চোখ বুজে “অ্যানা ফ্রাঙ্ক”কে ভাবুন!

জয়শ্রী দত্ত:

হলোকস্ট ভিকটিম ইহুদি কিশোরী অ্যানা ফ্রাঙ্ক দুই বছরেরও বেশি সময় একটা এটিকে/চিলেকোঠায় অন্ধকারে জীবনের ভয় নিয়ে বন্দী ছিলেন তার পরিবারসহ আরও দুটি ইহুদি পরিবার নিয়ে। খাবারের কী নিদারুণ স্বল্পতা তিনটি পরিবারের জন্য, এতোগুলো অভুক্ত পেট! একই ছাদের নিচে গাদাগাদি, ছোট বড় সবাই সবার মুখোমুখি একটিমাত্র কামরায়, অথচ কারো মুখে একটুকুন হাসিও নেই, উচ্চকিত শব্দ তো দূরে থাক, পাছে সকলে হিটলারের বাহিনীর কাছে ধরা পরে প্রাণ হারাতে হয়! কেননা ঐ চিলেকোঠার নিচেই ছিল কারখানা যেখানে রোজ শ্রমিকরা আসা যাওয়া করতো সন্ধ্যা পর্যন্ত।

খ্রিস্টমাসের মতো ইহুদিদের ট্রাডিশনাল একমাত্র প্রধান উৎসব “হানুকা” পর্যন্ত তারা আনন্দে উদযাপন করতে পারেনি এই বন্দীদশায়! অ্যানা ঐ চিলেকোঠায় বসে অপ্রতুল সরঞ্জাম দিয়েই নিজের হাতের তৈরি “হানুকার উপহার” বানিয়ে প্রত্যেকের জীবনে একদিনের জন্য হলেও “অতি শংকাতেও বেঁচে থাকা”টা কতো আনন্দের — তা অনুভব করালো!

ঐ বন্দিদশায় কৈশোরের বাঁধ না মানা মন তার সারাক্ষণই আঁকুপাঁকু করতো এই জেলখানা ভেঙে মুক্ত বিহঙ্গ হতে, মন চাইতো তার বয়সী অন্য সকলের মতো যখন তখন কারো প্রেমে পড়তে! তার চিরাচরিত সামাজিক আচরণের বিধিনিষেধ আর মায়ের বকুনি থেকে পালিয়ে যেতে মন চাইতো! কিন্তু কিছু করার নেই প্রতিদিন ঘুমে দুঃস্বপ্নে গোঙানি ছাড়া!

এমন নরকময় দুই বছরের বন্দী দশায় তার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরতার বন্ধু ছিলো দুটি, একজন তার বিদ্যোৎসাহী বাবা, আর অন্যটি তার ব্যক্তিগত ডায়েরি!
ঐ “ডায়েরি অফ আ ইয়াং গার্ল” পড়েই তাবৎ বিশ্ব জানতে পেরেছে ঐ অন্ধকার চিলেকোঠায় দুই বছরের “অতি শংকাতেও বেঁচে থাকা” কাকে বলে!

এই গল্প আমরা সকলেই জানি ছোটবেলা থেকেই!
যেটা জানতাম না সেটা হলো “সত্যিকারের বন্দীদশায় উপলব্ধি”!

অ্যানা’র বেঁচে থাকবার জন্য একমাত্র সম্বল ছিলো কেবল তার বন্ধুপ্রতিম জ্ঞানী বাবা আর এক পুরনো পাতার ডায়েরি!

অথচ এই “করোনার ক্রান্তিকালে” আমাদের পুরো পরিবার আছে আমাদের সাথে, কাভার্ড ভর্তি খাবার আছে, মনোরঞ্জনের জন্য টিভি আছে, প্রেমিক/প্রেয়সীর কণ্ঠ শোনার জন্য ফোনে আনলিমিটেড মিনিট আছে, ২৪/৭ ভিডিও কল দিয়ে দেখবার জন্য হোয়াট্স অ্যাপ আর ম্যাসেঞ্জার আছে,
মনের কথা, অভিজ্ঞতা কিংবা ক্ষোভ ছাড়বার জন্য “ডায়েরি”র বদলে ফেইসবুক আছে, পড়াশোনার জন্য অনলাইন রিসোর্স আছে!
কী নেই “বেঁচে থাকা”র জন্য? অ্যানা ফ্রাঙ্কের চেয়ে তো শতভাগ ভাগ্য প্রসন্ন আমাদের!

অ্যানা বাইরে যাননি দুই বছর, তারপরেও বাঁচতে পারলেন না, গুপ্তচর এসে পুরো পরিবারকে নাৎসীদের হাতে তুলে দেয়, পরে হলোকস্ট ক্যাম্পে রোগে ভূগে মারা যান!

অথচ আমাদের ঘরে রোজ আলো আসে, আমরা প্রাণ খুলে উচ্চশব্দে অট্টহাসি হাসলেও কেউ খোঁজ পেয়ে এসে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে না, আমাদের বাঁধভাঙা যেকোনো ইচ্ছে আমরা যখন তখনই মিটিয়ে নিতে পারছি এখনও! আমরা ঘরে বসেই শখের কাজগুলো করে নিতে পারছি!

দুই বছর না হোক, দুইটা মাস কেন আমরা বাইরে বেরুনো সীমিত করতে পারছি না?
আমাদেরও তো “করোনা” খুঁজে বেড়াচ্ছে হিটলারের মতো!

প্রিয় প্রাণহরণের ভয় নেই?

“করোনা- রেজিম” এর আগ্রাসন থেকে বাঁচতে শুধু ক’টা দিন ঘরে বসে যার যেভাবে খুশী বাঁচা কি অ্যানা ফ্রাঙ্কের “বেঁচে থাকা”র চেয়েও কঠিন?

আমেরিকাবাসী শুধু ঘরে বসে না থাকার জন্য আজ ইতালি আর স্পেনের পরের স্থানেই মৃত্যু মিছিলে নেমেছে!

আর কিছুই নয়, কেবল একটু ঘরে সময় কাটানোই আজকে ঠেকিয়ে দিতে পারতো হাজার হাজার মৃত্যুকে!

এখনও তো বেঁচে আছি, আসুন এই “বেঁচে থাকা” ঘরে বসেই একসাথে উদযাপন করি।
হাজার হাজার শবদেহের নিঃসঙ্গ কফিনের সারি আর দেখতে পারছি না রোজ!

চোখ বুজে “অ্যানা ফ্রাঙ্ক”কে ভাবুন!

শেয়ার করুন:
  • 5.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.