হোম কোয়ারেন্টাইনের দিনলিপি – ৩

রুখসানা কাজল:

ছোটবেলায় শিখেছিলাম, অদরকারে কোন গাছের ফুলপাতা ছিঁড়তে নেই। তাতে গাছদেরও অভিমান হয়। তারা মরে যায়। কিম্বা বেঁচে থাকলেও ফুল ফোটায় না। ফল দেয় না। বরং অভিশাপ দেয়।
২৩ তারিখ ভোরে বারান্দা পরিস্কার করতে গিয়ে দেখি পিস লিলির টবে একটি কুঁড়ি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পুরুষ্টু কুঁড়ি । এক দুদিনের মধ্যে পাপড়ি ছড়িয়ে হ্যালো বলার কথা।
প্রসন্ন মনে কুঁড়িটিকে আকাশ দেখিয়ে সপ্ত আকাশের উপর যিনি থাকেন, তার কাছে প্রার্থনা করি, এবার শান্তি দাও প্রভু। দেখ প্রকৃতিও শান্তি চাইছে। তোমার সৃষ্টিকে তুমি রক্ষা করো আল্লাহ।

লক ডাউন ঘোষণা করায় হিসেব করে দেখলাম, কিছু টাকা ঘরে থাকা দরকার। কে যাবে ব্যাংকে? ব্যাংক পান্থপথে।
করোনার কুটিল বুদ্ধিতে মগজ উর্বর হয়ে ওঠে শয়তানিতে। নিজে যাবো না। ফ্ল্যাটের কর্মচারি কাউকে বেশি বখশিস দিয়ে পাঠিয়ে দেবো। মরলে ওরা মরুক। নিজে তো আগে বাঁচি।
চেক লিখে ফোন দিলাম। দুজন বাড়িতে চলে গেছে। বাকি তিনজন গেট পাহারায় আছে। ওরাও চলে যাবে। নিজেই নিজের নীচতার কাছে ধরা পড়ে গেলাম। পিশাচ মন আমার। লজ্জা আর অনুতাপে কেটে গেল একটি রাত।
২৪ তারিখ সকালে ঠিক করি নিজেই যাব। লং গাউন, হিজাব, মাস্ক আর গ্লাভস পরে ১০টা বাজার অপেক্ষা করি। সত্যি সত্যি ভয় লাগে। কিন্তু ভয়ের চেয়ে বেশি জেগে আছে লজ্জা।

রোদ যত বাড়ে আমার সাহস ততো ফুঁড়ে বেরোয়। কতদিন বেরুই না। কতদিন হাঁটি না। আহা পান্থপথের মাঝখানে কত গাছ। সেই আকন্দফুলের গাছটা কেমন আছে কে জানে। আমি বেরিয়ে পড়ি। খবিরের তরকারির ভ্যান। পলাশের দোকান। সিদ্দীকের মাছের ভ্যান। তেঁতুল গাছ। স্কয়ার হাসপাতাল পেরিয়ে শমরিতার পাশে গ্যাস্ট্রো হাসপাতাল তার পাশে লাশের জন্যে গাড়ি ভাড়ার বিশাল বিজ্ঞাপন। উল্টো দিকে ডা. লেনিনের হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতাল। তার সামনে ঠিক দাঁড়িয়ে আছে আপেল, কমলা, মাল্টা বরই ওয়ালা। সস্তা স্যান্ডেল ভ্যান। কী যে ভাল লাগে সবাইকে। পথে পথে ছড়িয়ে থাকা মৃত্যুদুত করোনার অদৃশ্য এজেন্টরা, দেখ শালারা আমি বেরিয়েছি। মানুষ ছাড়া কি বাঁচা যায়! মানুষ ছাড়া কি থাকা যায়! ও মানুষ, ও ভাই বোন, বন্ধুরা আমার! আয় আয়! আমরা বেঁচে থাকি সবাই। রক্তমুখী শয়তানী করোনা দেখিস মানুষই হারাবে তোকে। হারতে তোকে হবেই।

ঘরে ফিরলে জীবাণুনাশক স্প্রে করে দেয় ছেলে। টাকাগুলো দ্রুত ধুয়ে শুকাতে দিই। এরপর ইস্তিরি করলেই হবে।
২৪ তারিখ সন্ধ্যায় দমাদ্দম ঝগড়া হয়ে গেল ছেলের সাথে। ও ইংলিশে বকেছে । অনেকটা সক্রেটিস নাটকের সক্রেটিসের মত। তেমনই ফ্ল্যাট লোয়ের্ড নাক ওর। আমি বকেছি গীতাঞ্জলীর সুবোধ শব্দে। সুললিত ভাষায়। মাঝে কাঁদাকাটির ভাবটাবও করেছি দু একবার। শেষে ধুপধাপ করে যে যার রুমে চলে গেছি।
মজা হচ্ছে ইংলিশ ভাষার ছাইপাঁশ আমি ভাল বুঝি না। ছেলেও বাংলা ভাষার বকাবাদ্যি তেমন বুঝে উঠতে পারে না। ফলে ঝগড়া দীর্ঘ হয় না। বাধ্য হয়ে আমরা থেমে যাই। কিন্তু রাগটা থেকে যায়। সেও স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মতো। একটু পরেই যে কেউ কথা বলে উঠি।

আমি কোভিড ১৯ বা করোনা নামের কুৎসিত ভাইরাস নিয়ে এতো বেশি ভয় পেয়েছি যে, যতবার আমড়ার আঁটির মতো বা স্ট্রবেরি ফলের মতো ঝিল্লিযুক্ত করোনার রক্তাক্ত চিত্র দেখি, সাথে সাথে কুঁকড়ে যাই। কেমন সাপ সাপ লাগে। ভয় আতংকে একেবারে গ্রাস হয়ে গেছি। স্বপ্নও দেখেছি কয়েকবার। মরতে যে কী ভীষণ ভয় পাচ্ছি। মরতে আমি চাইও না। কেউ মরে যাক তাও চাইনে। কিন্তু কাকে জানাই এ কথা!

দেশে দেশে ঘরে ঘরে করোনা আতঙ্ক। কান্না পেয়ে পাচ্ছে। শিউরে শিউরে উঠছি। ন্যাতাকানি সাবান জল, ফ্লোর মপ, নাইজল, ডেটল, ব্লিচিং সবকিছু নিয়ে যখন তখন ঘর পুছে যাচ্ছি। দরোজার হাতল মুছছি। জুতো ধুয়ে মুছে রোদ্দুরে শুকাচ্ছি। কিচেন ওয়াশ রুমের জল নিষ্কাশনের পথে গরম পানি ঢালছি। গার্গল করছি। লেবু চা, আদা চা, কালোজিরে চা খেয়েই চলছি। উচ্ছে, করলা, নিমপাতা, সজনে খাচ্ছি নিয়ম মাফিক। খেতে বসে ছেলে রোজ ঠাট্টা করে, এটা কি নিম পাতার চাটনি মা? ওয়াও! কেকান্টির সাথে যোগাযোগ করো।

দু দুটো আলো জ্বেলে রাখি রাতে। ঘুম হয় না। তন্দ্রামতো এসেছিল। ভেঙ্গে গেল। মনে হল কে যেন মেইন দরোজায় ঠেস দিয়ে সরে গেল। কে? কে? গলা শুকিয়ে কাঠ। আবছা পুরুষ কন্ঠ। দরোজার চাবি ছেলের কাছে। কেউ এলেই গলা বাড়িয়ে দিই। কথা বলি, এটা ওটা জানতে চাই, আপেল কমলা দিয়ে খানিক গল্প করি। ছেলে তাই চাবি নিয়ে নিয়েছে।

এবার ঝাঁঝালো মেয়ে কন্ঠে প্রতিবাদ শোনা যায়। হায় আল্লাহ! করোনামগ্ন মহামারীর রাতে কী ইন্দ্রিয় বোধ মানে! পাশের ফ্ল্যাটের ছেলে আর তার বউ। বউটা রাজি নয় করোনার ভয়ে। স্বামী পায়ে ধরছে রাজি করাতে। আল্লাহর খাসি ছেলেটাকে দুচোখে দেখতে পারি না। বিয়ের আড়াই বছরের মধ্যে দুটো বাচ্চা পয়দা করেছে। নিদান কালে সেক্স ইনক্যাপাবল ইঞ্জেকশন দিয়ে এদের রোখা দরকার!

দুপুরে মোবাইল বেজে থেমে গেল। দুবার। বুয়া। কিছুতেই গ্রামে থাকতে চাইছে না। চারটা বাসার কাজ করে মাসে পনেরো হাজার টাকা পায়। মাসে মাসে ঋণ আছে। আমি বুঝাই। আশ্বাস দিই, ঠিক এক তারিখ বেতন বিকাশ করে দেব। চিন্তা করো না।
এবার কাঁদে। মন পুড়ছে গো মা। মন আমারও পোড়ে গো বুয়া। কী করবো বলো! বুদ্ধি দিই, মাশরুম চাষ করার। দ্রুত পাওয়া যায় এমন শাকসব্জি গাছ লাগাতে বলি। আর বলি, দোয়া করো বুয়া। মন খুলে দোয়া করো। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।
মন পোড়া আবেগে বুয়া কাঁদে, মাগো, আপনিও নামাজ পইড়েন। আল্লারে ডাইকেন। আমার তখন মনে পড়ে যায় ইতালির প্রধানমন্ত্রীর হাহাকার, আমাদের হাতে আর কিছু নাই। সব সমাধান আকাশে।

আমি চোখ মুছে মনে মনে বলি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নিকুন্তু মিনাজ্জোয়ামিন’ – আল্লাহ গো তুমি ছাড়া আর তো কেউ নেই আমাদের। দয়া করো আল্লাহ।
আমার বাসার একটি নিয়ম আছে। যারা কাজ করতে আসে এদের কাউকে ‘গণ্ডগোলের’ বচ্ছর বলতে দিই না। মোটামুটি বুঝিয়ে দিই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে।
আওয়ামী লীগকে মন খুলে গালাগাল দিলে বাক স্বাধীনতা বলে মেনে নিই, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নেগেটিভ কিছু বললে বুঝিয়ে দিই মানুষটির ত্যাগ, চেষ্টা, বীরত্বকে।

একুশে ফেব্রুয়ারী, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের সন্মানে একসাথে জাতীয় পতাকা টানাই আমরা।
মিস করছে বুয়া। খুব মিস করছে। বোনে বোনে দেখা না হলেও জীবন চলে যায়। কিন্তু এই কর্মসহায়িকাদের ছাড়া! অসম্ভব।
চিকিৎসকদের উপযুক্ত সুরক্ষা ছাড়াই চিকিৎসা করার নির্দেশ দিয়েছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ভাগ্যিস তুলে নিয়েছে। একাত্তরের ২৫ মার্চ, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর আকস্মিক হামলার বিরুদ্ধে বাঙ্গালী তবু বাঁশের লাঠিকে অস্ত্রে পরিণত করে যুদ্ধ করতে পেরেছিল। পেয়েছিল বহির্বিশ্বের সাহায্য সহযোগিতা। কিন্তু এবার?

আমাদের ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো লড়ে যাচ্ছে। এদের এবং পুলিশ ও সেনাবাহিনীর জন্যে প্রচুর সুরক্ষা পোশাক দরকার। দেশ তো আমাদেরও। কোটি কোটি টাকার বিত্তবানরা নিজেদের লক করে নিয়েছে। অথচ বিত্তবানরা এখনই পারতো দেশ, জনগণ এবং সরকারের পাশে দাঁড়াতে। আশা করি তাদের বিবেক জাগ্রত হবে। এগিয়ে আসবে তারা।

কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে ২৫ মার্চের সেই কুক্ষণ। অপারেশন সার্চ লাইট। দিশেহারা বাঙ্গালী ২৬ মার্চ পেয়েছিল স্বাধীনতার আহ্বান। ঘুরে দাঁড়িয়েছিল তারা। এভাবেই পৃথিবী ঘুরে দাঁড়াবে।
২৬ তারিখ খুব ভোরে বড় পতাকাটিকে রাস্তার পাশের বারান্দায় টানিয়ে দিই। মরতে তো একদিন হবেই। তবু করোনা আক্রান্ত বাংলাদেশে উড়ুক জীবনের পতাকা, ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা। তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা’॥

শেয়ার করুন:
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.