‘করোনা’ আতঙ্কের সময়ে নারীর প্রতি বৈষম্য করো না

রেজভিনা পারভীন:

করোনা আতংকে সারা বিশ্বের মানুষ এখন গৃহবন্দী, সেইসাথে আমাদের দেশের মানুষও গৃহবন্দী। হতে পারে মানুষ সতর্ক হয়েছে অথবা সেনাবাহিনীর ভয়ে ঘরে ঢুকেছে। ‘করোনা’ অনেকটা নিরপেক্ষভাবে জাতি- ধর্ম, ধনী- গরীব, নারী -পুরুষ, বৃদ্ধ -শিশু নির্বিশেষে তার আাঘাত হানছে।

‘করোনা’ আতংকে সবার মধ্যে কিছু কমন আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে; সব ধর্মের মানুষ ধর্ম-কর্ম করছে, মানুষের প্রতি কিছুটা হলেও মানবিক আচরণ করার চেষ্টা করছে। সেই মানবতাবোধটুকু ঘরের কাজে কতোটা সংক্রমিত হয়েছে, সেটাই দেখার বিষয়।

সবাই ঘরে অবস্থান করছে, খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ঘরে মজুদ করছে, সবাই ফোন, ম্যাসেঞ্জার, ভিডিও কল, হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক ইত্যাদি মাধ্যম ব্যবহার করে সবার খবর নিচ্ছে। সবার মধ্যে মৃত্যু ভয় ঢুকে গেছে। সবাই বলতে শুরু করেছে যদি বেঁচে থাকি তবে এটা করবো ওটা করবো, মোট কথা পুরো পৃথিবীর মানুষ টক অদৃশ্য শক্তির ভয়ে পরাজয় স্বীকার করে সব ভালো ভালো আচরণ ও অভ্যাস চর্চা করা শুরু করেছে।

এই পরিস্থিতিতে এখন বেশির ভাগ বাসায় গৃহকর্মে সহায়তাকারী বা ‘বুয়া’কে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। এটা একদিকে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই, যাতে করে বাইরে থেকে আসা লোকের সংস্পর্শে ভাইরাসটি ছড়াতে না পারে। কিন্তু এর ফলে একটা সংকট তৈরি হয়েছে অবশ্যম্ভাবীভাবে। এবং এই সংকট কিন্তু কোনো ছোট খাটো সংকট নয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই সংকটে কে কে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে? একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন চাপটা কার উপর পড়ছে, আপনার আমার সবার ঘরে এই চাপের শিকার হচ্ছে গৃহকর্ত্রী ও বাসার অন্য নারী সদস্যরা। তাকে এখন ডাবল-ত্রিপল খাটুনি খাটতে হচ্ছে।

যে নারী বাইরে উপার্জনে বের হয় না তাকে সবসময় শুনতে হয়, পুরুষ লোকটা কতো পরিশ্রম করে উপার্জন করে, তাই নারীকে গৃহের সমস্ত যজ্ঞ সামলাতে হবে। আর সেটা করতে গিয়ে বছরে কোনরকম ছুটি ছাড়াই সেই নারী একটানা কাজ করে যায়, এবং তার এই কাজের কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করে দেয় না কেউ। বিনা পারিশ্রমিকের কাজ হচ্ছে এই ঘরকন্যা। অন্যদিকে যে নারী কর্মজীবী, তাকে  বাইরের অফিস শেষ করে রাস্তার জ্যামঝক্কি সব পেরিয়ে কোনরকমে বাসায় ফিরেই ঢুকে যেতে হয় পুরো সংসারের কাজে, স্বামী, সন্তান এবং পরিবারে আরও সদস্য থাকলে তাদের সামলাতে। আবার পরদিনের জন্য তৈরি হওয়া। এটা নিত্যদিনের রুটিন।

এখন এই করোনা সংক্রমণের সময়ে সবাই যখন বাধ্যতামূলক ছুটি পেয়েছে, তখন পরিবারের নারী সদস্যটিও কি একইরকম অলস ছুটি ভোগ করতে পারছেন? নাকি তার ওপর তৈরি হয়েছে আরও বিশাল চাপ। একদিকে পরিবারের সদস্যরা এখন সবাই বাসায়, তার ওপর হেল্পিং হ্যান্ডও ছুটিতে, সেই সময়ে বাসার সবার চাহিদা মেটাতে গিয়ে নারী সদস্যটি আসলে কী করছেন, একবারও ভেবেছেন কেউ?

তাহলে আসুন না যেভাবে ‘করোনা’ আতংকে ধর্মকর্মসহ অনেকগুলো ভালো অভ্যাস গড়ে তুলেছেন, তেমনি গৃহকর্মের পুরোটা চাপ নারীর উপর চাপিয়ে না দিয়ে নিজেরাও একটু অংশগ্রহণ করুন। দেখবেন দিনশেষে নিজেরও ভালো লাগছে, সংসারের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করার আনন্দ অবশ্যই পাবেন, আমি নিশ্চিত।

কারণ সারাদিন ঘরের অন্যান্য সব কাজের সাথে ধোয়াধুয়ির বাড়তি চাপ পড়েছে যার ওপর, তাতে যেকোনো সময় নারী সদস্যটি ঠাণ্ডা কাশিতে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তখন কিন্তু হিতে বিপরীতই হবে। গৃহের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তাই এখন কাম্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে। আসুন সংকটকালীন মুহূর্তে আমরা শত শত বছর ধরে যে নেতিবাচক চর্চাগুলো করে আসছি তার একটু ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাই। আপনার একটু সদিচ্ছাই এর জন্য যথেষ্ট। ‘করোনা’ আতংকের সময়ে নারীর প্রতি এসব বৈষম্য দূর করারও একটা মোক্ষম সময় সবার জন্য, পুরুষ সদস্যদের তো অবশ্যই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.