কোভিড-১৯: বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা, ঝুঁকিতে নারী

নাসরীন রহমান:

হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে করোনা ভাইরাস এখন আর শুধু বৈশ্বিক মহামারী হয়েই থাকেনি, বরং তা প্রভাব ফেলছে মানুষের সামাজিক, পারিবারিক, দাম্পত্য জীবনেও।

করোনা ভাইরাসের কারণে গৃহবন্দী থাকতে হচ্ছে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষকে; একটানা গৃহবন্দী জীবন, আর্থিক ক্ষতি, কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা মানুষকে মুখোমুখি করছে এক গভীর মানসিক সংকটের সাথে, ফলে তার প্রভাব পড়ছে জীবনে।

এএফপি’র এক প্রতিবেদনে আশংকা করা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের কারণে ঘরে থাকা মানুষের পারিবারিক জীবনে সহিংসতা বাড়তে পারে।

বার্লিন, প্যারিস, মাদ্রিদ, রোম ও ব্রাতিস্লাভায় যে সংস্থাগুলো পারিবারিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা দিয়ে থাকে, তারাই এই শঙ্কার কথা জানিয়েছে। বহু মানুষের জন্য তাদের বাড়ি আর নিরাপদ নয়, এই মন্তব্য করেছে জার্মান ফেডারেল এসোসিয়েশন অব উইমেনস কাউন্সেলিং ও।

বাস্তবিক গত ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে শুরু হওয়া কোভিড ১৯ আজ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মানুষের জীবন যাপনের ধরন উলটপালট করে দিয়েছে।

একদিকে গৃহবন্দী দশা অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতি! কর্মসংস্থান হারানোর আশংকায় আছেন অনেক মানুষ। বিনোদনের অভাব, বাইরে বেরুতে না পারার মানসিক চাপ, বাড়তি খরচ সব মিলে মানুষ দিশেহারা। এটা নিশ্চিতভাবে কেউই জানেন না এই বন্দীদশা কতদিন স্থায়ী হবে।

অনিশ্চয়তা, হতাশা, একঘেয়ে জীবন মানুষকে কর্তৃত্বপরায়ণ, খিটখিটে, উগ্রমেজাজী করে তুলছে। ফলশ্রুতিতে তাদের আচরণ হয়ে উঠছে মারমুখী, আগ্রাসী! এবং যেহেতু তারা ঘরেই অবস্থান করছে সেহেতু তাদের এই উগ্রআচরণের শিকার হতে হবে তখন পরিবারের সদস্যরা তথা নারী ও শিশুদেরই।

ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চীনে করোনা আক্রান্তের সময়গুলোতে পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছিল উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। স্পেনে ৩৫ বছর বয়সী দুই সন্তানের এক মাকে খুন করেছেন তার সঙ্গী।

তুরস্কের নারী সংগঠনগুলোর ফেডারেশনের মুখপাত্র কানান গুলু বলেন, নারীরা আমাদের জানাচ্ছেন যে তারা ঘরে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তারা জানতে চাইছেন, এ পরিস্থিতিতে আমরা কোথায় যেতে পারি?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি আমরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করি তবে দেখবো এখানে পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা যেহেতু ঊর্ধ্বমুখী, সেহেতু এখানে ঝুঁকি আরও বেশি।
যেহেতু শ্রেণীগতভাবে বাংলাদেশে নারী অধস্তন শ্রেণী, তাই কোভিড-১৯ এর সংক্রমনের সময় বাংলাদেশে নারী ডমিস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হবেন না, এই আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বরং আগে যারা বা যেসব নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হতেন, তারা এখন আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকবেন। কারণ তাদের নির্যাতকেরা এখন আরও বেশি গৃহে অবস্থান করছেন, বা নির্যাতিতা নারী বা শিশু বাইরে বেরুতে পারছেন না প্রতিকারের আশায়।

অবস্থা এমনও হতে পারে যারা আগে সুন্দর পারিবারিক জীবন যাপন করেছেন, কোন পারিবারিক, দাম্পত্য অশান্তি যেখানে ছিল না, সেখানেও নতুন করে পারিবারিক, দাম্পত্য অশান্তি, সহিংসতা ঘটে যেতে পারে। যেহেতু সময়টাই অস্থির, বিষন্নতায় ভরা।

তাই কোভিড-১৯ এর আক্রমণ ও প্রতিরোধের সাথে সাথে গুরুত্ব দিতে হবে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধের দিকেও।

মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে এই সংকট একদিন দূর হবে, ততদিন এই গৃহবন্দী দশা মেনে নেওয়াই শ্রেয়।

না হয় মনোবিজ্ঞানী অ্যাড্রিয়ানা হাভসোভার ভবিষ্যৎ বাণীই সত্য হয়ে যাবে।

যেমনটা তিনি বলেছেন, এই লকডাউন যদি কয়েকমাস ধরে চলতে থাকে তবে পারিবারিক সহিংসতা যে কতগুণ বাড়বে তা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.