করোনা, কোয়ারেন্টাইন- কী করে পাল্টে দিল বিশ্বকে

‘কোয়ারেন্টাইন’ পুরানো শব্দ হলেও একবিংশ শতকে এটা শ্রেণী বর্ণ গোত্র জেন্ডার নির্বিশেষে পরিচিতি পেয়েছে। কারও কাছে এটা কোরেন্টিন, করান্টিন বা কেরান্টিন। মানুষ বোঝে, মানুষ মানে না। মানুষ শোনে, কিন্তু সে শোনায় পেট চলে না অনেকের।

চীন থেকে ইতালি, ইতালি থেকে স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স, আমেরিকা মিলিয়ে ১৯৯ টি দেশ জেনে গেছে যে পৃথিবী বদলাতে শুরু করেছে। অনেকে সত্যি সত্যি বিশ্বাস করছে, ক’জন অলৌকিক শক্তির কাছে সঁপে দিয়েছে নিজের জানমাল। আমরা কেউ জানি না আগামী ছয় মাস থেকে এক বছর পর কী হতে চলেছে। কী হবে আমাদের জীবনাচরণ, কী হবে বৈশ্বিক রাজনীতি, কী হবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চেইনসিস্টেম, কী হবে আগামীকাল জন্মানো শিশুটির।

পরিসংখ্যানিক হাইপোথিসিস দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে অবশ্য, অনেকের কাছে তা অবিশ্বাস্য। অনেকে পরিস্থিতি যাই ঘটুক না কেনো, সবসময় অদৃষ্টের প্রতি বিশ্বাস রাখতে চায়। যাকে দেখা যায় না, যে কথা বলে না তার কাছে কিছু সঁপে দিলে একটা শান্তি আছে, ফল মিললো কী না মিললো তা নিয়ে চিন্তাভাবিনা নেই, অদৃষ্টের ঘাড়েই গুঁজে দেয়া যায় নির্বিঘ্নে। নিয়তি, কপাল, লাক সবই সেই অদৃষ্টের লীলাখেলা!

কোয়ারেন্টাইন জীবন একেকজনের কাছে একেকরকম অর্থ নিয়ে এসেছে। কেউ ঘরে থেকে আরামে দিনযাপন করছেন, কেউ নিজে নিরাপদ থেকেও প্যানিকড হচ্ছেন অন্যের কথা ভেবে, কেউ সমালোচনা করছেন সরকার থেকে বিশ্বব্যবস্থার, কেউ দেবীর পায়ে লুটিয়ে খুঁজছেন সমাধান, আবার কেউ চোখ বুঁজে নিরানব্বই দানার তসবিহতে খুঁজে চলেছেন নিশ্চুপ সৃষ্টিকর্তাকে।

যে যাই করুক, সবাই শান্তিই চাইছে, বাঁচতে চাইছে, স্বাধীনতা চাইছে। আর চাইছে কোয়ারেন্টাইন থেকে মুক্তি। দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকার সূত্রমতে, কোয়ারেন্টাইনের দিনলিপিতে যোগ হচ্ছে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের মাত্রা। যে নারী বা শিশুটি ঘরে নির্যাতনের শিকার হত নির্দিষ্ট সময়ে, সেই নির্যাতকের কাজ গেছে কমে, হাতে এসেছে অবারিত সময়, তাকে থাকতে হচ্ছে ঘরেই এবং সে তার শক্তিমত্তা বাড়িয়ে আরো দানব হয়ে উঠছে। এও চোখের সামনে উঠে আসছে যে, কোয়ারেন্টাইন শুধুমাত্র তাদের জন্য যাদের খাদ্যের যোগান আছে, আছে মৌলিক অধিকারের নিরাপত্তা। যার নেই, তার কিছুই নেই। ঘরের ভেতরে আটকে থাকলে ক্ষুদা খুন করবে তাদের, ঘরের বাইরে অপেক্ষা করছে ক্ষুদ্র দানব ভাইরাস। যেসকল দেশে নাগরিকের নিরাপত্তা নেই, তাদেরকে ভাবতে হচ্ছে নতুন নিয়মে।

উন্নত বিশ্বের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা পাওয়া মানুষটি কি কখনো ভেবেছিলো সবচেয়ে প্রিয়জনের লাশকে পাশের রুমে সিলগালা করে রেখে তার ঘুমোতে হবে? সে কী চিন্তা করেছিলো মানুষের লাশ বহন করবার জন্য মানুষের সংকট তৈরি হবে এ পৃথিবীতে? কেউ কী ভেবেছিলো মানুষে মানুষে দুরত্বের হিসেব হবে ফিট আর মিটারে? সারাজীবন নিরাপদে থাকা স্পেনের বৃদ্ধটি যখন কোন পরিজন ছাড়া, চিকিৎসা ছাড়া মৃত্যুর দিন গুনতে গুনতে শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন, তিনি আদৌ কখনো ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করেছিলেন তাকে চিকিৎসার নাম করে ওল্ডহোমে মরবার জন্য ফেলে রেখে যাবে দেশেরই মানুষ? কেউ আসলে কিছুই চিন্তা করেনি। এ যেনো এক ডিস্টোপিয়া, কখনো মানুষ চায়নি এরকম অবস্থা, কেউ চায় না আসলে।

আগামীতে মানুষের গোপনীয়তা চলে আসবে রাষ্ট্রের হাতের মুঠোয়, কে কখন কোথায় পা ফেলছে কোথায় স্পর্শ করছে, সকল তথ্য উঠে আসবে স্ক্রিনের আলোয়, দেশের সীমানা হবে আরো জোরদার, সীমানায় বসবে কঠোর নিরাপত্তা, রাষ্ট্র যেকোন জরুরী মুহুর্তে কিভাবে অন্যের সাহায্য ছাড়া অন্তত কিছুদিন বেঁচেবর্তে থাকতে পারবে সে নিয়ে হিসেবে বসবে, মানুষের জীবনে স্যানিটাইজেশনের এক নতুন চর্চা তৈরি হবে, জীবনাচরণের প্যাটার্ন বদলে যাবে অনেকের।

আরও অনেককিছু ঘটবে, তবু মানুষ বেঁচে থাকবে। মানুষ বেঁচে থাকুক, তবু একবার ভাবুক এ পৃথিবীর কতটুকু ক্ষতি হয়ে গেছে আর কী কী বাকি আছে। মানুষ ভাবতে শিখুক এ কোয়ারেন্টাইন এক সাময়িক পরীক্ষা। মানুষের ভাবনায় নতুন উদ্যোম আসুক। নতুবা, এ শতাব্দীর কোয়ারেন্টাইন আগামী শতাব্দীতে শেকল হয়ে শরীরে পেঁচিয়ে ধরলে কী হবে?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.