হোম কোয়ারেন্টাইনের দিনলিপি – ১

রুখসানা কাজল:

আমি যখন কোনো লেখা পড়ি, লেখাটা আমার সামনে একটি রাস্তা তৈরি করে দেয়। সে যে কোনো রাস্তা। প্রেম কিম্বা যৌনতা, অপ্রেম অথবা হিংস্রতা, বিপ্লব বা আন্দোলন, আপোষ থেকে একেবারে সাধারণ আটপৌরে কোন রাস্তা খুলে যায়।
ভীষণ ছোটবেলায় আমি না বুঝেই অনেক বই পড়ে ফেলেছিলাম। ভীষণ বললাম এ জন্যে যে আমি এক দুরন্ত শৈশব কাটিয়েছি। ছেলেমেয়ে বলে সেই শৈশবে কোন ভাগ ছিল না। অনেক সময় এমন হয়েছে ইংলিশ প্যান্টের বোতাম খুলে ছেলেদের কেউ হি্সি করছে। দাঁড়িয়ে। আমরা কেউ প্যান্ট নামিয়ে বসে পড়েছি হিসি করতে। জানতাম ওদের ওরম আছে তাই ওরা দাঁড়িয়ে করছে। আমাদের এমন তাই বসে করতে হবে। মোট কথা তখন মাথায় থাকতো কীভাবে কোন উপায়ে কত সন্তর্পণে আম চুরি করা যায় সেই ভাবনা।

যাদের বাগানের আম চুরি হবে সে বাড়ির ছেলে বা মেয়েও থাকতো আমাদের দলে। ফলে চুরির পথ সহজ হতো। আর আমরা একেবারে গাছ মুড়ে কেউ চুরি করতাম না। এক জন একটা। লোভি কেউ দুটো ছিঁড়লে দলীয়ভাবে কথা শুনতো সে। আমরা কেউ অভাবে চুরি করতাম না। দলটা ছিল ডাক্তার, উকিল, শিক্ষক, সরকারি চাকুরে, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়িদের ছেলেমেয়েদের দল। আম, জাম, লিচু, কলা, আচার, ডিম, নাড়ু, পিঠে, মুড়ি মুড়কি, ছোলা, সেমাই, দুধ চুরি? সে তো নিত্য আনন্দময় ব্যাপার তখন।

রুখসানা কাজল

সেই নিষ্কলুষ আনন্দময় শৈশব থেকে আমাকে উপড়ে আনা হয়েছিল। একেবারে ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ অবস্থা। কারণ সেই সময় আমার এক বোন অন্য ধর্মের তার প্রেমিককে বিয়ে করে ফেলেছিল। করোনার চাইতেও ভয়ঙ্কর অবস্থা। প্রতিবেশি আর আত্মীয়রা হঠাত সজারু হয়ে গেল। প্রতিটি জানালা দরোজা স্যাট স্যাট করে বন্ধ করে দেওয়া হলো। ঠোঁটকাটা দু একজন আত্মীয় বাড়ি বয়ে মা বাপিকে মাসায়লা দিয়ে গেল, কোরআন শরীফ পড়ে আর কী হবে! দু একটা তুলসীগাছ লাগিয়ে নাও!

তা তুলসীগাছ আমাদের প্রচুর ছিল। রোজ সকালে মধুর সাথে তুলসীপাতা চিবোতে হতো। সে এক বিচ্ছিরিরও বিচ্ছিরি অবস্থা। অনেক দিনই ছাগল ছাগল ভাব আসতো মনে। কেবল ভ্যা অ্যাঁ অ্যাঁ র বদলে ভ্যাক থু, ভ্যাক থু করে চিবিয়ে খেতাম।
তো মাঝে মাঝে আমি বিরক্ত হয়ে যেতাম। বাইরে যেতে চাইলেই মা আটকাতো। ঢুসোঁ মেরে দু একবার বেরিয়েও যেতাম। কিন্তু বাইরের সেই পরিবেশ আর পেতাম না। এরকম একদিন মা বইয়ের আলমিরাগুলো খুলে দিয়েছিল আমার জন্যে।

বুকের মাঝখানটায়, যেখানে দুই পাঁজরের সংযোগস্থল সেখানে ধ্বক করে বেজে উঠেছিল। যেন ঘন্টা। যেন পাড়ার মুয়াজ্জিন হুজুরকে পটিয়ে আজান দেওয়ার হ্যান্ডমাইকে অসময়ে বেওক্তে, হাই আলার সালায়াআআআ বলার আনন্দ বেজে উঠলো বুকে। যেন শ্রী শ্রী কালি মন্দিরের দাঠাকুর ঘন্টা বাজিয়ে পূজায় মগ্ন হতেই আরেকবার ঘন্টা বাজিয়ে পালিয়ে যাওয়ার আনন্দ পেলাম মনে। বাপি নামাজ পড়ে ঘরে সন্ধ্যে দিতে দিতে পাঠরত (মন দিয়ে ছবি দেখতাম) আমার বই উলটে দেখে হেসে ফেলেছিল। সেই হাসি। বন্ধুত্ব, ভালবাসা আর সতীর্থ হওয়ার সুবাতাস বয়ে গেল আমাদের ঘরে। মা এসে পাশে বসলো বাপির। কতদিন এমন দেখি না আমি। উদ্বেল মনে নিশ্চুপ হয়ে গেছিলাম। নীল এক টুকরো কাপড়ে একেকটা বই মুছে বাপি জানিয়ে যাচ্ছিল, ইনি এটা লিখেছেন। এমন ছিলেন ইনি। উনি —

মফঃস্বল শহরের ঝ্যালঝেলে আলোয় অতি দ্রুত বাপি হয়ে উঠেছিল এক আলোকস্তম্ভ। তার পাশে মা। ছায়াপথ। আজীবনের। আমি দুজনকেই ধারণ করে শক্তিময়ী হয়ে উঠতে থাকি। নিজের আলোতে বেঁচে থাকার শক্তি অর্জন করতে হবে। বাঁচাতে হবে আপনজন, আশ্রিত এবং এই পৃথিবীকে। ছেড়ে দিতে হবে যারা যেতে চায় তাদের। অমরত্মের আকাঙ্ক্ষা পুষতে নেই। কোন কিছুই অমর নয়। এ জীবন। এ পৃথিবী। বাবা মা, ভাই বোন সন্তান বন্ধু প্রেমিক, স্বামী, স্ত্রী অথবা গোপনীয় প্রিয়জন, প্রিয় মানুষ, জমানো টাকা, স্কোয়ার ফুটের নিরাপত্তা, নিরেট সোনা বা পাথর খচিত হিরের গহনা ।
বেঁচে থাকার সময়টুকুই অমর।

পড়ছি জন রীড এর ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’। পিডিএফ। খুঁজে খুঁজে বের করেছি। মুখবন্ধ লিখেছেন ভ.ই. লেনিন আর ন. ক. স্ক্রুপস্কায়া। হাঁটছি ওদের সাথে। ওদের বয়েসি হয়ে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের যড়যন্ত্রের রাস্তা খুলে গেছে। হাঁটছি —-

শেয়ার করুন:
  • 130
  •  
  •  
  •  
  •  
    130
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.