নারীর কোনো ভুল হতে নেই …

রুখসানা কাজল:

সাইয়েমা হাসান অন্যায় করেছেন। স্বল্প সময়ের চাকরি জীবনে ক্ষমতা ব্যবহারে ‘ডেকে আনতে বললে ধেরে-বেঁধে’ আনার মতো কাজ করেছেন। অর্জিত ক্ষমতার সাথে লালিত মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে পারেননি। বয়সে একেবারেই নবীন এই কর্মকর্তা যে অন্যায় করেছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে গেছে সামাজিক গণমাধ্যমে। সরকার তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। শাস্তি হয়েছে সাইয়েমা হাসানের। তিনি আপাতত ওএসডি হয়ে আছেন।

যারা সরকারি চাকরি করেন তারা জানেন, চাকরি জীবনে ওএসডি কোন ধরনের শাস্তি। সার্ভিস বুকে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন লাল দাগে। প্রতিটি প্রমোশনের ক্ষেত্রে অই লাল দাগ বার বার মুখ ব্যাদান করবে সাইয়েমা হাসানের ক্যারিয়ারকে। চরম খেসারত দিতে হবে তাকে। আড়ালে আবডালে এখনই তাকে তাকে করোনা রাণী হিসেবে ডাকা হচ্ছে।

অনেকের মতো সাইয়েমা হাসানের শাস্তি আমিও চেয়েছি। দুঃখ পেয়েছি তার অজ্ঞানতাসুলভ ছেলেমানুষি আচরণে। বুনিয়াদি ট্রেনিং এর মর্মার্থ তিনি ধারণ করে রাখতে পারেননি। শুভ বুদ্ধি থাকলে তিনি সেদিন কতগুলো মাস্ক নিয়ে বেরুতে পারতেন। কিম্বা অশিক্ষিত মূর্খ খেটে খাওয়া চাষাভুষাদের বুঝিয়ে শিখিয়ে জানিয়ে দিতে পারতেন করোনা কী। করোনার ভয়াবহতা কতো সাংঘাতিক। দেশ-বিদেশে কত মানুষ মরে যাচ্ছে। কারণ এ অসুখের কোন চিকিৎসা নাই। সে কারণেই সরকার এতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনারা ঘরে থাকুন মুরুব্বি। বলতেও পারতেন, আল্লাহর গজব পড়ছে দুনিয়াতে। আপনারা এখন ঘরে থাকেন। আমরা প্রশাসন থেকে আপনাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছি। তিনি তা করেননি।

রুখসানা কাজল

তবু সমালোচনা করতে গিয়ে বার বার কেন যেন মনে হয়েছে সদ্য ত্রিশ পেরুনো এ কর্মকর্তার নৈতিকতা চ্যুতির পেছনে আমরা কম দায়ী নই! সিনিয়র কর্মকর্তারা ঘুষ, লাম্পট্য সহ নানারকম অন্যায় কাজে খবরের শিরোনাম হয়ে আসছে। তাদের কাছ থেকে কি শিখছে জুনিয়র কর্মকর্তারা? ইশকুল কলেজ ইউনিভার্সিটি জুড়ে এরা দেখেছে অনেক শিক্ষকের নৈতিক অধঃপতন, অন্যায়ের সাথে আপোষ করা। আবার অনেকেই দেখেছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনায়াসে পার পেয়ে যাওয়া।

আমরা যারা মা বাবা তারাও কি সঠিক শিক্ষা দিতে পারছি সন্তানদের? কাজ শেষ ফেসবুকে বুঁদ হয়ে থাকছি। সন্তানদের সামনে যার তার সমালোচনা করছি। অসম্মানের কথা বলছি। এমনকি ক্ষমতাবানরা তাদের সন্তানকে টাকার আদরে বাঁদর করে গড়ে তুলছি। সামাজিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে প্রতিদিন। সেখানে সাইয়েমা হাসানও তো একজন ক্ষমতা বিলাসী মানুষ।
হঠাৎ করা একটি ভুলের মাশুল এখন তাকে গুণতে হচ্ছে উপযুক্ত শাস্তি হিসেবে। পত্রিকায় দেখেছি, এ ছাড়াও সামনে রয়েছে আরও কঠিন শাস্তির নির্দেশনা।

তা সাইয়েমার শাস্তি হোক সেটি তো আমিও চেয়েছি। কিন্তু আমি কে?
সামাজিক গণমাধ্যমে যারা শাস্তি চেয়েছে আমি তাদেরই একজন। তবে কারও কারও শাস্তি চাওয়ার বহর দেখে এখন শিউরে উঠেছি। ঘৃণা পাচ্ছে। গুলিয়ে উঠেছে মন। দু একটি নমুনা দেখেন আপনারা। সাইয়েমা হাসানের বিরুদ্ধে শাস্তি চেয়ে কে কী লিখেছেন তার নমুনা,

‘রাষ্ট্র বা প্রশাসন দৃশ্যমান দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ক্ষমার অযোগ্য এই মহিলাকে বিবস্ত্র করে এলাকায় চক্রাকারে ঘুরিয়ে পিতৃকুলের অপমানের প্রতিশোধ নিতে হবে স্থানীয় জনগণকে।
আর কোনো বিকল্প দেখি না।‘

ইনি ৬৯ বছরের একজন বৃদ্ধ। শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতায় পূর্ণবান একজন বয়স্ক ব্যক্তি। তার ভাষা দেখুন। সাইয়েমা হাসান পুরুষ হলে কি ইনি বলতেন, বিবস্ত্র করে চক্রাকারে ঘুরানো হোক?
অর্থাৎ কী অন্ধকার জিঘাংসা লুকিয়ে আছে আমাদের মনে! আর কী জঘন্য পুরুষতান্ত্রিকতা! যেহেতু নারী ভুল বা অন্যায় করেছে তাই তাকে ন্যাংটো করে শাস্তি দিতে হবে। এ্ররকম নৈতিকতা নিয়ে আমরা সাইয়েমা হাসানের নৈতিকতা আর মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলি কোন বেহায়াপানায়?

ইনি কেবল কবি নন। দেশের একটি উচ্চমাধ্যমিক টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ডাইরেক্টরও বটে। উনি স্ট্যাটাসে লিখেছেন,

‘এই বেটিকে উইড্র করেছে শুনলাম। উইড্র করা কোনো শাস্তি নয়। এর জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।’
অর্থাৎ শুধু উইথড্র করলে চলবে না। যারা উইথ্র করেছে তারা শাস্তি সম্পর্কে কিস্যু জানে না। জন্ম ( BIRTH) আর বেড়ে ওঠাকে (GROW) ইডিয়ম করে তিনি যথেষ্ট কবিত্ব নিয়ে এক অনুচ্চারিত জিঘাংসায় জানতে চেয়েছেন, কেন সাইয়েমা হাসানের জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে কূট প্রশ্ন তোলা হলো না? সাইয়েমা হাসান যে অন্যায় করেছে তাতে তার জন্ম নিয়ে নানা রকমের প্রশ্ন তুলতে হবে। সাথে আবার সাইয়েমা হাসানকে ইতর ভাষায় বলা হয়েছে ‘বেটি’। হিন্দি ভাষায় কন্যাকে বেটি, বিটিয়া বলে আদর করে ডাকা হয়। এখানে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নশ্রেণী হিসেবে।

একজন শিক্ষক যিনি আরও শিক্ষকদের শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দেশ জনগণ, নারী পুরুষদের সাথে গুড বিহেভ শিক্ষা দেওয়ার মহান কাজে নিয়োজিত তিনি একজন হঠাত ভুল করা নারীর প্রতি ফেসবুকে এরকম ভাষা ব্যবহার করেছেন ভাবা যায় ? আর উনার স্ট্যাটাসকে সমর্থন করে অনেকেই আজেবাজে কমেন্ট করছে। এক পুরুষতান্ত্রিক হায়েনা উৎসব চলছে। যা আনলিমিটেড।
এতে ভুল হচ্ছে না ? অন্যায় নেই এ ধরনের স্ট্যাটাসে ?

আরেকটি স্ট্যাটাস দেখুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী, একটি চলমান সফল ব্যাংকের সেলস ম্যানেজার কী লিখেছেন, বাংলাটুকু দিতে পারলাম না সঙ্গত কারণেই।

‘I am no sorry for may language in any given situation. Can’t control to see this. Need to fuck her until death to set example for this kind of other govt. officers.’

কী পাঠক, আপনারা কি পাকিস্তানী আর্মি বা রাজাকারদের দেখতে পাচ্ছেন কি? কতখানি বিকৃত মনের হলে ইনি একজন নারীর এমন শাস্তি আশা করতে পারে?

সাইয়েমা হাসানের সমালোচনা আমি বা আমরা আরও অনেকেই করেছি। কিন্তু এভাবে একজন নারীকে খুললাম খুল্লা অপমান করা কি ঠিক? ভুল কি ওনারা করছেন না? ভুল কি ওনারা ছড়িয়ে দিচ্ছেন না? নারী শিক্ষকদের যদি এরপর কেউ বলে বসে, বেটি শিক্ষক, তবো?

কী বলবো আর? সাইয়েমা হাসানরা এরকম সিনিয়র সিটিজেন আর দায়িত্বশীল শিক্ষকদের হাতেই তৈরি হয়েছে বলেই এরকম হয়। ভুলে যায় তারা জনগণের সেবক। তাদেরও মা বাবা বৃদ্ধ চাচা কাকা দাদা রয়েছে। তাই তো ভুল হয়। ভুল হতেই থাকে। ভুল করা নারী কারও কাছে বিবস্ত্র হয়, কারও কাছে জন্ম নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কেউ কেউ আবার একেবারে ধর্ষণ উল্লসিত হয়ে ওঠে।
করোনা আক্রান্ত মৃত্যুপুরীতে থেকে সমস্ত মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে একজন নারীকে দলে দেওয়ার বিকৃত আনন্দযজ্ঞ শুরু করেছে এরা। এদের ঘরের নারীরা যদি হঠাত কোন ভুল করে ফেলে তবে কি এরা বলে ওঠে, বিবস্ত্র করে ঘুরাবো! কিম্বা বলবে, অই বেটি তোর জন্ম কেমন রে? কিম্বা —-

দুটি স্ট্যাটাসই নারীর প্রতি প্রত্যক্ষ অসম্মানের জঘন্য নজির। তাছাড়া একজন সরকারি কর্মকর্তাকে কিভাবে এমন হেনস্থা আর অপমান করতে পারে এরা? দুঃখ লাগে যখন দেখি তাদের অনেকেই সরকারী চাকরিতে চাকরিরত রয়েছে।

আমার বড় লজ্জা হলো সাইয়েমা হাসান। আমি আপনাকেও বকেছি। আমার নিজের পরিবারের কেউ কেউ এবং অনেক বন্ধুরা বিসিএস ফরেন সার্ভিস, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা বিভাগে রয়েছে। তারা সম্মানের সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছে। জানি ক্ষমতার মোহ কী সাংঘাতিক মোহ! কিন্তু আপনি তো আমাদের মেয়ে! কতো কষ্ট করে আপনি এই পর্যায়ে এসেছেন! রত্ন আপনি। আপনাকে তো এভাবে ধৃষ্ট হতে দিতে পারি না মামণি! তাহলে যে বড় হিসেবে আমার কোন মান থাকে না! নারী হিসেবে যে আমার অপমান হয়!

ভুল আমরা সবাই করি, করে চলেছি। আপনি মুক্তকন্ঠে ওই বৃদ্ধদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন। দেখবেন বুকে জড়িয়ে ধরবে ওরা। আর এদের শাস্তি চান। এভাবে একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং নারীকে কিছুতেই অপমানিত হতে দেওয়া যায় না। এটাও এক ধরনের অন্যায়। আপনার কর্ম পুষ্পিত হয়ে উঠুক, উদ্ভাসিত হয়ে আসুক জন্মের সুগন্ধ।

আমি করোনায় ভীতু হলেও, মরে যেতে পারি জেনেও প্রতিবাদ রেখে গেলাম।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.