করোনা: শ্রমজীবী নারীর জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘা

সোমা দত্ত:

সারা পৃথিবীর মানুষ এক ক্রান্তিলগ্ন পার করছে। এতো বড় সংকট এর আগে কোন জাতি দেখেছে কিনা জানা নেই। ছোটবেলায় গল্প শুনেছি- ওলাউডার বাতাস বা শীতলা দেবীর আগমনের কথা। লোকে বলতো, শীতলা বিবি কাউকে ক্ষমা করে না। কলেরা বা গুটি বসন্তের প্রাদুর্ভাবে কী করে গ্রামের পর গ্রাম মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল, সে গল্প আমাদের অনেকের জানা। কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তা সামাল দিতে বিশ্বজুড়ে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। প্রচার অপপ্রচার দুই-ই সমান বেগে ছুটছে। তবে একটা খবরে বারবার দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে। করোনার করুণায় বাড়ছে নারীর প্রতি সহিংসতা।

আজ একটি খবরে দেখলাম করোনা পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের মতো দেশে শতকরা ৩০ ভাগ বেড়েছে নারী নির্যাতন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, করোনার কারণে চীনের কোথাও কোথাও পারিবারিক নির্যাতনের হার আগের চেয়ে তিনগুণ বেড়েছে।

একই প্রবণতা দেখা গেছে জার্মানি, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে বিশ্বে প্রায় ৭০ ভাগ নারী স্বাস্থ্য ও সামাজিক কর্মী হিসেবে নিয়োজিত। যারা সম্মুখভাগের যোদ্ধা হিসেবে বিরাট ভূমিকা পালন করছে, তারাও আজ ঝুঁকিতে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহ তথা বাংলাদেশও বাইরে নয়।

কীভাবে? বলা বাহুল্য, বিশ্বব্যাপী লকডাউনের মতো এদেশেও লকডাউন চলছে। সবার গৃহবন্দী জীবন। যেহেতু নারীকেই গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজের দায়িত্ব নিতে হয়, বেড়েছে সেই কাজের চাপ। বাচ্চাদের স্কুল কলেজ ছুটি। তাদেরকে দেখাশোনা করা, সময়মতো খাবার ব্যবস্থা করা তো আছেই। উপরন্তু বাসার পুরুষ সদস্যটি থাকছে ঘরে। যে কিনা মোড়ের দোকানে বা বন্ধুদের সাথে চায়ের কাপে চুমুক আর আড্ডায ঝড় তুলতো তাকেও দিতে হচ্ছে সঙ্গ অথবা বারবার চা কফির জোগান।

কেউবা আবার একটু বেশিই করোনা সচেতন। ঘরদোর পরিষ্কার রাখতে হুকুম দিচ্ছেন বারবার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, করবেটা কে? হ্যাঁ বেশির ভাগ ঘরে এ কাজটিও নারীকে সামলাতে হচ্ছে। কেননা আমরা তো ইতোমধ্যে করোনার কম্যুনিটি সংক্রমণের ভয়ে সহায়তাকারী খালা বা বুয়া পরিচয়ে পরিচিতদের বাড়িতে আসা বন্ধ করেছি। তাঁকে ছুটি দেবার আগে এটাও ভাবিনি সারাদিন যার নুন আনতে পান্তা ফুরোয় তিনি কী খাবেন। তাঁর সন্তানদের মুখে দু’বেলা কী তুলে দেবেন? এ প্রশ্নে হয়তো অনেকেই তেড়ে আসবেন। কেন আমরা তো বেতন দিয়েই ছুটি দিয়েছি। কিন্ত কতদিনের, ক’মাসের বেতন দিতে পেরেছি। আমাদের সবার সামর্থ্যও কী এক!

আমরা কেউ কেউ নারীর গৃহস্থালি বা সেবামূলক কাজের অর্থমূল্য ও স্বীকৃতি দাবি করছি। চাতাল শ্রমিক রহিমার মতে, ‘এতে কী লাভ হবে? আমার স্বামীর তো কোন ক্ষ্যামতা নাই। তার’চে সে যদি ঘরের কামরে নিজের মনে করে আমার সাথে হাত লাগায় তাইলে তো দুইজনের শরীরড্যাই আরাম পায়। সংসারে ঝগড়াঝাঁটি কমে’।

একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজের সুবাদে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খবর আসে আমাদের কাছে। বা উল্টো করে বললে খবর নিতে হয় আমাদের। আজ একটি ফোন এলো। অপর প্রান্ত থেকে জানালো তাদের এলাকা ঝিনাইদহে নারী নির্যাতন বেড়েছে। আবারও একই প্রশ্ন কীভাবে? তিনি জানালেন, স্বামীটি ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে কাজ করতো। করোনার কারণে তার কারখানায় ছুটি হয়েছে। তাই গ্রামে এসেছেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন নতুন বউ। যা এতোদিন লুকানো ছিল দূরত্বের আড়ালে। শুরু হয়ে যায় পারিবারিক কলহ আর মারপিট। ফলাফল যা হবার তাই। গায়ে জখম নিয়ে আাগের পক্ষের বউকে বাড়ি থেকে বিতাড়ন। আমার সংবাদদাতা অবশ্য থানায় যোগাযোগ করবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই সময়ে কর্তৃপক্ষ মহাব্যস্ত করোনা মহাযজ্ঞ সামাল দিতে।

এবার আসি একটু অন্য প্রসঙ্গে। মাহবুবা কাজ করেন একটি বেসরকারি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে। তার প্রতিষ্ঠানে ঘোষণা এসেছে বাসার বসে অফিস করবার। আমাদের দেশে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে কাজে ঢোকার সময় আছে বের হবার নেই। ফলে এ আদেশ তার জন্য কতোটা আতঙ্কের তা সহজেই অনুমানযোগ্য।

তেমনি আরেকজন মেরিনা। তিনি একজন উন্নয়ন কর্মী। তাঁর স্বামী সরকারি কলেজের শিক্ষক। বর্তমান লকডাউন পরিস্থিতিতে তার অফুরন্ত অবসর। কখনও টিভিতে দেশ-বিদেশের খবর নিচ্ছেন। কখনও বা ইন্টারনেট ঘেঁটে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। মেরিনার প্রতিষ্ঠান সরকারি ছুটির সময়েও বাসায় বসে অফিস করবার আদেশ দিয়েছে।

এই আদেশের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে মেরিনার দিন শুরু হয় কাক ডাকা ভোরে। বাসার সবাই তখন সুখ নিদ্রায় মগ্ন। একে একে নিতে হয় সারাদিনের প্রস্তুতি। বাসার সকাল দুপুর বিকাল রাত সব বেলার খাবারের চাহিদাসহ সবকিছু যে তাকেই সামাল দিতে হবে। করোনার ভয়ে তো অনলাইনে শর্টকাট মারারও সুযোগ নেই। অনেকদিন আগে দেখা বিবেক চরিত্রটির কথা মনে পড়ে যায় মেরিনার। আর ভাবে, অফিস অ্যাট হোম নারীর জন্য বাড়তি বোঝা বা মরার উপর খাঁড়ার ঘা নয় কি?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.