আমরা শকুন নই, তাই মৃত স্বজন নয়, স্বচ্ছতা দেখতে চাই

সালমা লুনা:

প্রধানমন্ত্রী গতকাল হেসে হেসে বলেছেন, তার বাবুর্চিখানাতেও নাকি পিপিই পরে বসে ছিল লোকজন। উনি সেটি বন্ধ করেছেন।
বিভিন্ন পেশার লোকজন নিজ টাকায় পিপিই কিনে বসে আছেন। কেউ গায়ে লাগিয়ে ব্যাংকে কাস্টমার সার্ভিস দিচ্ছেন। হসপিটালের সামনে দাঁড়িয়ে টিভির লাইভ কাভার করছেন কেউ।
তাদের জানা উচিত, ওগুলো কেনার টাকা তাদের হতে পারে, কিন্তু এই পিপিইতে আসলে সম্পূর্ণ হক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের। যারা আক্রান্ত রোগীর সান্নিধ্যে যাচ্ছেন, তাদের। যারা পরীক্ষাগারে কাজ করছেন তাদের।

হসপিটালগুলো সন্দেহজনক মনে হলেই রোগী রাখছে না। রোগীরা মারা যাচ্ছে। নিজ টাকায় পিপিই কিনে পরা মানুষ বুঝতে পারছেন না, অকারণে পিপিই পরে সেইসব অসুস্থ মানুষদের সেবা পাওয়ার অধিকারও ছিনিয়ে নিচ্ছেন তারা। পরোক্ষভাবে তাদের মৃত্যুর কারণ হচ্ছেন। কারণ পিপিই না থাকায় তাদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে ভয় পাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ফিরিয়ে দিচ্ছেন হসপিটাল থেকে।

যদিও দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের কথা,
পিপিই-র কোন ঘাটতিই নেই হসপিটালগুলোতে।

সবসময় কঠিন কথা বলতে ভালো লাগে না।
হাতিঘোড়া কিছু মারা পড়ে না এসব লেখালেখিতে। বরং কিছু লোক বিরক্ত হন। হয়তো তারা বিরক্ত হন নিজেদের স্বভাবজাত কারণেই। কিন্তু কিছু জিনিস ভাবতে হবে সবাইকে। অকারণে নিজের সুরক্ষা নিয়ে ভেবে অন্যের জীবন সংশয় যেন না ঘটে!

আমার জানাশোনা বেশ কিছু ডাক্তার নানারকম ছলচাতুরী করে নিজের কর্মস্থলে না গিয়ে ঘরে বসে আছেন। অথচ শুনতে পাই, এসময়ে তাদের
ছুটি নাই। তবু তারা নানান অছিলায় ছুটি নিয়েছেন কীভাবে যেন!

আমি জানি ডাক্তাররা এবং তাদের স্বজনরা খুবই বিরক্ত হবেন আমার কথায়। তবু বলতেই হচ্ছে, ডাক্তাররা রোগীর সেবা দিচ্ছেন এই সময়ে এটা যেমন সত্য, তেমনি এই কথাটাও সত্য যে কিছু ডাক্তার প্রাণভয়েই একরকম পালিয়ে বেড়াচ্ছেন নিজ দায়িত্ব থেকে।
ডাক্তাররা বলছেনও নিজের জীবন বাঁচানোর অধিকার তাদের আছে। হ্যাঁ অবশ্যই আছে। কিন্তু যেহেতু স্বাস্থ্য বিভাগের কথানুযায়ী পিপিই-র ঘাটতি নেই। তাহলে এই জীবন বাঁচানোর চেষ্টার কথা উঠছেই বা কেন?
আর এজন্যই আরেকটা কথাও সত্যি। প্রায় সব হসপিটাল সামান্য লক্ষণ দেখলেও মরণাপন্ন রোগীকে হাতও লাগাচ্ছে না, সেবা তো দূরের কথা। বেশ কয়েকটি মৃত্যুর খবর আমরা জেনেছি ইতিমধ্যেই।

যার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তার শ্বাসকষ্ট যে হার্টের সমস্যার জন্যও হতে পারে এই কথাটা শুধুমাত্র একজন ডাক্তারের জানার কথা। হসপিটালের ইট কাঠ আসবাব কিংবা যন্ত্রপাতিগুলো তো আর রোগী এটেন্ড করে না! সরকারের ইমেজ বা হসপিটালের মালিকগণও করেন না। ওখানে চাকরিরত ডাক্তার নার্সকেই ওই কাজটা করতে হয়।

তাহলে ডাক্তাররা পেশার কোন দায়িত্ব নিচ্ছেন রোগী ফিরিয়ে দিয়ে?
এই প্রশ্ন করা যাবে?

একটি নামকরা বেসরকারি হসপিটাল নিজে থেকেই লকডাউন। আইসিইউ আক্রান্ত বলে। না রহেগা বাঁশ না বাজেগা বাঁশরি। অর্থাৎ বন্ধ থাকলে রোগীও নেই, রোগী না থাকলে করোনায় ফিরিয়ে দেয়ার বদনামও নেই।
এতো এতো টাকা নিয়ে চিকিৎসা সেবা দেয় যে বেসরকারি হসপিটাল, তারা কেন করোনা আক্রান্ত সন্দেহে রোগী ফিরিয়ে দিলেও তাদের ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল হবে না?
এই প্রশ্ন করা যাবে?

স্বাস্থ্য বিভাগের বক্তব্য কী? এসব জিজ্ঞেস করার অধিকার কি আমাদের আছে?

ফ্লোরা আপার শাড়ির ফ্লাওয়ার না গুণে বরং আসুুুন এই প্রশ্নগুলো করি আমরা। অনলাইনেই করি।

অনলাইনে যিনি দাউদাউ আগুন জ্বালিয়ে প্রশ্ন করছেন, মানুষ মারা যায় না বলে তোদের আফসোস? মরলে খুশি হোস? তোরা সব শকুন!
তাকেও প্রশ্ন করুন, রোগী হসপিটালে হসপিটালে ঘুরেও চিকিৎসা পেল না কেন রে দলান্ধ ড্যাশজাদা?

পৃথিবীর বেশি করোনা আক্রান্ত দেশগুলি ডাক্তারদের নার্সদের হাততালি দিচ্ছে তাদের অক্লান্ত সেবা দেখে। আমরাও দিচ্ছি।
কিন্তু আমাদের দেশে তো এতো করোনার রোগীই নেই। বরং সবাই সঠিক নির্দেশনা মেনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। যেহেতু রোগী নেই, সেহেতু উনারা তো রোজকার স্বাভাবিক দায়িত্বই পালন করছেন। তাহলে যার যা পেশাগত কাজ তার জন্য দেব এই হাততালি?
তাহলে রোগী যারা ফিরিয়ে দিলেন তারা কী পাবেন?

হাততালিটা শুধু সেইসব ডাক্তাররা পাবেন যারা নিজের কথা, নিজের পরিবারের কথা চিন্তা না করে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে করোনা নেই, কিন্তু করোনার ভয় বুকে নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সন্দেহজনক রোগীদের কাছে যাচ্ছেন। বা যে আঙ্গুলে গোনা অল্প কিছু রোগী আছে তাদের দেখভাল করছেন। যারা পরিবার রেখে দূর মফস্বলের হসপিটালে পড়ে আছেন। ডিউটি করছেন। বাড়ি ফিরতে পারবেন না আরও কত কতদিন, জানেন না।
তাদের শুধু হাততালি না। বিশেষ পুরষ্কারের ঘোষণা দেয়া উচিত।

জানি এসব লেখার সময় এখন নয়।
এখন তো কোন পেশা কতো গুরুত্বপূর্ণ আর কোন পেশার লোক মানুষের জন্য বেশি কাজ করে সেসব হিসেবেরও সময় নয়।
তবে কেন ডাক্তার, ব্যাংকার, সাংবাদিকরা তর্কে লিপ্ত হচ্ছেন?

আমরাই বা কেন আমাদের স্বজনের মৃত্যুর চেয়ে কূটতর্ক আর কুতর্ককে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি?

সবাই মিলে আসেন প্রশ্ন করি, টপ টু বটম সবার বক্তব্যনুযায়ী দেশে পর্যাপ্ত পিপিই থাকার পরও ডাক্তারদের কীসের এতো ভয়? কেন তারা হাত পর্যন্ত লাগাচ্ছেন না রোগীকে? এই কি সেবা? এই কি পেশাগত দায়িত্ব? রোগী কেন ফিরিয়ে দিচ্ছে হসপিটালগুলো? রোগীকে সেবা দিলে বা করোনা সনাক্ত হলে কার এতো লোকসান যে অনলাইনে সক্রিয় একটা চক্র সচেতন মহলকে বারবার বলে যাচ্ছে, রোগী কেন মরে না এই নিয়েই নাকি তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত! কেউ স্বচ্ছতা দেখতে চাইলেই কেন তারা আঁতকে উঠছে, ‘লাশ দেখতে চায়’- বলে?

সুনাগরিক বলেই আমিও প্রশ্ন করে গেলাম, টাকা হাতে নিয়েও চিকিৎসা না পেয়ে হসপিটালের দ্বারে দ্বারে কেন ঘুরতে হচ্ছে মানুষকে? মানুষ একজনও যদি মরে, এর দায় কে নেবে? কেই বা নিয়েছে কোনদিন!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.