গৃহবন্দী দিনগুলোয় মুক্ত থাকুক মনটা

মুমতাহিনা খুশবু:

“চিকিৎসকেরা যে ভুল করেন তা হলো তারা মনের চিকিৎসা না করে শরীর সারাতে চান। যদিও মন ও শরীর অবিচ্ছেদ্য, তাই আলাদা করে চিকিৎসা করা উচিৎ নয়।”
– প্লেটো

যান্ত্রিকতার আধুনিক জীবন যাপনে একবারের জন্যও একা অনুভব করেন না এমন মানুষ হয়তো খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে।
ভালো থাকার জন্য শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিকভাবে সুস্থ থাকাটা খুবই জরুরি। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদাসীন।
শারীরিক অসুস্থতার জন্য আমরা ডাক্তার দেখাতে অলসতা করি না, কিন্তু মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লে বা ঠিক অনুভব না করলে ডাক্তার দেখানো তো দূরের কথা নিজের কাছের কারও কাছে সেই হতাশা, উদ্বিগ্নতা বা ঠিক অনুভব না করাটা নিয়ে আলোচনাও করি না।

আমি কোন বিশেষজ্ঞ নই, বিশেষজ্ঞদের মতো কোন মতামত দিতেও আসিনি। আমি শুধু চাই আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করি, সচেতন হই ডিপ্রেশন, স্ট্রেস, এংজাইটির মতো মানসিক বিষয়গুলো নিয়ে। আমি নিজে যখন ঠিক অনুভব করি না, তখন বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন লেখা, মোডিভেশনাল ভিডিও ইত্যাদি থেকে সাহায্য নিই।

মুমতাহিনা খুশবু

কোন মানুষই পুরোজীবনে সবসময় মানসিকভাবে ঠিক থাকে না।
মানসিক সুস্থতা বলতে আমি মানসিক, আবেগীয় এবং সামাজিকীকরণ জনিত ঠিক থাকাকে বুঝি। মানসিক স্বাস্থ্য আমাদের ভাব, অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা, কাজ-কর্ম ও আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এছাড়াও আমরা দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, পারস্পারিক সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়া ও আবেগ কিভাবে সামলাই তা মানসিক সুস্থতার উপর নির্ভর করে।
জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার দক্ষতা নির্ভর করে মানসিক সুস্থতার উপর।

পুরো পৃথিবী আজ খুব খারাপ সময়ের মুখোমুখি। গৃহবন্দী হয়ে থাকার এই দিনগুলোতে মানসিক সুস্থতার উপর গুরুত্ব দেয়া খুব বেশি প্রয়োজন। শরীর সুস্থ রাখতে হলে আগে মনকে সুস্থ রাখতে হবে।
মানুষ সামাজিক জীব তাই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন গৃহকোনে আবদ্ধ হয়ে মনের মাঝে অসুস্থতা সৃষ্টি হওয়াটা খুব বেশি অস্বাভাবিক না। এই গৃহবন্দী হয়ে থাকার মানসিক প্রভাব অবশ্যই রয়েছে।
ভেবে দেখুন আপনার পরিবারের ব্যবসায়ী যে মানুষটি আছেন তিনি হয়তো এই মহামারী চলে যাওয়ার পর নিজের আর্থিক ক্ষতিটি কিভাবে পুষিয়ে নিবেন তা নিয়ে চিন্তিত।

আপনার পরিবারের মধ্যে যে সদস্যটি প্রাইভেট চাকরি করে সে হয়তো মহামারী শেষে নিজের চাকরিটা থাকবে কিনা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

মধ্যবিত্ত পরিবারের যে সন্তানটি টিউশনির মাধ্যমে নিজের পড়াশোনা, হাত খরচ এবং অন্যন্য চাহিদা পূরন করে সে হয়তো বসে থাকা এই সময়টার ক্ষতি নিয়ে হতাশায় পড়বে।
এরকম আরো অনেক অনেক ক্ষেত্র আছে উপলব্ধি করবার মতো।
উদ্বিগ্নতার কারণে জার্মানির আর্থিক কেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্টের আঞ্চলিক রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাটি শুনেছেন, ভেবে দেখেছেন?

না ভাবলে, ভাবুন।

আমি রোজ বই পড়া, ছবি আঁকা, রান্না করা ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রাখার পরও যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি এবং আমার যৌথ পরিবারের অন্যসব সদস্যদের আচার আচরণ বিশ্লেষণ করে যে উপলব্ধি তা থেকেই লিখতে বসা।

দীর্ঘ গৃহবন্দী থাকায় যেসব সমস্যা হতে পারে বলে অনুভব করছি:

# নিদ্রাহীনতা
# খাবারে অনীহা
# মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া
# প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি
# অতীতের জন্য আকুতি
# ক্লান্তি বা অবসাদ
# বিষণ্ণতা
# হতাশা
# ভয় বা উদ্বিগ্নতা
# নেতিবাচক চিন্তা
এবং এমন অনেক কিছুই যা আমাদের কথা বার্তা, আচার আচরণেও প্রভাব ফেলবে বা ইতোমধ্যে ফেলছে।
এসব সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেই নিজেকে সাহায্য করতে না পারলে আমাদের উচিৎ হবে অন্যের সাহায্য নেয়া এবং এর প্রভাব থেকে বেড়িয়ে আসা। তবে নিজের ইচ্ছা শক্তিটুকু থাকতে হবে সবার আগে।

মেঘলা এই খারাপ লাগা সময়গুলো কাটাতে যা করণীয় হতে পারে:

১। বেশী নয়, আগামী সাত দিনের একটা কর্ম পরিকল্পনা করুন। অপরিহার্য কাজগুলো ছাড়াও কী কী অতিরিক্ত করতে চান তার একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি করে নিন।

২। যারা বিশ্বাসী তারা স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দিন শুরু করুন। ঘরেই হাঁটুন, হালকা ব্যায়াম করুন। নিজ নিজ ধর্মীয় প্রার্থনা করুন, নামায আদায় করুন।

৩। সংবাদপত্র, টিভি ও অন্যান্য মিডিয়া থেকে সংবাদ দেখা সংক্ষিপ্ত করুন। সচেতনতার জন্য যতটুকু তথ্য প্রয়োজন নিন, তার অধিক না। বেশি বেশি সংবাদ দেখা মহামারী সম্পর্কে উদ্বেগ বা আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।

৪। সামাজিক দূরত্বের দিনগুলোতে যোগাযোগের দূরত্ব কমিয়ে আনুন। ব্যস্ততার কারণে এতোদিন যে সকল আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবের খোঁজ নিতে পারেননি রোজ তাদের মধ্যে অন্তত একজন এর সাথে কথা বলুন। সম্পর্কগুলো প্রাণ ফিরে পাক আবার।

৫। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন আসক্তির পর্যায়ে না যায় তাই ভালোলাগা বা শখের কাজগুলো করুন। বইপড়া, ছবি আঁকা, লেখা, গান শোনা ইত্যাদি শখের বিষয়গুলোতে সময় দিন।

৬। পরিবারের সাথে সুন্দর সময় কাটান। পরিবারে শিশু বা বৃদ্ধ থাকলে তার সাথে রোজ কিছু সময় কাটান। নিজের সাথে অন্যদেরও যত্ন নিন। একদিন না হয় বাবা বা ভাই এর হাতে চা খাওয়ার আবদার করুন, সিনেমা/নাটক দেখুন একসাথে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করুন। মহামারী শেষে কী করতে চান সে বিষয়েও পরিকল্পনা করতে পারেন সবাই মিলে।

৭। যখন বিরক্ত, একঘেয়ে অনুভব করবেন তখন নিজের কোন পছন্দের পানীয় নিয়ে আকাশ দেখতে বারান্দা বা উঠোনে চলে যান অথবা গান শুনুন। ধ্যান করুন। এই সময় নিঃসঙ্গ হয়ে একান্ত নিজেকে সময় দিন। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চেষ্টা করুন। সময় নিন মেজাজ ঠিক হওয়া পর্যন্ত।

৮। প্রতিদিন স্নান করুন। নিজের যত্ন নিন। সুন্দর পোশাক পরুন। আমরা যখন নিজেকে সুন্দর পরিপাটি দেখি অর্থাৎ নিজেকে যখন নিজের ভালোলাগে তখন আমাদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি বেড়ে যায়।

৯। দম বন্ধ লাগা সময়গুলোতে মন খুলে কথা বলুন। অস্থির লাগা সময়গুলোতে যা করতে ইচ্ছে হয় করুন। এমনকি কাঁদতে ইচ্ছে হলে কাঁদুন অথবা নিজের খারাপ লাগা গুলো একটা সাদা কাগজে লিখে ছিঁড়ে ফেলুন (কখনো পুনরায় লেখাটি পড়তে যাবেন না)।

১০। অবসরে আমরা অনেকেই পুরনো ডায়েরি বা ছবি, ভিডিও দেখছি। অতীতের এসব স্মৃতি হাতরাতে গিয়ে হতাশায় ডুববেন না যেন। বরং ভালোসময় গুলোকে মনে করুন, ভালো স্মৃতি আর জীবনের ভালো দিকগুলো থেকে উৎসাহ নিন।

সর্বোপরি সুস্থ থাকতে নিজের মনের যত্ন নিন, গুরুত্ব দিন মানসিক সুস্থতাকে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন। মনের উপর চাপ সৃষ্টি না করে হতাশা, বিষন্নতার মতো নেতিবাচক অনুভুতিগুলোকে মেনে নিন স্বাভাবিক অনুভূতির অংশ হিসেবে, যা অতিক্রম করা কঠিন কিছু নয়।

বিশ্বাস রাখুন যে পরিস্থিতি একদিন ঠিক হয়ে যাবে, স্বাভাবিক হয়ে আসবে সবকিছুই। আমাদের শুধু সহানুভূতি, সহমর্মিতার সাথে অন্যের অনুভূতি বুঝতে হবে। সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে একে অন্যের প্রতি। শুধু সামাজিক বা আর্থিকভাবে নয়, সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে আবেগীয়, মানসিক সুস্থতায়ও।

গৃহবন্দী দিনগুলোয় মনটা যেন বন্দী না হয়ে যায়। মুক্ত থাকুক মনটা, দৃঢ় হোক মানসিক

শেয়ার করুন:
  • 621
  •  
  •  
  •  
  •  
    621
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.