হোম কোয়ারেন্টাইনের দিনলিপি – ২

রুখসানা কাজল:

চোখ ব্যথা করছে। অনেক দিন ধরেই যাবো যাবো করে যাওয়া হয়ে উঠেনি চোখের ডাক্তারের কাছে। দুদিন সকালে পড়ছিলাম রুমা মোদকের, নদীর নাম ভেড়ামোহনা। বিকেলে ছিল দীপেন ভট্টাচার্যের নিস্তার মোল্লার মহাভারত। আরও কতজনের বই যে জমে আছে। পড়ব বলে আনিয়ে রেখেছি। কিন্তু বেঁচে থাকব তো!

চিরদিনের ভোরে ওঠার অভ্যাস। কোথা থেকে একটি মোরগ গনগনে গলায় ডাক দেয়। আমগাছগুলোর পাতার আড়ালে বসে অনেকগুলো কাক কা সঙ্গীতে ভোরকে আবাহন করে । আমি এক বারান্দা থেকে আরেক বারান্দা ঘুরে অন্ধকার মাখামাখি ভোর দেখি। একলা এক ভোর আকাশ মায়ের কোল ছেড়ে নেমে আসছে। মহানগরের অলিগলি, রাস্তাঘাট, বিল্ডিং ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে ভোর বৃদ্ধ হবে। আবার সে ফিরে যাবে আকাশ মায়ের কোলে।

রুখসানা কাজল

এখনও কিছু আম, জাম, নিম, কাঁঠাল সজনেগাছ বেঁচে আছে এ পাড়ায়। চিন দেশে করোনা যখন মানুষ খুন করছে তখন আমাদের আমগাছে বউল এসেছে। হলুদ নরম সুঘ্রাণ। ম ম করছে পাড়া । ডাস্ট এলার্জির জন্যে মাস্ক পরি। ফুলের ঘ্রাণ নেওয়াও নিষেধ। তবু হেঁটে আসতে আসতে আমগাছের নীচে মাস্ক খুলে কিছুক্ষণ দাঁড়াই । ঝরা বউল পড়ে আছে রাস্তায়। কিছু থেঁতে গেছে, কিছু ভাল । তুলে নিই। এক হাত থেকে অন্য হাতের মুঠোয় । বোন বোন স্পর্শ। লাগে । হাসিখুশি ঘ্রাণ। বোনের ছেড়ে রাখা জামা গায়ে পরার মত আনন্দ পাই। আহ, সুন্দর কত চেনা তুমি !
পাশের বাড়ির বুয়া আসে মোমগলা ভোরে। খুন্তি কড়াইয়ে চরম শব্দ করে বিড়ালদের জন্যে রান্না করে। মরা ধরা বিশ্রী রোগা কতগুলো বিড়াল পোষে পাশের বাড়িওয়ালা। কাগজের টুকরোয় খুন্তি মেপে ভাত ঢালে বুয়া । অসংখ্য কাকের সাথে যুদ্ধ করে বিড়ালগুলোকে রোজ খেতে হয়। ওটুকুই যা আদর।

গেল সাতদিন কাক নেই। বিড়ালগুলোকে দেখা যায় না। মোরগের ডাকও শোনা যায় না। আমি বন্ধ্যা আমগাছগুলোকে দেখি আর ভাবি, ভয় পেয়েছে। ওরাও ভয় পেয়েছে। আমার মতোই ভিতু ওরা। মরতে তোমার এতো ভয় কাজল!

এখন করোনার দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে বাংলাদেশে। মৃত্যুর জাল বিছিয়ে দিয়েছে করোনা। তৃতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহে জাল টানতে শুরু করবে। ভয়াবহ এপ্রিল। কত জন যে আমরা মরে যাবো! সত্তর কাছাকাছি একজন লেখক জানালো, জুন পর্যন্ত কি বেঁচে থাকবো রে কাজল! কত কাজ করার ইচ্ছে ছিল! একটা পত্রিকা। শুধু গল্পের। পারবো কি আর! তোরাই করিস।

আমাদের ডাক্তার নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা খালি হাতে লড়তে নেমেছে। মায়া লাগছে। কী নির্মম অবহেলা। নিষ্ঠুর অবজ্ঞা। এগিয়ে এসেছে কেউ কেউ। বোন স্বপ্না ভৌমিক, বরিশালের মাস্ক বিক্রেতা গরীব সোনা বোনটি, মিলিতা চৌধুরী, বিদ্যানন্দ, আরও কেউ কেউ মিলে অনেকেই। আরও আসবে। পৃথিবীর মঙ্গল আনতে মানুষ তো কখনও পিছিয়ে থাকেনি মানুষের চেহারায় অমানুষদের মত।

ক্ষমতার শাখা প্রশাখায় এখনও বাগাড়ম্বরের ফোয়ারা। প্রস্তুতির সময় ছিল। সে সময় পেরিয়ে গেছে সুখস্বপ্নে। দেখি না কী হয়! মুসলমানের আবার কী হবে! শালার চিনারা সাপ ব্যাঙ বাদুড় খায়। মুসলমান মারে। নাস্তিকের বাচ্চারা। ওরা মরবে না তো কে মরবে!

আবার অনেকেই বলেছে, ধুস বাঙ্গালী হচ্ছে গু মুত, ভেজাল মেজাল খাওয়া জাতি। করোনা আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে না।
বিদেশ থেকে যারা বাঁচতে দেশে ফিরে এসেছিল তারা ছড়িয়ে গেছে শহর গ্রাম দেশের আনাচ কানাচে। কেউ কেউ বিয়ে করতেও নেমে পড়েছে। টনক যখন নড়েছে, আত্মগোপনে চলে গেছে অনেকেই। আর সরকার?

একবার গ্রীসের জ্ঞানী ব্যক্তিরা পাখি পুষবে বলে একটি খাঁচা বানিয়েছিল। সে খাঁচার ঢাকনি নেই। মাথা খোলা। খাঁচায় পাখি রাখতেই উড়ে চলে গেল। জ্ঞানী ব্যক্তিরা গভীর পর্যবেক্ষন করে বলেছিল, হায় খাঁচার চারপাশ কেন আরও উঁচু করে বানাইনি আমরা ?

নতুন প্রজন্মের চোখে সুস্পষ্ট ঘৃণা। অবিশ্বাসের অসন্মান। বিদ্রোহ। ১৯৮১ সালের ১৭ মে। ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে আনতে গিয়েছিলাম আমরা। বড়দের হাত ছুটে হারিয়ে গেছি কতবার। তবু হারাইনি। আজ আমাদের সন্তানরা আমাদের হাত খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওদের আঙ্গুল নির্দিস্ট করে দিচ্ছে নির্লজ্জ মিথ্যাচার, লোভ, চুরি, সম্পদের অনৈতিক পাহাড় আর ক্ষমতার অপব্যবহারে মোড়া ব্যর্থ রাষ্ট্রকে । একেই হয়ত বলে, মরণের পানে ছুটে চলা। ম্যালথাস মিথ্যে নয় !

গয়না, টাকা আর ফ্ল্যাটের কাগজপত্র ছেলেকে দিয়ে বলি, এবার তোমার দায়িত্ব। ছেলে ফেরেশতার মত হাসে, আম্মুজি আমিও ত মরে যেতে পারি ! এসো হাত ধুই।
ছ্যাত করে ওঠে বুক। কিছুতেই ওকে ছাড়বো না বলে কতবার কত আপোষের মুকুট মাথায় পরেছি। কতবার কত পরাজয়ের হার গলায় পরে ওকে ছুঁয়ে থেকেছি। করোনা কি বুঝবে সে সব যন্ত্রণা ?
আমি করোনায় মৃত মানুষের জানাজার খবর দেখি। দেখে ভাবি, মরে গেলে কি কবর হওয়া উচিত ? কবরের জন্যে এত জায়গা কি পাওয়া যাবে ? নাকি পুড়িয়ে দিলেই ভাল। জীবাণুও নাশ হবে ! জায়গাও বাঁচবে।

শেয়ার করুন:
  • 77
  •  
  •  
  •  
  •  
    77
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.