কোয়ারেন্টাইন: কঠিন, তবে অসম্ভব নয়

জেবুন্নেছা জোৎস্না:

ঠিক এক সপ্তাহ আগে আমার মেয়েটি দু-দিনের জ্বর, গলা আর প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে বিংহ্যামটন ইউনিভার্সিটির ডর্ম থেকে বান্ধবীর সাথে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো, আমার পায়ের নিচে পৃথিবী তখন টলমল করছে, তবু নিজেকে শক্ত করে ওকে আর ওর বান্ধবীকে মাস্ক আর গ্লভস দিলাম পরতে, এছাড়া ও নিজেও বার বার করে বলে দিয়েছে যে ওর সামনে যেন আমরা মাস্ক আর গ্লভস ছাড়া না যাই। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত সে তার ঘরে কঠোরভাবে সেলফ কোয়ারেন্টাইন মেইনটেন করে চলেছে। তার দৃঢ় ধারণা তার মধ্যে করোনা’র লক্ষণ আছে এবং আমাদের কারও মধ্যে সে ছড়াতে দিবে না; ঠিক ততখানি তার বাবার ধারণা তার মেয়ের কিছু হয়নি, কেবল ঠাণ্ডা থেকে গলায় ইনফেকশন হয়েছে; সে দুঃখ পেলেও তাকে মেয়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য আমাকে আরও কঠোর হতে হয়েছে পুরো পরিবারের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে। আর সেই মুহূর্তে আমি তীব্রভাবে অনুভব করেছি সেইসব পরিবারের গভীর বেদনা, যারা আপন জনের মৃত্যুকালে কাছে থাকতে পারিনি, মাথায় হাত দিয়ে সান্ত্বনায় প্রশমিত করতে পারিনি ভয়ানক মাথার যন্ত্রণা, অথবা উত্তপ্ত শরীরে দিতে পারেনি একটু জল-পট্টি.. কী ভয়ানক এক পারিবারিক পৃথকীকরণের সংগ্রাম… সব থেকেও কোথাও কেউ নেই!

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে কোয়ারেন্টাইন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

এখন পর্যন্ত যেহেতু এ রোগের সুনিশ্চিত কোন ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি, তাই কোয়ারেন্টাইনই এর থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। অসুস্থতার শুরুতেই ইমার্জেন্সিতে যেয়ে নিজেকে আরও গুরুতর অবস্থায় নিয়ে যাবার চাইতে, ভিডিও কলে ডাক্তারের সাথে কথা বলা, এবং তার নির্দেশ মতো চলাই এখন উত্তম। তবে কারও অসুস্থতা যদি আটদিনের মধ্যে উন্নতি না হয়, তাকে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। পৃথিবী বিস্তৃত এ মহামারি’র সময়ে আমরা আপনজনের বিছানার পাশে সত্যি থাকতে পারবো না, কিন্তু একটু দূরত্ব বজায় রেখে তাদের এবং পরিবারের অনান্য সদস্যদের যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে নিশ্চয় আমরা এ দুঃসময় কাটিয়ে উঠবো। নিজেকে, আপনজনকে আর পৃথিবীকে বাঁচাতে আমাদের সামনে এখন কেবল একটি পথই খোলা আছে, কোয়ারেন্টাইন।

এই মুহূর্তে কারও ঠাণ্ডা লাগলেই আমরা ধরে নিচ্ছি যে তার করোনা হয়েছে; আমার মেয়ের কোনো টেস্ট করিনি; আশার কথা যে তার তেমন কাশি অথবা স্নিজিং ছিল না, যেটা করোনা রোগীদের প্রধান লক্ষণ। তবু আমি সবরকম সাবধানতা অবলম্বন করেছি এবং এ সাবধানতা অবলম্বন করতে গিয়ে বুঝেছি কোয়ারেন্টাইন অতো সহজ নয়, তবু পরিবারের সকলের সুস্থতার জন্য এর বিকল্পও কিছু নেই, এবং যথাযথভাবে পালন করাও সম্ভব।

মেয়েটি বাসায় আসার আগেই আমি ওর রুমে ওর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পানির বোতল, পেপার টাওয়েল, গ্লভস, ট্রাসক্যানসহ নিত্য ব্যবহার্য জিনিস গুছিয়ে রাখি। আমাদের যেহেতু একটি বাথরুম, তাই ও বাথরুম ব্যবহার করার সময় গ্লভস এবং পেপার টাওয়েল সহকারে ডোর এবং ট্যাপ ঘুরাতো; এবং সতর্কতাস্বরূপ ও বাথরুম থেকে বেরোনোর পর লাইটের সুইচ হতে দরজা, ট্যাপের হ্যান্ডেলসহ পুরো বাথরুম ক্লিন করেছি প্রতিবার; সবাইকে আলাদা স্যান্ডেল দিয়েছি ঘরে এবং বার বার হাত ধুয়েছি ওকে খাবার দিতে রুমের দরজা ওপেন করার সময় এবং ন্যাপকিন দিয়ে ওর ব্যবহার্য ডিশ নেবার সময়। যখন ওর রুমে ঢুকতাম, ও নিজেকে ব্লান্কেটের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতো, তাই আজ এতোদিন মেয়েটার মুখও দেখতে পাইনি! ওর ডাক্তার ওকে যেতে বলেছে, কিন্তু শরীর অনেক দুর্বল হওয়াতে এবং ডাক্তার আর অন্যদের মাঝে ভাইরাস ছড়াবে না বিধায় সে যেতে চায় না। একটু শ্বাসকষ্ট হওয়ায় সে ইমার্জেন্সিতে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, তার ডাক্তার তার সাথে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলে এবং তাকে সেখানে যেতে নিষেধ করে কারণ ওখানে গেলে সে আরও অসুস্থ হয়ে যাবে, আর ওর অবস্থা এতোটা সিরিয়াস নয়, যতোটা মানসিকভাবে সে ভেঙ্গে পড়েছে। ডাক্তার তাকে টায়ানল, এলার্জির ঔষধ লরাটেডেন, নাসাল স্প্রে, ইলেকট্রোলাইজ ড্রিন্ক এবং হিউমিডিটি ফায়ার ব্যবহার সাজেস্ট করে। আর আমি একটু চাল-ডাল, মুরগির মাংস আদা সহকারে সেলারি-টমেটো সেদ্ধ করে লিকুইড স্যুপ করে দিয়েছি যখন ও কিছুই খেতে পারছিল না প্রচণ্ড গলা ব্যথায়।

আজ আট দিনের সকালে মেয়ে জানালো, তার আজ জ্বর, গলা ব্যথা আর মাথায় যন্ত্রণা নেই; মেয়ের বাবা যে এক মুহূর্তের জন্য যে ভাবেনি যে তার মেয়ের থ্রট ইনফেকশন ছাড়া অন্য কিছু হয়নি, সারা মুখে বিজয়ের প্রশস্ত হাসি ছড়িয়ে বললো, ‘আমি জানি, আমার মেয়ের কিছু হয়নি’।

নিউইয়র্ক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.