সমস্যা শাড়িতে? নাকি নারীতে?

রোকাইয়া জেরিন:

করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, সে রেশ বাংলাদেশেও পড়েছে খুব ভালো করে। পুরো দেশ থমকে গেছে। করোনা নিয়ে চারিদিকের বিভিন্ন গুজব আর ভুল তথ্য মানুষের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ। যেকোনো তথ্যের জন্য আতঙ্কিত সাধারণ মানুষের আস্থার সরকারিভাবে দেওয়া তথ্য। করোনার প্রকোপ দেশে শনাক্তের আগে থেকেই এ নিয়ে নানা শঙ্কার কথা, এর থেকে বাঁচতে করণীয় এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের কথা প্রতিনিয়ত দেশবাসীর কাছে তুলে ধরছেন একজন নারী, মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। প্রতিদিন টিভি পর্দায় দেখা পরিচিত মুখ এই নারীটি কে?

মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা একজন বাংলাদেশী রোগতত্ত্ববিদ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) দায়িত্বাধীন পরিচালক। তিনি ফাউন্ডেশন ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইন্টার্যোশনাল মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের ফেলো। বর্তমানের করোনা মোকাবেলায় কাজ করা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণার ওপর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করা বিভিন্ন দুর্যোগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এই নারীর এমন কর্মকাণ্ড এই প্রথম নয়। সেব্রিনার তত্ত্বাবধানেই জিকা ভাইরাস প্রতিরোধে সফলতা পায় বাংলাদেশ। জিকা ভাইরাস, চিকুনগুনিয়াসহ বেশ কিছু দুর্যোগে দেশবাসীর কাছে রাষ্ট্রের বার্তা তুলে ধরেছেন তিনি। ইতিমধ্যে তার পরিচিতি ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। এই নারী গণমাধ্যমের মুখোমুখি হচ্ছেন প্রতিদিন এবং একহাতে সবকিছু সামাল দিচ্ছেনও চমৎকারভাবে।

১৯৮৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হোন ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করার পর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তিনি। পরে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) থেকে রোগতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করে তিন বছর গবেষণা করেন। তিনি নিপসমে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণার ওপর। মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ইন্টারন্যাশনাল এসাসিয়েশন অব দ্য ন্যাশনাল পাবলিক হেল্‌থ ইনস্টিটিউটের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

২০১৬ সালে তিনি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মহামারী সৃষ্টিকারী ভাইরাস ও রোগ বিস্তার প্রতিরোধে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গবেষণা করেন। তার তত্ত্বাবাধানে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে জিকা ভাইরাস, মধ্য প্রাচ্যের শ্বাসযন্ত্রের সিন্ড্রোম সম্পর্কিত করোনভাইরাস এবং করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তার দল ২০১৭ সালে বাংলাদেশে চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে কাজ করে।

অথচ এই নারীটিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হতে হচ্ছে বিভিন্ন কটুক্তির ও ট্রোলের।

তিনি লাইভে এসে ব্রিফ করলে এদেশের পুরুষরা কমেন্টে তার পোশাক নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করে। কেউ কেউ বলে তার পর্দা কই? মাথায় হিজাব নেই কেন? বোরকা পরে না কেন? কেউ কেউ তার শাড়ির রঙ নিয়ে প্রশ্ন করে। একেকদিন একেকটা শাড়ি লাগবে কেন? এছাড়াও বিভিন্ন অশালীন, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, গালাগালি তো আছেই।

আচ্ছা একটু ভাবুন তিনি যদি একজন পুরুষ হতেন, কখনোই কি তাকে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো যে, তার দাড়ি, টুপি কই? সে পাঞ্জাবি পরেনি কেন??

তার প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলনে পরে আসা শাড়ি নিয়ে এদেশের মানুষের মাথাব্যথার শেষ নেই। আজ প্রশ্নের কাঠগড়ায় সেব্রিনা ফ্লোরা তার নিত্যনতুন শাড়ির জন্য। কিন্তু যদি ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা প্রতিদিন একটি করে শাড়ি পরেন তাতে সমস্যা কোথায়?

যেখানে একটা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির নারীরও শতাধিক শাড়ি থাকে, আর সেখানে তিনি দেশের প্রথমসারির একজন গবেষক এবং উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তা নারী তার নিজের আয়ে প্রতিদিন নতুন শাড়ি পরতে পারেন না? এসব কথা না হয় বাদই দিলাম করোনা প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতার খাতিরেও তো তাকে প্রতিদিন পরিষ্কার নতুন পোশাক পরতে হতো। দেশবাসীর সামনে ব্রিফিংয়ে আসলে যে কেউই নিজেকে পরিপাটি এবং স্মার্টভাবে প্রেজেন্ট করতে চাইবে। আমি হলেও চাইতাম। উনিও চেয়েছেন। এটাই কি তার দোষ? উনি পুরুষ হলে কি এতকিছু শুনতে এবং সহ্য করতে হতো ওনাকে?
আসলে দোষ কি শাড়িতে? নাকি নারীতে?

(তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া)

শিক্ষার্থী,
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.