করোনা পরিস্থিতি: অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়

উপমা মাহবুব:

চারপাশে যা অবস্থা দেখছি তাতে কোনো কোনো সময় মনে দুঃখ দিয়ে মনে হয়, ভাগ্যিস আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ টেস্ট কিট নাই। যদি থাকতো তাহলে বাংলাদেশের মানুষকে টেস্ট করানোর কথা বলা লাগতো না। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন টেস্ট করানোর জন্য লাইন দিত। একটু কাশি আসছে, যাই টেস্ট করে আসি। একটু শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, যাই টেস্ট করি। বাচ্চার কপালে হাত গিয়ে গা একটু গরম মনে হচ্ছে, থার্মোমিটারে মাপার দরকার নাই। টেস্ট করা লাগবে। মনের বাঘই বাঙালিকে খাওয়ার জন্য যথেষ্ট। যে কারণে হাসপাতাল বানাতে আমরা বাধা দেই। ১৬ ঘন্টায় ৬ হাসপাতাল ঘুরেও মুমূর্ষু রোগীকে কোনো হাসপাতাল গ্রহণ করে না। কবরস্থানে লাশ কবর দিতেও কারও কারও সমস্যা। অথচ সেই মৃত ব্যক্তির করোনা টেস্টে দেখা যাচ্ছে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট।

উপমা মাহবুব

নিজের জন্য আর কত বাঁচবেন বলুন তো? আজকে করোনা রোগী ভেবে একজনকে অচ্ছুত করছেন, শুধু নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবছেন। মনে রাখবেন কাল আপনারও একই অবস্থা হতে পারে।

প্রতিদিন গড়ে সত্তর হাজার ফোন যাচ্ছে আইইডিসিআর-এ। অসংখ্য পুরুষ কণ্ঠ ফোন করে কল সেন্টারের নারীদের জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, আপনার কী বিয়ে হয়েছে? আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই, ইত্যাদি। ফোনে কেউ একজনকে তার সিম্পটম করোনার সিম্পটম না এটা বুঝিয়ে বলার পরও সেই ব্যক্তি বার বার আইইডিসিআর-এ কল করছেন।
আচ্ছা যারা এগুলো করেন, তারা কেন করেন একটু জানাবেন প্লিজ? জানেনই তো ওদের সেবা দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত। একটু কম মজা বা একটু কম প্যানিক করে ওরা যতটুকু পারে ততটুকু তো অন্তত করতে দিন। সারাদিন ওদের সমালোচনা করে কী করবেন? আপনি কী আরেকটা আইইডিসিআর বানাতে পারবেন?

প্রতিদিন টিভিতে আরেক নাটক দেখি। একদিন দেখলাম এক পথচারি সাংবাদিককে বলছেন, ‘কফ তো মানুষ ফেলবেই। সরকারের উচিত কফ ফেলার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা করে দেওয়া’। সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার কয়েকদিন পর এক পুলিশ ভাই দুঃখ করে সাংবাদিককে বললেন, ‘আজকে একজনকে পেলাম উনি ধানমন্ডি থেকে কারওয়ান বাজার এসেছেন বাজার করতে। শিক্ষিত লোক এরকম আচরণ করলে কী করি বলেন তো?’ আমরা কিছু মানুষ বাসায় ঢুকে বসে আছি। অথচ শিক্ষিত হয়েও অসংখ্য অসচেতন মানুষ শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অল্পবয়স্ক ছেলেরা পাড়ার দোকানে আড্ডা দিচ্ছে। শহরের শিক্ষিত মানুষকে ঘরে ঢোকাতে যদি সরকারকে এতো কাজ করতে হয়, রাস্তায় রাস্তায় এতো টহল দেওয়া লাগে, তাহলে গ্রামে-গঞ্জে যেখানে মানুষ দরিদ্র, অসচেতন তাদের জন্য ওনারা কীভাবে কাজ করবেন?

তবে সবদিক দিয়ে এগিয়ে আছেন কিছু ফেসবুক ব্যবহারকারী। সেখানে এখন জমজমাটভাবে চলছে খোঁচাখুচি, ট্রল চালাচালি। ফেসবুকে একে অন্যকে ট্যাগ করে কোনো খেলা খেলা যাবে নাকি যাবে না, বাসায় কিছু রান্না করে সেই খাবারের ছবি কেন কেউ আপলোড করবে, গরীব মানুষের মাঝে সহায়তা বিতরণ করে তা শোঅফ করার কী আছে – ফেসবুকে একজনের পিছনে আরকজনের লাগালাগি করার টপিকের কোনো শেষ নেই। বাসায় বসে থাকলে যা হয় আর কী!

এদিকে দেশে-বিদেশে অসংখ্য রিপোর্ট বের হয়েছে যে পরিবারের সব সদস্য হোম কোয়াটেন্টাইনের কারণে বাসায় অবস্থান নেওয়ায় নারীর উপর গৃহস্থালী কাজের চাপ অনেক বেড়ে গেছে। এই রিপোর্ট ফেসবুকেও এসেছে। ব্যস তাতেই শুরু হয়ে গেল। বাসায় অবস্থান নেওয়ায় স্বামীরা কেমন দুঃসহ জীবনযাপন করছে, স্ত্রীদের যন্ত্রণায় তাদের জীবন কেমন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তা নিয়ে ফেসবুক জুড়ে হাসাহাসি, জোকস আর ট্রলের ঝড় চলেছে। যেসব স্বামী-স্ত্রী মিলেমিশে সংসারের কাজ করছেন তাদের পোস্টকে কে পাত্তা দেয়? গৃহে নারী নির্যাতনের হার বেড়ে যাওয়া নিয়েও রিপোর্ট শেয়ার হচ্ছে। এ রকম একটা পোস্টের কমেন্টে পড়লাম একজন লিখেছেন, বাড়িতে স্বামীর কাছে একটু-আধটু মার খাওয়ার পরও স্ত্রী নিরাপদেই আছেন। বাইরে বেরুলে তিনি আরও অনেক বেশি অনিরাপদ! এরকম আরও বাজে কমেন্টস, ট্রল, জাতি হিসেবে নারী কত নিকৃষ্ট সে সংক্রান্ত মনগড়া বক্তব্য সবই সেই পোস্টের নিচে আছে। এতেই বোঝা নারীর প্রতি আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের অনেক বড় অংশ এখনো কতটা নিম্নমানসিকতা প্রদর্শন করে থাকেন।

আমার মনে হয় অতিরিক্ত ভীতি, অতিরিক্ত সাহস বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, ট্রল বা জোকস করতে পারার মানসিকতা বাঙালি জাতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এর মূল কারণ সম্ভবত আমরা শুধু নিজেকে নিয়েই চিন্তা করি। নিজে ভালো থাকলে আশেপাশে কে কেমন আছে, আমার কোনো কাজে কার কী ক্ষতি হলো আর কে কী মনে করলো তা আমরা থোড়াই কেয়ার করি। কিন্তু এখন সময়টা সত্যিই খুব খারাপ। নিজে সচেতন না হলে এবং অন্যের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে বা দিলে যে যতই ঘরের ভেতরে অবস্থান নিক বা কেন, কেউই নিরাপদে থাকতে পারবে না।

তাই সবার প্রতি অনুরোধ, পুরো দেশের কথা চিন্তা যদি নাও করতে পারেন, তারপরও সম্ভব হলে নিয়ম মেনে কিছু স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করুন। প্রতিবেশি, এলাকার মানুষসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। যদি তা না করতে চান তাহলে অন্তত ঘরে থাকুন, পরিবারকে নিরাপদে রাখুন, অন্য আত্মাীয়দের খোঁজ-খবর নিন। তাদের মনে সাহস জোগান। অযথা বাইরে ঘোরাঘুরি করবেন না। আর বাসায় বসে আর্থিক সহায়তা প্রদানের কাজটি কিন্তু আপনারা সহজেই চালিয়ে যেতে পারেন। এগুলোর কোনোটি সম্ভব না হলে বই পড়ুন, ইউটিউব থেকে কিছু নতুন স্কিল শিখুন। পরিবারের সদস্যদের সময় দেন। দয়া করে সংকটকালিন এই মুহূর্তে অতিরিক্ত ভীতি প্রদর্শন, অতিরিক্ত সাহস প্রদর্শন কিংবা সংকট নিয়ে হাসাহাসি, ট্রল এসব করবেন না। নিজে ভালো থাকুন, অন্যদেরও ভালো থাকতে দিন, প্লিজ।

লেখক:
উন্নয়ন পেশাজীবী

শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.