সেব্রিনা ফ্লোরার শাড়ি ও পিতৃতান্ত্রিক চেতনার গুপ্ত ছোবল

স্নিগ্ধা রেজওয়ানা:

কখনো ভাবিনি সমগ্র বিশ্ব যেখানে করোনা আতঙ্কে আতঙ্কিত, ভীত, দিশেহারা, সে সময়ে বসে এরকম একটি বিষয় নিয়ে আমাকে লিখতে হবে। যে বিষয় নিয়ে লিখছি, সেটি এই সময় আমার লেখার আগ্রহ একেবারেই নয়, নিতান্ত বাধ্য হয়ে লিখতে হচ্ছে। আমাকে লিখতে হচ্ছে বাংলাদেশের তথাকথিত শিক্ষিত অবিবেচক, নির্বোধ মানুষদের জন্য। আমাকে লিখতে হচ্ছে, একজন নারী হিসেবে অপর একজন নারীর আত্মসম্মানকে রক্ষার স্বার্থে। আমাকে লিখতে হচ্ছে ইনিসস্টিউট অফ এপিডেমোলোজি ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ বা আইইডিসিআর এর পরিচালক প্রফেসর ড.মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার শাড়ি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের বিরুদ্ধাচারণ করতে।

বিভিন্ন পত্রিকা সূত্রে জেনেছি, ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ঢাকা মেডিকেল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এমবিবিএস পাশ করার পরে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন কাজ করেছিলেন। পরে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, যেটাকে এখন সবাই ‘নিপসম’ নামে চেনে- সেখান থেকে রোগতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করে তিন বছর গবেষণা করেছেন। তিনি নিপসমে সহকারী অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন দেশের বাইরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়েছেন পিএইচডি ডিগ্রি।জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময়টায় তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ২০১৭ সালে চিকুনগুনিয়ায় যখন ছেয়ে গিয়েছিল ঢাকা শহর, তখনও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।

স্নিগ্ধা রেজওয়ানা

প্রথমেই বলে রাখি আমি কোনভাবেই আমি উনার সাথে সম্পৃক্ত নই, আমি উনাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না বা জানি না। তবে যেটি জানি, সেটা হলো তিনি যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন, উচ্চশিক্ষিত একজন নারী, যিনি দেশের অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বলে রাখা ভালো, উনার দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে বা উনি যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করছেন কি করছেন না সেটি বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করছি না।

আমার আগ্রহ, কীভাবে তার মতো প্রতিভাবান যোগ্যতাসম্পন্ন একজন নারীকে, তার যোগ্যতাকে অবমাননা করার জন্য পিতৃতান্ত্রিক ডিসকোর্স এর নেপথ্যে কাজ করে, কিছু কৌশল নির্মাণের মধ্য দিয়ে কীভাবে একজন যোগ্যতাসম্পন্ন নারীর যোগ্যতাকে অবজ্ঞাসূচক প্রোপাগান্ডায় নির্মাণ করা হয়, এবং একটি হেজিমনাজিড চর্চার মধ্য কীভাবে পিতৃতান্ত্রিক বৈষম্যমূলক ডিসকোর্স চর্চার বৈধতা দান করা হয়।

এ বিষয়টি আমাকে খুব বেশি নাড়া দেয় যখন আমি আমার ফেসবুকের ওয়ালে তথাকথিত শিক্ষিত দুই নারী সহপাঠীকে ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক দুটি পোস্ট করতে দেখি, যেখানে ২১ দিনে না ২২ দিনে উনি কীভাবে ২২টি শাড়ি পডরেছেন, উনি কোথা থেকে এতো শাড়ি পান, উনার চুল কেন কালো, ইত্যাদি নানা ফালতু বিষয় নিয়ে পোস্ট করা হয়।

ব্যক্তিগত পরিসরে যখন আমি তার বিরোধিতা করি, প্রত্যুত্তরে আমার দুই সহপাঠী উত্তর দেন, এটি শুধু ফান অথবা মজা, এবং পুনরায় ব্যাপক উদ্যমে এই ব্যঙ্গাত্মক চর্চাটি চলাতে থাকে। সেসময় আমি আরো লক্ষ্য করি, করোনা বিষয়ে সেব্রিনা ফ্লোরা যখনই প্রেসব্রিফিংয়ে আসেন, শুধু আমার সহপাঠী নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকরা সেব্রিনার কয়টি শাড়ি আছে, তিনি এতো শাড়ি কেনার টাকা কই পান, এতো ভিন্ন ভিন্ন শাড়ি উনি কেন পরেন, প্রতিদিন নতুন নতুন শাড়ি পরার কী প্রয়োজন ইত্যাদি নানা তাচ্ছিল্যমূলক ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে থাকেন।

এখন আসি কীভাবে এই সকল তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য একজন যোগ্যতাসম্পন্ন নারীর যোগ্যতাকে খাটো করে দেয় এবং পিতৃতান্ত্রিক ডিসকোর্স যে নারীকে কেবলমাত্র তার পোশাক, অবয়ব অথবা শরীরসর্বস্বতার মধ্য দিয়ে দেখার যে নিরন্তর প্রচেষ্টা সেটিই পুনঃস্থাপন করে।

ধরুন, মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা যদি এক্ষেত্রে একজন নারী না হয়ে একজন পুরুষ হতেন এবং উনি একজন পুরুষ হয়ে যদি প্রতিদিন নিত্যনতুন পোশাক পরে আসতেন, তাহলে কি তাকে নিয়ে প্রশ্ন করা হতো, উনি প্রতিদিন নিত্যনতুন শার্ট কেন পরেন? এতো শার্ট কেনার টাকা উনি কোথায় পান?

উত্তরটি হবে, নিশ্চয়ই না। কারণ একজন পুরুষ কী শার্ট পরেছেন কী পরেননি, সেটি আমাদের নজরেরই বিষয় না, কিন্তু একজন নারী কী পোশাকে আপনার সামনে আসছেন সেটি আপনার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আপনার পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ চিন্তা-চেতনা আপনাকে এমনভাবে নির্মাণ করেছে যে আপনি একজন নারীকে কেবলই দেখতে চান তার উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে।

অর্থাৎ একজন নারীকে আমরা এমন ভাবেই দেখতে চাই যেভাবে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শের চোখ দেখাতে শিখিয়েছে। নারী আপনার এবং আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে বিবেচিত হয় তার পরিবেশন, বেশন ও ভূষণ এর মধ্য দিয়ে। সেক্ষেত্রে যখনই আপনি তার পোশাক নিয়ে বা তার পরিবেশনের দিকে আপনি মনোযোগ দিবেন, খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই নারী যোগ্যতার প্রসঙ্গটি এই সকল পোশাক ভূষণের চাপে হারিয়ে যাবে, সেই ব্যক্তিটি কে পুনরায় একজন পিতৃতন্ত্রের চোখে নির্মিত নারীকে পুনরুৎপাদিত করবে। পিতৃতন্ত্র যে চোখ, কেবলমাত্র নারীকে পোশাক, দেহ ও যৌনতা সর্বস্ব পণ্য হিসেবে পণ্য হিসেবে নির্মাণ করে সেটি পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হতে উৎসাহিত করবে।

তাই দয়া করে যে বা যারা নারী-পুরুষ সাম্যতায় বিশ্বাসী তারা সেব্রিনা ফ্লোরার শাড়ি নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে যে সকল শিক্ষিত নারী উনার শাড়ি নিয়ে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করছেন, মনের অজান্তে পিতৃতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য অংশগ্রহণ করছেন, তাদের কাছে সবিনয় অনুরোধ করবো নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে, নিজের সম্মান মর্যাদা এবং যোগ্যতাকে যোগ্য সম্মান দিয়ে এই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থে এই ধরনের বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য থেকে বিরত থাকুন। সাবধানে থাকুন, ভালো থাকুন। এই সময়ে সকলে মিলে ভালো থাকাটা জরুরি।

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা
পিএইচডি ফেলো, অকল্যান্ড ইউনিভারসিটি অফ টেকনোলজি,
নিউজিল্যান্ড।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.