করোনা মহামারীতে আমাদের করণীয়

গোপা মল্লিক:

হাজার বছর ধরে উপন্যাসের একটা লাইন খুব মনে পড়ছে “গ্রামে ওলা বিবি আইছে”। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতেও করোনাও ঠিক তেমন একই ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে। বর্তমানে ফেসবুকের নিউজফিড থেকে লোকাল বলফিল্ড, চায়ের স্টল থেকে শপিং মল, টিভি থেকে ঘরের বিবি সবখানেই একটাই আলোচনার বিষয় ‘করোনা’। মাস্ক খুলে একরাশ থুতু পথে ফেলা লোকটাও “করোনা”র বিষয়ে পাশেরজনকে লেকচার দিচ্ছে।

আমরা অন্যান্য নিয়মগুলো মানি বা না মানি মাস্ক পরে ঘুরে বেড়ানোটা যেন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা অসুখটাকে যতটা না ভয় পাচ্ছি, তার চেয়ে বেশি ইনজয় করছি। অন্তত আমাদের আচরণ তাই বলছে।

সরকার স্কুল কলেজ ছুটি দিলো না বলে আমরাই চিৎকার করলাম, সরকারকে হাইকোর্ট দেখালাম। আবার আমরাই বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ছুটি কাটাতে বাইরে বের হলাম। সরকারি/বেসরকারি চাকরিজীবীরা বেজায় অখুশি, তারাও ছুটি চায়। নিজেদেরকে রিস্কের মধ্যে কেইবা রাখতে চায় বলুন? কিন্তু আপনাদের কাছে জানতে চাই, এই ছুটিকে সাধারণ ছুটি বানিয়ে ফেলছেন কেন? এটা আপদকালীন ছুটি। আর এই ছুটি তখনই কার্যকরি হবে যখন সবাই বাড়িতে অবস্থান করে নিজে ও আশেপাশের সবাইকে সুস্থ রাখা যাবে। তা না হলে এই ছুটি শেষ হবে, কিন্তু আপদ রয়ে যাবে। অনেকে তো এসময়টা বিয়ের জন্য আদর্শ মৌসুম বানিয়ে ফেলছেন। দয়া করে এগুলো করবেন না।

শুধু ডাক্তার, ব্যাংকার, পুলিশ প্রশাসন, আর্মি এরাই জেগে বসে থাকলে দেশ চলবে না। হ্যাঁ, পেশাগত দায় হয়তো এনাদের একটু বেশি। কিন্তু অন্যরাও বা এ দায় এড়ায় কী করে?

আজ যদি বিদেশ ফেরত লোকজনদের বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো যেত, তবে হয়তো পরিস্থিতি এতোটা ঝুঁকিপূর্ণ হতো না। সেনাবাহিনী নামানোতে ভালো হয়েছে। তবে এটা আরও আগে করা উচিত ছিল।
আমরা গরীব দেশ। আমাদের কাজ করে খেতে হয়। করোনা ভাইরাসের ভয়ে ঘরে বসে থাকলে শুধু আমরা অচল হয়ে যাবো না, অচল হবে গোটা দেশ। আর এই ধকল কাটাতে হবে আগামী কয়েক বছর।
তাহলে আমরা কী করবো?

আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশে যখন বাস করছি এখন সময় এসেছে সরকারের পরীক্ষা দেবার। আসলে কতটা ডিজিটাল হয়েছি আমরা? কেন এখনও ঘরে বসে থাকলে আমাদের সমস্ত কাজ থেমে থাকবে? আমি বলছি না সব সেবা ডিজিটালাইজড করা সম্ভব। তবে যতটুকু সম্ভব ছিল ততটুকুও আমরা পেরেছি কি?

আমরা কানাডার নাগরিক নই। তাদের জিডিপি আর আমাদের জিডিপি এক নয়। তাহলে বারবার তাদের সাথে আমরা কেন নিজেদের তুলনা করছি? কেন আমরা সরকারের কাছে আশা করছি সরকার আমাদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিবে কিংবা সরকার আমাদের খাওয়া-পরার দায়িত্ব নিবে?

এই দুর্যোগ আপনার, আমার, পুরো দেশের। যারা সরকারি কর্মচারি আছেন কিংবা অন্যান্য চাকরিতে আছেন, তারা নির্দিষ্ট সময়মতো বেতনের টাকা পেয়ে যাবেন। কিন্তু সবার বেতন থেকে একটা নির্দিষ্ট পার্সেন্টেস টাকা সরকার যদি কর্তন করতো এটাকে বৈশ্বিক তথা জাতীয় দুর্যোগ দেখিয়ে, আমার তো মনে হয়না কারো কোনো আপত্তি থাকতো! এতে করে সরকার অনেকগুলি টাকা পেত। এবং তা দিয়ে শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষদেরকে রেশনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য দেয়া যেত।

বড় বড় কোম্পানিগুলো এসময় ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। তারা ডাক্তার- নার্সদের পোশাকের স্পন্সরশিপ নিন। এতে করে তাদের কোম্পানির সুনামও বাড়বে, মানুষের সেবায় অবদানও রাখা হবে। পদ্মাসেতু তৈরি হয়েছে অমুক কোম্পানির সিমেন্ট দিয়ে, এই বিজ্ঞাপনের চাইতে করোনা মোকাবিলায় কোন কোম্পানি কী পদক্ষেপ নিয়েছে এই বিজ্ঞাপন প্রচারিত হোক।

প্রতিটি সংসদ সদস্যদের নিজ এলাকার মানুষের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেয়া হোক। এলাকার চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বে এলাকার তরুণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে একটা সীমিত সদস্য বিশিষ্ট ভলান্টিয়ার টিম গড়ে তোলা হোক। যারা মানুষকে সত্যিকার অর্থে সচেতন করবেন।

# দয়া করে প্যানিক ছড়াবেন না। #

মনে রাখবেন অসুখটা ত্বকের ভিতর দিয়ে ছড়ায় না। যখন আপনার শরীরের কোনো অংশ (এমনকি পরিধেয় পোশাকও) এই ভাইরাস দ্বারা কন্টামিনেটেড হবে এবং আপনার মুখ, নাক ও চোখের সংস্পর্শে আসবে তখনই আপনি অসুস্থ হবেন।

সুতরাং #১ অপরিষ্কার হাত/কাপড়/যে কোনো জিনিস মুখ মণ্ডলের সংস্পর্শে আনবেন না।
#২ সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এবং অবশ্যই ১০ -২০ সেকেন্ড ধরে।
#৩ প্রতিদিন গরম জল খাওয়ার অভ্যাস করুন। গরম জল খেতে খারাপ লাগলে নিয়ম করে গরম চা খান ২/৩ কাপ। অবশ্যই বাড়িতে, চায়ের দোকানে নয়।
#৪ ফল বা সালাদের সবজি ভাল করে সাবান জলে ধুয়ে নিন।
#৫ স্নানের জলে স্যাভলন/ডেটল মিশিয়ে স্নান করুন।
#৬ শুধু করোনা থেকে নয়, ধুলো থেকে বাঁচতেও মাস্ক ব্যবহার করুন। কেননা ধুলো থেকে অনেকের এলার্জি হতে পারে। সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট এলার্জির সাথেই সম্পর্কিত। আর এখন সিজন চেঞ্জের সময় জ্বর হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। জ্বর হলে গায়ে ব্যথা হবে, গলা ব্যথা হবে, সর্দি-কাশি হবে, এটাও স্বাভাবিক।
তাই করোনার সাথে সাধারণ জ্বরকে গুলিয়ে ফেলবেন না।
#৭ ভিটামিন সি শুধু নয়। সব ভিটামিনযুক্ত খাবার খান। এতে শরীরে ইম্যুনিটি বাড়বে।
#৮ আপাতত কিছুদিন সামাজিকতা পরিহার করুন। বিশেষ প্রয়োজন না হলে কারো বাড়ি যাবেন না। কাউকে বাড়িতে এ্যালাউ করবেন না। হ্যান্ডশেক,কোলাকুলি পরিহার করুন।
#৯ সম্ভব হলে প্রতিদিনের বাইরে পরা কাপড় সাবান জল দিয়ে পরিষ্কার করুন।
#১০ এলাকায় কোনো পরিবারে প্রবাসী কেউ এসে থাকলে সেই ব্যক্তিসহ বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সাথে মেলামেশা থেকে আপাতত দূরে থাকুন।
#১১ নিমপাতা, তুলসীপাতা, থানকুনি পাতা আপনি যাই খান না কেন, কোনো কাজই হবে না যতক্ষণ সবাই সচেতন না হচ্ছে।
বাড়ির বয়স্ক আর শিশুদের প্রতি এসময় বিশেষ যত্ন নিন। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ির বাইরে যাবেন না।

বেঁচে থাকলে আবার আড্ডা হবে। নীলগিরি, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন ঘোরা যাবে।
মানবসভ্যতার কল্যাণের জন্য হলেও আপাতত কিছুদিন নিজেকে ঘরবন্দী করুন।

মনে রাখবেন- “Prevention is better than cure.”
সবাই নিজে সুস্থ থাকুন,অন্যকে সুস্থ রাখুন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.