরিমাণ বছরে মাত্র ১৪২৭.৭৭ টাকা। এই টাকা দিয়ে, এই ব্যবস্থা দিয়ে এই মহামারীকালে কী সেবা পেতে পারে বাংলাদেশের নাগরিক? সেইখানে দরিদ্র মানুষের এমন সামাজিক সংমিশ্রণ কতোটা ভয়ংকর পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে, ভাবতেও গা শিওড়ে উঠছে!

সরকার গার্মেন্টস সেক্টরকে চালু রাখতে বলছে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর জন্য এবং এই দেশের প্রধানমন্ত্রী নাটক করে বলছে যেন স্বাস্থ্য সচেতনতা বজায় রেখে, সামাজিক ডিসটেন্স বজায় রেখে গার্মেন্টসে শ্রমিকের কাজের ব্যবস্থা করা হয়! সত্যিইইইইই…! সম্ভব তা কোনো গার্মেন্টসে? দেশের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই জীবনে কখনো গার্মেন্টস দেখে নাই, তাই এমন ন্যাকু ন্যাকু কথা বলছে…।

গার্মেন্টস চালু থাকবে, তার মানে গার্মেন্টস শ্রমিকরা মানুষ না? মহামারীতে শ্রমিকরা ভুগবে ধুকবে মরবে – ওরা এই দেশের নাগরিক না? ওরা যদি এই দেশের নাগরিক হবে তবে ওদের বেলায় এই “ঘরে থাকো” জামানায় কেন ওদেরকে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘর থেকে টেনে এনে কারখানায় পোরা হচ্ছে? কেন ওদের দিয়ে কাজ করিয়ে ওদের অর্ধেক বেতন দেয়া হবে? আবার ওদের কারখানা খুলে দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে ওদের পথরোধও করতে বলা হয়েছে!

কেন…? শ্রমিকদের ঘর থেকে বের করে এনে তাদেরকে শারীরিক কষ্ট দিয়ে, তাদেরকে দিয়ে টাকা খরচ করিয়ে আবার বলছে ১১ তারিখ অব্দি বন্ধ- ফাজলামোটা কতদূর, আর কত সহজ বোঝা যাচ্ছে? কোনো উত্তর আছে? আছে কোনো পথ? তিন মাস তো দূর অস্ত, সরকার এবং গার্মেন্টসের মালিকরা অন্তত একমাসের দায়িত্ব নিতে পারলো না তাদের, যাদের শ্রমের বিনিময়ে রাষ্ট্র চলে, অথচ মালিকরা ঠিকই আয়েশি জীবন যাপন করে বেড়ায়।
সবাই বিপদে আছে এবং এই বিপদকে বাড়িয়ে দিলো রাষ্ট্রযন্ত্র নিজে এবং শ্রমিককে তারা কী জ্ঞান করে তা বুঝিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করে দিলো। ঘেন্নাতি ঘেন্না…

গার্মেন্টস মালিক এবং সরকারের এই হটকারি সিদ্ধান্তর ফল ভোগ করতে হবে গোটা জাতিকে।
গার্মেন্টস মালিক এবং সরকারের প্রতি ঘেন্না জানাই, থুতু দেই ওদের মুখে। ওদের ঐ হটকারিতামূলক সিদ্ধান্তকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলার সক্ষমতা অর্জন করা প্রয়োজন এই জাতির। সেই সক্ষমতা থাকা জরুরি ছিলো এই জাতির…
ঘেন্নাতি ঘেন্না…

শেয়ার করুন:
  • 929
  •  
  •  
  •  
  •  
    929
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.