পোশাক শ্রমিকদের জীবন একেকটা ‘অসাধারণ প্রজেক্ট’ মাত্র!

সুমু হক:

উজ্জ্বল নানারঙের সালোয়ার কামিজ পরা একদল মেয়ে সাতসকালে খুব দৃপ্তভঙ্গিতে হেঁটে চলেছে কাজের দিকে। তাদের কারো কারো মাথায় ওড়না বা হিজাব প্রায় প্রত্যেকেরই এক হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ, অন্য হাতে খাবারের ব্যাগ কিংবা টিফিন ক্যারিয়ার। ওদের কারো মুখে হাসি, কেউ বা পাশের সঙ্গীটির সাথে কথা বলছে। কারো ভেতর বিন্দুমাত্র আড়ষ্টতার চিহ্ন নেই! বাংলাদেশের পোষাক শিল্পের বদৌলতে এই ছবিটি গত প্রায় দু’তিন দশক ধরে
অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের দারিদ্র, যানজট এবং আরো সব ক্লিশে ছাপিয়ে এই ছবিটিই ক্রমশ: বাইরের পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশের একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, আমরাও তাই এই ছবিটিকে যথেচ্ছা ব্যবহার করতে থাকি। বিদেশী ক্রেতাদের কাছে এর মানে হয়ে দাঁড়ায় সস্তায় দক্ষ শ্রম।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের জন্যে এরা হয়ে দাঁড়ায় কেস স্টাডি, গবেষকদের জন্যে রিসার্চের সুবর্ণ ভাণ্ডার।
আমাদের দেশি মানবাধিকার সংস্থা এবং এনজিওগুলোর জন্যে এরা হয়ে দাঁড়ায় ফান্ডিং এবং প্রচারের পুঁজি।
বিশেষ করে যদি দুয়েকটা মেয়েকে পালিশ করে ঠিকমতো জামাকাপড় পরিয়ে দুচারটে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে আর পায় কে!
সরকারের জন্যে এরা আমাদের উন্নয়নের সবচেয়ে সহজ উদাহরণ। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যে এরা স্রেফ ভোট ব্যাংক।

ছবিটি ইন্টারনেট থেকে নেয়া

এদের নিয়ে নাটক, গল্প লেখা যায়। এদের নিয়ে ফিল্ম কিংবা ডকুমেন্টারি বানালে যেকোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এন্ট্রি পাক্কা।
এমনকি এদের মৃত্যুর ছবিও বিকোয় অনেক দামে। মনে আছে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা সেই মৃত
গার্মেন্টস শ্রমিকটির নূপুর পরা পায়ের ছবিটির কথা?

কিন্তু আমাদের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবার পর ক্লান্ত শ্রমিকেরা ফিরে যান তাদের ঘরে, আর আমরা ভাবতে থাকি, আমাদের পরের প্রজেক্টটা কী হবে!
এরা আগুনে পুড়ে, বিল্ডিং ধসে পরে মারা যায়, আমরা নির্বিকার।

স্বীকার করতেই হয়, যে আর্থিক স্বনির্ভরতার কারণে গার্মেন্টস শিল্পের হাত ধরে বাংলাদেশে নিম্নবিত্ত নারীর ক্ষমতায়ন অনেকটাই ঘটেছে, কিন্তু সেই একই
সাথে তাদেরকে মালিকের শোষণের শিকার হতে হয়েছে সমানভাবে। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে নারী হিসেবে যৌন শোষণের শিকারও হতে হয় তাদেরকে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কোভিড ১৯ এর ফলে প্রত্যেককেই কিছু না কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কিন্তু সমাজের নিম্নবর্গের সুবিধেবঞ্চিত মানুষগুলো এমনিতেই যথেষ্ট অসুবিধের ভেতর থাকেন বলে তাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি শুধুমাত্র সুবিধে অসুবিধের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে উঠছে বাঁচা-মরার প্রশ্ন।

গত ক’দিনে কোভিড ১৯ নিয়ে চলা সংকটকালীন সময়ে বাংলাদেশে সরকার, প্রশাসন এবং ক্ষমতাশালী মানুষগুলোর কাছ থেকে ঠিক সেই রকম আচরণই দেখেছি যা প্রত্যাশিত।
এর চেয়ে বেশি দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় কিংবা সততা আমি এখন আর এই সিস্টেমটার কাছ থেকে প্রত্যাশাও করি না।
দেশের সমস্ত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেবার পর শ্রমিকেরা যখন দলে দলে শহর ছাড়ছিলেন তখন অনেকেই সমালোচনা করছিলেন, অথচ একথা কেউ একবারও ভাবেননি, যে এই মানুষগুলোর কাজ বন্ধ থাকলে, শহরে বসে থাকলে এরা খাবেন কী?
বাসাভাড়াই বা দেবেন কী করে?

সুমু হক

তো, তারা শহর ছাড়লেন, ঠিক সেই সময়ই সরকার থেকে গার্মেন্টস মালিকদের জন্যে ঋণ ঘোষণা করা হলো। কেবলই ভাবছি, যে এতো বড় একটা দুর্যোগ, অথচ এটা নিয়ে এখনও কোন রাজনীতি শুরু হলো না! ঠিক সেই সময়ই আপনাদের অতি জনপ্রিয়, রুচিশীল, সুভাষিণী, বিজিএমইএ
সভাপতি বেগম রুবানা হক সরকারের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে গার্মেন্টস খোলার ঘোষণা দিয়ে শ্রমিকদেরকে শহরে ফিরিয়ে আনলেন এবং তারা ফিরে আসার পর আবার হঠাৎ মত পাল্টে হঠাৎ ঘোষণা দিলেন যে গার্মেন্টসগুলো ১১ই এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধই থাকবে। তা তিনি দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা, যখন যেমন ইচ্ছে, যা ইচ্ছে করতেই পারেন, বিজিএমইএর সভাপতি বলে কথা!

আসল কারণটা আর কিছুই নয়, ঋণের পরিবর্তে সরকারকে চাপ দিয়ে কিছু ইন্টারেস্ট ফ্রি ভর্তুকি আদায় করে নেয়া। এতো এতো টাকার খেলা চলছে, অথচ গার্মেন্টস মালিকদের পকেটে কিছু ঢুকবে না, এটা কোন কথা হলো!

আপনারা দেখছেন হাজার হাজার ক্লান্ত, শ্রান্ত শ্রমিক বহুদূরের পথ হেঁটে শহরে আসছেন এবং ফিরে যাচ্ছেন। আমি দেখছি কোন একটা অদৃশ্য দাবার বোর্ডের ওপর কতগুলো ঘুঁটি নড়ছে, চলছে, ফিরছে। মালিকা-এ-বিজিএমইএ তার অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে ঠিক করছেন দাবার বোর্ডে এদের
পরের অবস্থানটা কী হবে।

এরপর কিছু গোপন এবং কিছু প্রকাশ্য আলোচনা হবে। সরকারের বড়, মেজো, সেজো, ছোট সব মহলকে সন্তুষ্ট করে রুবানা হক এবং তার
সহযোগীরা নিজেদের পকেট ভরবেন এবং কোন একটি সমঝোতায় আসবেন। তারপর সবার ভাগ বাটোয়ারার পর যে খুদকুঁড়োটুকু পরে থাকবে সেগুলো ছুঁড়ে দিয়ে ঘুঁটিগুলোকে আবার পাঠাবেন নির্বাসনে। আসা যাবার পথে এবং তারপরের মাসখানেক ধরে শোনা যাবে ঠাণ্ডা জ্বর, সর্দিকাশি এবং শ্বাসকষ্টে কিছু গার্মেন্টস শ্রমিক মারা গেছেন।

আপনারা আমরা খবর শুনে বলবো, “হবেই তো! মা গো! কী যে ভীষণ আনহাইজিনিক ওরা!” তারপর আমি আবার বসবো আমার ল্যাপটপে, দেখি, এই গার্মেন্টস ওয়ার্কারদের ভেতর হাইজিনের ট্রেইনিং নিয়ে একটা প্রজেক্ট প্রপোজাল তৈরি করা যায় কিনা! এই পোস্ট-কোভিড ১৯ ওয়ার্ল্ড এ যা ফান্ডিং আসবে না! ফাটাফাটি একদম!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.