করোনা – মানবসভ্যতার জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?

কাকলী তালুকদার:

প্রথম কথা হচ্ছে করোনা মানেই মৃত্যু নয়।

COVID-19 একটি নতুন ভাইরাস, তার বংশ বৃদ্ধি করার জন্য চেষ্টা করছে। আমাদের বডি প্রতিদিনই হাজার হাজার জার্ম, ভাইরাসের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে যা খালি চোখে দেখা যায় না!

একটি সহজ বিষয় হচ্ছে, আমাদের সবার শরীরে মাঝে মাঝেই জ্বর আসে সেটার কারণ কোন ভাইরাস বা জার্ম আমাদের শরীরে ঢুকতে চাচ্ছে, কিন্তু আমাদের শরীরের নিয়ম অনুযায়ী শরীর তার নিজস্ব সৈন্যবাহিনীকে নির্দেশ দেয় সেই সকল ভাইরাসকে আটকে দেয়ার জন্য। আর তখনই যে যুদ্ধটা হয় এই দুই পক্ষের, ঠিক সেই কারণে আমাদের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় বা জ্বর হয়।

জ্বর আসা মানে আপনার শরীর আপনার জন্য যুদ্ধে নেমেছে। খবরটি ইতিবাচক। তবে জ্বরের মাত্রা যখন ৩/৪ এর উপরে চলে যায়, তার মানে আপনার শরীর ভাইরাস বা জার্মের সাথে যুদ্ধ করতে পারছে না আর, ঠিক তখনই জার্মের বিপরীতে এন্টিবায়োটিক লাগে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লাগে এন্টি ভাইরাল মেডিসিন।

কাকলী তালুকদার

করোনা মূলতঃ পুরাতন ভাইরাস। আর COVID-19 করোনার নতুন বংশ প্রদীপ। যেহেতু ডিজিটাল সময়ে তার জন্ম সে নতুন ইউনিফর্ম নিয়ে বিশ্বে ঘুরে দাপট দেখাচ্ছে। আর পৃথিবীতে যেহেতু সে নতুন জেনারেশন তার ভাবভঙ্গি বুঝতে বুঝতেই বিজ্ঞানিদের সময় লেগে যাচ্ছে। তার মধ্যে আবার এই ভাইরাস সময়ে সময়ে চেহারা বদল করছে বাংলাদেশের তথাকথিত নেতাদের মতো!

এখন কথা হচ্ছে, সবারই কিছু সবল দিক এবং দুর্বল দিক থাকে। আপনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন না, খুবই সাধারণ আপনি, কিন্তু দেশে যুদ্ধ লেগে গেছে, আপনি যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছেন, কী করবেন? প্রথমে দেখবেন আপনাকে কেউ বাঁচাতে আসার সম্ভাবনা আছে কিনা! যখন সেই সম্ভাবনা নাই, তখন আপনি নিজেই চেষ্টা করবেন নিজেকে কেমন করে বাঁচানো যায়, বাংলাদেশের দুর্যোগে জনসাধারণ যা করে থাকে।

দেশের হাসপাতালে আপনি এই মুহূর্তে সেবা পাবেন না, যদিও সেটা আপনার অধিকার। অধিকার নিয়ে পরে কথা বলা যাবে, চলুন আগে আমরা সবাই বেঁচে নেই।

মূলত রোগটি আমাদের শ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আর মানুষের যোগাযোগটা ঠিক কতটা জোরালো সেটা বুঝতে একবার চিন্তা করুন চায়না থেকে সারা বিশ্বে কত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে গেলো। চায়নার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বুঝতে কারোর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের দেশ, জনসংখ্যা, সামাজিক সম্পর্ক বা সার্বিক পরিস্থিতির কারণেই সবাই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবো, সেটা ভেবে মনকে প্রস্তুত করুন। নিজের বাসায় বাথরুমের পাশের রুমটিকে প্রস্তুত করুন একটি বিচ্ছিন্ন জগৎ হিসেবে। যার লক্ষণ দেখা যাবে তাকে সেই রুমে থাকতে হবে কিছুদিন। একটা টিভি, বই, ফোন কিছু শুকনা খাবার জল রেখে দিতে পারেন। বিরক্তি কাটাতে এই গুলো কাজে লাগবে।

দেশে সবাইকে করোনা টেস্ট করা সম্ভব হবে না। সিমটম দেখা দিলে নিজেকে সেই রুমটিতে রাখুন। নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়াগুলো এই সময়ে করে নিতে পারেন। নিজের সাথে নিজের সম্পর্কটা আমাদের অনেক সময় হয়ে উঠে না, ধরুন এই রকম একটা সুযোগ আমাদের এখন এসেছে। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি নিজের দায়িত্বগুলোর পরিকল্পনাও করে নিতে পারেন।

বারবার হাত ধুয়ে ফেলুন সাবান দিয়ে, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার যেমন, শাক সবজি, ফলমূল, মাছ/মাংস/ ডিম/ ডাল এবং প্রচুর ভিটামিন সি জাতীয় খাবার এবং পানি জাতীয় খাবার গ্রহণ করুন। হাসপাতালে যেতেই হবে এমন চিন্তা ঠিক তখন করুন যখন শরীরকে আপনি নিজের নিয়ন্ত্রণে আর রাখতে পারছেন না। এইক্ষেত্রে শ্বাস কষ্ট হলে আপনি অবশ্যই হাসপাতালে যাবেন। কারণ আপনার শরীর সুস্থ থাকলে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করে নিবে। আমাদের শরীর এই কাজটি নিয়মিত করে বলেই আমরা সুস্থ থাকি।

পরিবারের বয়স্ক মানুষ আর যাঁরা বিভিন্নভাবে অসুস্থ তাদেরকে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ করে দিন। আমাদের হাজার সীমাবদ্ধতা আছে, এর মাঝেই আমাদের বাঁচতে হবে, সবাইকে বাঁচাতে হবে।
করোনা শুধু আমাদের কাছে মৃত্যুর কারণ হয়ে আসে নাই, এই ভাইরাস আমাদেরকে অনেক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
আমাদের পারিবারিক, সামাজিক সম্পর্ক, স্বার্থপরতা, দায়িত্ব, দায়িত্বহীনতা, নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া সহ মানুষের ক্ষমতা, অক্ষমতা সব কিছুকে আংগুল দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে।

আজকের বিচ্ছিন্নতায় অনুভব করে দেখুন আমাদের বেঁচে থাকা শুধু নিজের জন্য নয়! মানুষ মানুষের পাশে না দাঁড়ালে, দেশ দেশের পাশে না দাঁড়ালে মানুষ বাঁচতে পারে না।

বন্দুক, বোমা, পৃথিবীর সকল অস্ত্র আজ থেমে গেছে।
সারা বিশ্ব যখন অস্থির হয়ে উঠেছিলো, অনেকেই ভাবছিলাম এর শেষ কোথায়? পৃথিবীর সকল মানুষ আজ এক পক্ষ হয়ে গেলো এক ভাইরাসের কারণে, বিষয়টি নিশ্চয়ই একদিক থেকে মানবসভ্যতার জন্য আশীর্বাদ।

২৩ মার্চ ২০২০
ফরসাইথ,ইলিনয়

শেয়ার করুন:
  • 479
  •  
  •  
  •  
  •  
    479
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.